/, Op-eds and Interviews, Trade Blog/কানেকটিভিটি ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা – ড. মোস্তাফিজুর রহমান

কানেকটিভিটি ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা – ড. মোস্তাফিজুর রহমান

2018-02-18T18:23:32+00:00 June 11th, 2017|Mustafizur Rahman, Op-eds and Interviews, Trade Blog|

 ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মানিত ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ 

connectivity

বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সচেষ্ট রয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ অর্জিত অবস্থান সংহত করা এবং নতুন লক্ষ্যে পেঁঁৗছানো। এ জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগানো। যোগাযোগ বা কানেকটিভিটির কথা বলা হচ্ছে। এর ধরন বিভিন্ন। যেমন-যানবাহন, বাণিজ্য, মানুষে মানুষে যোগাযোগ। এভাবে অগ্রসর হতে পারলে ব্যবসায়ের ব্যয় বা কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমবে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। বিশ্ববাজারে এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। এক সময়ে আমাদের উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কথা ভাবতে হতো। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে দেশের বাজারেও নিজ দেশের উৎপাদকের পাশাপাশি অন্য দেশের উৎপাদকের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হয়। কানেকটিভিটি এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। আমরা পণ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন দেশের কাঁচামাল ও মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ালে রফতানি বাজারে সুবিধা মিলবে। আমদানি পণ্যও কম দামে পাওয়া যাবে।

প্রতিবেশী ভারত এখন বড় অর্থনীতির দেশ। চীনও কাছের দেশ। দুটি দেশ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের বেশিরভাগ আমদানি করি- চীন থেকে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার এবং ভারত থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার। আবার জনবহুল এ দেশ দুটিতে রয়েছে বিশাল বাজার। বাংলাদেশ সেখানে প্রচুর পণ্য রফতানি করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দুটি দেশ থেকে আমদানির তুলনায় রফতানি অনেক কম। এ জন্য অবশ্যই বাধা রয়েছে। শুল্ক বাধার চাইতে অশুল্ক বাধাই অনেক বড়। সেটা দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের বর্তমান নেতৃত্বের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বা ওবিওআরকে এমন প্রেক্ষাপটেই আমাদের বিচার করতে হবে। এ উদ্যোগ ইউরেশিয়ান বাজারে প্রবেশে আমাদের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বা ওবিওআর ধারণা প্রথমে সামনে আসে ২০১৩ সালে। সঙ্গত কারণেই অনেক দেশ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। তাদের এ উপলব্ধি আসে যে, যদি এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাড়াতে হয়, তাহলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ গভীরতর করতে হবে। যানবাহনের যোগাযোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এশিয়া ও ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভোক্তা ও উৎপাদক, আমদানি ও রফতানিকারক_ সবারই এ থেকে সুফল মিলবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্টের ঘোষণা দেন। পরের মাসে একবিংশ শতাব্দীর মেরিটাইম সিল্ক রোডের বিষয়টি সামনে আনেন। এসব ধারণাকে ফলপ্রসূ করার জন্য এরপর কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে রয়েছে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি প্রকল্প- যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময়ে সরকারের সঙ্গে সরকারের (জিটুজি) এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের (বিটুবি) সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে সমঝোতা হয়, যাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের আওতায় (চীনের কুনমিং থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত) কী কী প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে, সেটা নিয়ে যৌথ স্টাডি গ্রুপের সমীক্ষা চলছে। একই ধরনের আরও কয়েকটি উদ্যোগ বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে। এ জন্য অবকাঠামো খাতে চাই প্রচুর বিনিয়োগ। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এসব খাতের অর্থের জোগানদান। এ ব্যাংক স্থাপনে চীনের উদ্যোগ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশসহ অর্ধশতাধিক দেশ এর সদস্য হয়েছে। এই ব্যাংক থেকে প্রথম দিকে ঋণ গ্রহণকারী দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য এ ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে।

