Home / Op-eds and Interviews / Khondaker Golam Moazzem / এত টাকা রাখি কোথায়? – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

এত টাকা রাখি কোথায়? – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

Published in সমকাল on Tuesday, 12 April 2017

foreign-loan

বাংলাদেশ ঝড়-বন্যার দেশ। বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা সহ্য করেছি। ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ সালের বন্যার রেফারেন্স এখনও দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর কিংবা ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের রেফারেন্সও আসে। ২০০৭ সালের নভেম্বরের সিডরের কথাও ভুলে যাওয়ার উপায় নেই। বড় ধরনের ঝড়-বন্যা হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ত্রাণ-পুনর্বাসনের ঘোষণা আসত। ঘোষণা অনুযায়ী সবকিছু মিলেছে কি-না সেটা হয়তো খতিয়ে দেখা হতো না; তবে বিশ্ববাসী দুর্যোগের সময় আমাদের পাশে আছে, এটা ভরসা-সাহস জোগাত। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে আরেক চিত্র_ বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ-বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির জোয়ার। এ ক্ষেত্রে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে।

গত বছরের অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করেন। সে সময় জানা গেল, বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি হতে চলা এ দেশটি থেকে ৩৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ-বিনিয়োগ মিলতে পারে। ওই অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশ সফর করে গেলেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। পদ্মা সেতু প্রকল্পে এ সংস্থা ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি হতে পারে এ প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু কাজে, এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সে ঋণ স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সফরের পর দেখা যাচ্ছে, আর্থ-সামাজিক অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রতিশ্রুতি মিলছে। এর পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেছেন ৭ থেকে ১০ এপ্রিল। এ সময় ভারতের পক্ষ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তাসহ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। এর আগে ভারত থেকে আরও তিন বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং তার ব্যবহার হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দিলি্লতে ভারতীয় ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সমাবেশে ১০ এপ্রিল ভাষণ দিয়েছেন। সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।

আমাদের জানা আছে, জাপানের দিক থেকেও বাংলাদেশে ছয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি রয়েছে। বাংলাদেশ যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা গড়ে তোলায় উদ্যোগী হয়েছে তার কয়েকটিতেও চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বিনিয়োগের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রাশিয়া থেকেও মিলছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রদানের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি। বিশ্বব্যাংক সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে এ পর্যন্ত যে ঋণের প্রস্তাব পেয়েছে তার মধ্যে ৩৫ বিলিয়ন ডলার অব্যবহৃত রয়ে গেছে। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ ও ঋণ প্রস্তাবের বাইরে পাইপলাইনে থেকে যাওয়া ৩৫ বিলিয়ন ডলার কাজে লাগানোর সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের।

ঋণ প্রদান ও বিনিয়োগের স্থান হিসেবে বিবেচনার এসব প্রস্তাব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তিমত্তার পরিচায়ক। আমরা যে ইমার্জিং ইকোনমিক পাওয়ার হিসেবে গণ্য হচ্ছি, সেটা কেবল কথার পর্যায়ে নেই। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, আমাদের অর্জিত সক্ষমতা ও সম্ভাবনার খবর অন্য দেশগুলো জানতে পারছে এবং তারাও এ দেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের সারি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করায় ভূমিকা নিতে আগ্রহী। তারা এটা বিবেচনায় নিচ্ছে যে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে উচ্চ থাকছে। মানুষের গড় আয় বাড়ছে। আমাদের দেশ কখনও বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। বৈদেশিক অর্থ মজুদের ভাণ্ডার তেজি। শিক্ষার প্রসার ঘটছে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। এসব তথ্য থেকে তাদের ধারণা তৈরি হচ্ছে_ বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে বাংলাদেশ। এক দশক আগেও এমন সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে দেখতে পায়নি অনেক দেশ। আমাদের কিছু সনাতনী উন্নয়ন অংশীদার রয়েছে_ যেমন জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। তারা তাদের মতো করে নির্দিষ্ট কিছু খাতে আমাদের সহায়তা দিয়েছে কিংবা বিনিয়োগ করেছে। তার ফলও ইতিবাচক। আমাদের যে অবকাঠামো ভিত গড়ে উঠেছে, তার পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবদান উপেক্ষা করা চলে না। তারা বন্দর, সড়কপথ, বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে অর্থ জোগান দিয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও মিলেছে সহায়তা। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতির সব চাহিদা এসব সনাতনী উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থা থেকে পূরণ হচ্ছিল না। এ প্রেক্ষাপটেই এগিয়ে এসেছে নতুন কিছু দেশ।

