Home / CPD in the Media / আবগারি শুল্কের হার বাড়ানো হলে মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়বেঃ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আবগারি শুল্কের হার বাড়ানো হলে মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়বেঃ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Published in আমাদের সময় on Sunday, 4 June 2017

আবগারি শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ জনগণ শঙ্কিত ব্যাংকার

ব্যাংকবিমুখ হবেন গ্রাহকরা

হারুন-অর-রশিদ

আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকের জমানো টাকার ওপর আবগারি শুল্ক ৬৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর এ ঘোষণায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পাবলিক প্লেসে অনেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ করের কারণে ব্যাংকের আমানত কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাড়তি করের কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন বেড়ে যাবে। অর্থ পাচার হবে। এ কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়, বছরের যে কোনো সময় ব্যাংক হিসাবে এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জমা দিলে বা তুললে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক কেটে রাখা হবে। আগে রাখা হতো ৫০০ টাকা। একইভাবে, ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত কোনো হিসাবে জমা দিলে বা তুললে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেটে রাখা হবে। আগে কাটা হতো ১ হাজার ৫০০ টাকা। এক কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা হিসাবে থাকলে ১২ হাজার টাকা কেটে রাখা হবে। এসব হিসাব থেকে আগে কেটে রাখা হতো ৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচ কোটি টাকার বেশির ক্ষেত্রে কেটে রাখা হবে ২৫ হাজার টাকা, যা আগে ছিল ১৫ হাজার টাকা।

ফয়সাল আকবর নামে এক ব্যক্তি তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, গ্রামের জমি বিক্রি করে কিছু টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট রাখা হয়েছিল। এখন দেখি আবগারি শুল্ক কেটে বছর গেলে টাকার অঙ্ক কমে যাবে। ব্যাংকে লাভের জন্য রেখে এভাবে আবগারি কর কাটলে দেখা যাবে এক সময় আসল টাকাই সরকার খেয়ে ফেলেছে। আমি শূন্যহাতে বাড়ি ফিরব। দারুণ বুদ্ধি অর্থমন্ত্রীর। একজন মানুষকে এমনভাবে করের নেটওয়ার্কে বেঁধেছেন অর্থমন্ত্রী যার তুলনা হয় না। বাংলাদেশে একজন মানুষ বসবাস করতে তার নিত্যদিন কত টাকা ভ্যাট দিতে হচ্ছে? তার হিসাব কষলে মাথা ঘুরে যায়। আয়ের টাকা ভ্যাটের পেছনেই যদি ঢালতে হয়, তা হলে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার উপায় থাকল কোথায়?

শাহ বুলবুল নামে একজন লিখেছেন, এগুলো লুটপাটের কৌশলমাত্র।

তৌহিদুল ইসলাম নামে এক বেসরকারি চাকুরে লিখেছেন, ভাই, লাখের ওপর বেতন অইলেই টেনশন; ঘটনা এরুম না। কতা অইলো, আমি মনস্থির করেছি, ব্যাংকে যামুই না। হাজারখানেক টাকা ছিল অ্যাকাউন্টে। হেইডাও কইম্যা গেছে। উঠাইতে পারছি না। সর্বনিম্ন কত থাকলে তোলা যাইবো তা-ও বুঝতাছি না।

গোলাম সামদানি নামের আরেক ব্যক্তি ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, নয়ন লাগবো না, কর ঠেকা। বড় লোকের কাছ থেকে কর আদায়ে ব্যর্থ হয়ে অর্থমন্ত্রী কর আদায়ের সব সহজ পথ বেছে নিচ্ছেন। মোবাইলে ২০ শতাংশ কর, ব্যাংকে ১ লাখ টাকা লেনদেন হলে একবার ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক বা ডাকাতি। ব্যাংকে আমানতের ওপর সুদ, সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর। জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেক হলেও দেশে দাম কমে না। বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়তেই থাকে। ১৫ শতাংশ ভ্যাট।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের অর্থ লেনদেনে আবগারি শুল্ক বাড়ানো ঠিক হয়নি। এমনিতে ব্যাংকগুলো সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কমে গেছে। এতে করে আমানতকারী প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে জনগণকে ব্যাংকবিমুখ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ কম। তাই মানুষ বাধ্য হয়েই ব্যাংকে টাকা রাখে। এখন যদি ব্যাংকে টাকা রেখে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তা হলে ব্যাংকের পরিবর্তে অন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতে টাকা চলে যেতে পারে। এমনকি পাচারেরও আশঙ্কা রয়েছে।

কয়েকটি ব্যাংকের এমডি এ প্রসঙ্গে বলেন, নতুন করে আবগারি শুল্ক বাড়ালে মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে বাড়িতে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকের আমানতপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বেড়ে গিয়ে সামাজিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি হবে। ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে যাবে অর্থ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়বে। এ সুযোগ খুব ভালোভাবে ঠককারবারিরা কাজে লাগাতে পারে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানতে সুদহার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তুলনা করলে খুবই অসামঞ্জস্যপূর্ণ রয়েছে। এরপর এমনিতে মুনাফার ওপর ১০-১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হচ্ছে। আবার যদি আবগারি শুল্কের হার বাড়ানো হয় তা হলে নিশ্চিতভাবে ব্যাংকে সঞ্চয়ে উৎসাহ হারাবে মানুষ। একটু বেশি লাভের আশায় অনেক ভুঁইফোড় কোম্পানির কাছে টাকা খাটাবে। এতে সঞ্চয়ী মানুষরা সর্বস্ব খোয়াতে পারেন আশঙ্কা করেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে ব্যাংক খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জনগণ সঞ্চয়বিমুখ হয়ে পড়বে। এতে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ কমে যাবে। ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যবসাও কমে যাবে। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অল্প অল্প টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে জমা রাখে। এখন যদি তাদের লেনদেনের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়, তা হলে সে টাকা অন্যত্র চলে যাবে। তারা সঞ্চয়ে আগ্রহী হবে না। পৃথিবীর কোনো দেশে এটি নেই। তাই প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।

উল্লেখ্য, সরকার এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আহরণ করে থাকে। নতুন আবগারি শুল্ক বাস্তবায়িত হলে আরও অন্তত ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে আসবে।

Comments

Check Also

CPD Delegates attend State of SDGs workshop in Antigua

The State of the SDGs is the new flagship initiative of the Southern Voice network …