কুনমিং থেকে কলকাতা পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর কেবল যোগাযোগ করিডোর হবে না। এর অর্থনৈতিক করিডোরে রূপান্তরের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। এর আওতায় বিনিয়োগ বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হবে। পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য নেওয়া হবে বিভিন্ন পদক্ষেপ। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, চীন হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস। বাংলাদেশ বিশ্ববাজার থেকে যত পণ্য আমদানি করে তার চার ভাগেরও বেশি করে চীন থেকে। অন্যদিকে, চীনে বাংলাদেশের রফতানি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও এখন পর্যন্ত চীনের মোট আমদানির তুলনায় তার পরিমাণ অতি সামান্য। সাম্প্রতিক সময়ে চীন ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হয়ে উঠেছে। দুটি দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ডলার। কুনমিং থেকে কলকাতার যোগাযোগ সহজ হলে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং দুটি দেশ তা থেকে বিপুলভাবে উপকৃত হবে। এ জন্য যে বিনিয়োগ হবে তাতে নতুন কর্মসংস্থান হবে অনেক লোকের এবং তাদের হাতে অর্থ আসবে।

ইউনান ও বাংলাদেশের মধ্যে সংযোগের বিষয়ে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের একটি সাব কমিটি কাজ করছে। ইতিমধ্যে ঢাকা ও কুনমিংয়ের মধ্যে প্রতিদিন বিমান চলাচল করায় ভালো কানেকটিভিটি গড়ে উঠেছে। চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে পরিবহন সহযোগিতা রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক ইউনান অঞ্চলকে বাংলাদেশের কাছে নিয়ে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে পরিবহন যোগাযোগে সমস্যা রয়ে গেছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য দুটি দেশের কিছু সড়কপথ আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। দক্ষিণ চীন বিশেষ করে ইউনান, মিয়ানমার, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এবং বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিপুল সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। এ জন্য পরিপূরক বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। ভ্যালু চেইন গড়ে তুলতে হবে। পর্যটনের সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। এর প্রতিটি খাতেই চাই বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন। এ দেশটি বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের গেটওয়ে। এ সুবিধা কাজে লাগানো গেলে ইউনান ও বাংলাদেশ উভয়েই উপকৃত হতে পারে। এখন পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ের ব্যয় বেশি পড়ে। চীন বাংলাদেশকে বাণিজ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশের সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশ তার তুলনামূলক সুবিধা কাজে লাগাতে পারছে না। এ সমস্যা সমাধান হলে বাংলাদেশের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এ বিবেচনাতে যুক্তিযুক্ত।

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরকালে যে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে সহযোগিতা জোরদার হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে চীনকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করেছে, যেখানে কেবল চীনের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন। এ অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জন্যও ব্যবসায়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে। চীনের সানসেট হিসেবে চিহ্নিত কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে স্থানান্তর হলেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। চীন বাংলাদেশের কৌশলগত খাতগুলোতে প্রযুক্তি স্থানান্তরের উদ্যোগও নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনা করা যায় পাট (জুট টেক্সটাইল), পোশাক (ফ্যাশন ও ডিজাইন অংশ) এবং কৃষি (কৃষি প্রযুক্তিভিত্তিক) শিল্প। বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও টেকনিক্যাল কর্মীদের পারস্পরিক যাতায়াত বৃদ্ধিও এখন প্রাসঙ্গিক। চীন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিচ্ছে। এর সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। আমি মনে করি, বর্তমানে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রতি দুটি দেশকে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে চীন ছাড়াও ভারত ও জাপান বাংলাদেশকে বিপুল আর্থিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও তাদের সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের জন্য জরুরি হচ্ছে এসব বিনিয়োগ কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় সাধন। এটা করতে পারলে আমরা চীন ও ভারতসহ প্রতিটি দেশ থেকেই অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারব। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানও তখন হয়ে উঠবে আমাদের উন্নতির শিখরে পেঁৗছানোর চাবিকাঠি। তবে কেবল অবকাঠামো সুবিধা বাড়ালেই চলবে না, ব্যবসা সহায়ক আইন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। অগ্রাধিকার চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক এখন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। উন্নয়ন খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যত বাড়বে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ততই বাড়বে। এভাবে চলতে পারলে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েই বাংলাদেশ বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে।

এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশকে সুশাসনের প্রতিও নজর দিতে হবে। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে যেতে পারে অধরা।

Disclaimer: This blog was earlier published in দৈনিক সমকাল on 27 May 2017

 

Comments