সাম্প্রতিক ঋণ-বিনিয়োগের যে ঢেউ তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সনাতনী সূত্রের বাইরে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা। ভারত-চীন-রাশিয়া থেকে প্রচুর সহায়তার প্রস্তাব মিলছে। এসব সূত্র এতদিন তেমন বিবেচনা করা হয়নি। এর কারণ হতে পারে আমরা তাদের নবতর সক্ষমতা বিবেচনায় নেইনি, কিংবা তারাও বাংলাদেশকে তেমন নজরে আনেনি। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়_ আমরা বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে নির্দিষ্ট কিছু খাতে ঋণ নিয়েছি কিংবা বিনিয়োগের তাগিদ দিয়েছি। কিন্তু এখন নতুন নতুন ক্ষেত্র সামনে আসছে। যেমন_ রেলওয়ে, নৌপথ, উপকূলীয় এলাকা। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে একাধিক দেশের প্রস্তাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের যেসব খাত ঋণ বা বিনিয়োগের জন্য বিবেচিত হতো, এখন তা থেকে ভিন্ন দিকে তাকাতে শুরু করেছি আমরা। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির একটি কারণ পররাষ্ট্রনীতিতে লুক ইস্ট কৌশল গ্রহণ। আঞ্চলিক কানেকটিভিটি ক্রমশই বাস্তব হয়ে উঠছে এবং তা সুফল দেবে_ এমন ধারণা ভিত্তি পাচ্ছে। বাণিজ্য সম্ভাবনাও বাড়ছে। ভারত ছিল আমাদের প্রধান আমদানির প্রধান উৎস। এখন তার স্থান গ্রহণ করেছে চীন। দুটি দেশে রফতানি আমদানির তুলনায় অনেক কম। এ ঘাটতি পূরণ করতে উভয় দেশের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে বাংলাদেশে_ এ তাগিদ জোরদার হচ্ছে।

তবে সব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপলাভ করবে, এমন নয়। ঋণের সনাতনী বলয় থেকে বাংলাদেশ বের হয়ে আসতে পারছে, এটা সুলক্ষণ। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, নতুন উৎস বিশেষ করে ভারত ও চীন থেকে যে ঋণ মিলবে তার সুদের হার বেশি পড়বে এবং পরিশোধের মেয়াদ হবে তুলনামূলক কম। এসব ঋণের মধ্যে কনসেনশনাল অংশ সাধারণত থাকে না। অর্থাৎ ঋণ হবে এতদিনের বিভিন্ন সূত্রের ঋণের তুলনায় ব্যয়বহুল। সঙ্গত কারণেই এ ঋণ যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হবে, তার যথাযথ মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে যে ঋণ গ্রহণ করা হয় তার সুদের হার কম থাকে। তারা বিভিন্ন প্রকল্প বাছাইয়ের আগে নানা পর্যায়ে মনিটর করে। সুশাসন, মানবাধিকার এসব বিষয়ও তারা বিবেচনায় আনে। নতুন সূত্রের ঋণে বাস্তবায়ন করা বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় যেন অনাবশ্যক না বাড়ে, তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্য ইতিমধ্যেই তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের সামনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে প্রকল্পের ব্যয় যথাসম্ভব কমিয়ে রাখা এবং সময়মতো কাজ সম্পন্ন করার প্রতি। প্রকল্প বাছাইয়ের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ঋণের অর্থ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দিতেই পারে। বড় অঙ্কের ঋণ বা বিনিয়োগের প্রস্তাব আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখা চাই।

আমাদের পাইপলাইনে যে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রস্তাব রয়েছে তা কাজে লাগাতে না পারার অন্যতম কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার অভাব। এ সক্ষমতা বাড়াতে হলে মানবসম্পদ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, উভয় দিকেই বিশেষ নজর দিতে হবে।

নতুন ঋণ ও বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে_ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ অর্থ পরিশোধের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে এবং সৃষ্টি হবে উদ্বেগ। আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। বিনিয়োগ থেকে যদি কাঙ্ক্ষিত হারে রিটার্ন না মেলে, তাহলে এক পর্যায়ে অর্থনীতির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি বোঝা হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন দেশে এমনকি আমাদের এখানেও ‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্প বহুল আলোচিত। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের অনেক প্রকল্প_ যা এক সময় খুব আকর্ষণীয় বলে মনে করা হতো, তা নিয়ে তাদের যে উদ্বেগ সেটা যেন আমরা বিবেচনায় রাখি। আমাদের প্রতি বিশ্ববাসীর নজর বাড়ছে,

সেটা উৎসাহের। আমরা তা কাজে লাগাতে পারলে উন্নত বিশ্বের সারিতে যাওয়ার স্বপ্ন আর অধরা থাকবে না।

গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)

Comments

Check Also

It is time to allow Bangladeshi investors to invest abroad: Dr Moazzem

Bangladesh earned $89 million from exporting pharmaceutical goods in the last fiscal year, according to the Export Promotion Bureau