Home / CPD in the Media / ঢাকার বস্তিবাসীদের আবাসন সমস্যার সমাধানে তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদকরণের জন্য বিনিয়োগ ও গবেষণা প্রয়োজনঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

ঢাকার বস্তিবাসীদের আবাসন সমস্যার সমাধানে তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদকরণের জন্য বিনিয়োগ ও গবেষণা প্রয়োজনঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Published in প্রথম আলো on Wednesday, 29 March 2017

প্রথম আলো-ব্লাস্ট গোলটেবিল বৈঠক

বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বস্তিবাসী তথা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) নগর পরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়া বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, দেশের নগরগুলোতে বসবাসরত এই বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সরকারের এ–বিষয়ক কোনো নীতিমালা কিংবা পরিকল্পনার কোনো উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে ড. কামাল হোসেন (ডানে) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক l ছবি: প্রথম আলো
কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে ড. কামাল হোসেন (ডানে) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক l ছবি: প্রথম আলো

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘সুপরিকল্পিত নগর: সবার জন্য বাসস্থান’ শীর্ষক এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সহযোগিতায় প্রথম আলো এ বৈঠকের আয়োজন করে।

বৈঠকে বক্তারা বলেন, নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তা না হলে কোনো পরিকল্পনা কিংবা উন্নয়ন ভারসাম্যপূর্ণ হবে না। সরকারের একার পক্ষে বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে বস্তিবাসীদের বাসস্থানের জন্য ভূমি বরাদ্দ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে ব্লাস্টের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের ১৯৯৩ সালের একটা পুরাতন গৃহায়ণ নীতিমালা ছিল। ২০১৬ সালে আরেকটি হয়েছে। কিন্তু ২০ বছরের বেশি সময়ে আমরা এর কোনো বাস্তবায়ন দেখিনি। ভাষানটেকে দরিদ্র মানুষের একটি আবাসন প্রকল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি নিজেও সেই জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রকল্প আর দরিদ্রদের থাকল না। সেখানে একসময় রিয়েল এস্টেট ঢুকে গেল।’

নগর দরিদ্রদের আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করার জন্যই ভাষানটেক প্রকল্পের ব্যর্থতার একটা তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য শুধু ঢাকা নিয়ে চিন্তা করলে হবে না। গোটা দেশের নগরগুলোর পরিকল্পনার কথা ভাবতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘ঢাকার প্রায় ৩০ লাখ বস্তিবাসীকে পুনর্বাসন করা বিষয়টি আসলেই কষ্টসাধ্য। সরকারি জায়গায় যে বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে, তার পেছনে প্রতাপশালীরা আছেন। আর সিটি করপোরেশনের বস্তি উন্নয়ন কর্মসূচিতে বস্তিবাসীকে কিছু চিকিৎসাসেবা দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ নেই।’

এই সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য গবেষণার পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর জোর দেন এই মেয়র।

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক নগর দরিদ্রদের আবাসনের সমস্যা নিরসনে সংস্থাটির কয়েকটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এ ব্যাপারে সবাই এক টেবিলে বসে নীতিমালা নির্ধারণ করে সেটা বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে।’

বৈঠকে নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গোটা দেশের নগরায়ণ প্রক্রিয়ার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘জেলা ও পৌরসভা পর্যায়ের প্রায় ৪০০ শহরের মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়ে আছে। সেটা সুন্দরভাবে হয়েছে কি না, কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে কিংবা হচ্ছে, সে ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে।’

ঢাকার বস্তিবাসীদের আবাসন সমস্যার ব্যাপারে বৈঠকে উপস্থিত ডিএনসিসি মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘দরিদ্রদের আবাসনের ব্যবস্থা করা এক জিনিস, আর বস্তি উন্নয়ন আরেক জিনিস। খোঁজ নেন সরকারের কতটা খাসজমি আছে। আপনি সেটা সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিতে পারেন।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই সমস্যার কার্যকর সমাধানে হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বিনিয়োগ ও গবেষণার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বিষয়টিকে একটা বড় কাঠামোর মধ্যে এনে বাংলাদেশের অন্যান্য পরিকল্পনার মিলিয়ে চিন্তা করতে হবে। এ বিষয়ে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালারও একটা পর্যালোচনা দরকার। এ ছাড়া সমন্বিত যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া এ ব্যবস্থার সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারাহ হোসেন বলেন, বস্তি উচ্ছেদের ব্যাপারে আদালতের যে স্থগিতাদেশগুলো আছে, সেখানে সিটি করপোরেশনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কিংবা অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়কের দায়িত্ব নিতে পারে।

বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ফেরদৌস জাহান ‘কমিউনিটি পার্টিসিপেশন ইন রিহ্যাবিলিটেশন অব স্ল্যাম ডুয়েলার্স অ্যান্ড পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ শীর্ষক একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন। এতে তিনি ভারতের মুম্বাইয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মুম্বাই আরবান প্রজেক্টের আওতায় প্রায় ৫০ হাজার বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের একটি সফল উদ্যোগ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, একজন বস্তিবাসী প্রতি মাসে যে ঘরভাড়া দেন, সেই টাকায় নয় বছরে তিনি একটা বাড়ির মালিক হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সরকার যদি নামমাত্র মূল্যে জমি দেয় আর বাংলাদেশ ব্যাংক সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে, তাতে কোনো ধরনের সরকারি বিনিয়োগ ছাড়াই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) নগর কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ আশেকুর রহমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারি বিনিয়োগের অন্তত ২০ শতাংশ নগর দরিদ্রদের আবসনের জন্য বিনিয়োগের পরামর্শ দেন। এ ছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আবাসন ঋণ প্রদানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

একই মত ব্যক্ত করেন নগর পরিকল্পনাবিদ সালমা এ শাফি ও আরবান বাংলাদেশের সমন্বয়ক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন।

নগর দরিদ্র বস্তিবাসী উন্নয়ন সংস্থার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, ‘সবাই আমাদের ঠেলে ফেলতে চায়। কিন্তু দরিদ্র হলেও আমরা কাজ করে খাই, দেশের বোঝা না। আমরা যদি আপনাদের আশপাশে না থাকি তাহলে আপনাদের কী অবস্থা হবে?’

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।

Comments

Check Also

আবগারি শুল্কের হার বাড়ানো হলে মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়বেঃ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকের জমানো টাকার ওপর আবগারি শুল্ক ৬৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর এ ঘোষণায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পাবলিক প্লেসে অনেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ করের কারণে ব্যাংকের আমানত কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা।