Home / CPD in the Media / অবকাঠামো চাহিদা পূরণ হলে পদ্মা সেতু কেন্দ্রীক সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে: ড. মোয়াজ্জেম

অবকাঠামো চাহিদা পূরণ হলে পদ্মা সেতু কেন্দ্রীক সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে: ড. মোয়াজ্জেম

Published in বাংলা ট্রিবিউন  on Tuesday, 24 October 2017 

পদ্মা সেতু জাগাবে পিছিয়ে পড়া ২১ জেলাকে

গোলাম মওলা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে পদ্মা সেতু। এই সেতু ঘিরেই সোনালী ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছেন এই অঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ কাড়বে, গড়ে উঠবে এসব জেলায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা। এ সেতু দিয়ে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে এশিয়ান হাইওয়েতে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘোরার পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থান। পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর পর বাংলা ট্রিবিউনকে এসব প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ২১টি জেলা হচ্ছে- খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী।

প্রসঙ্গত যে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয়। এ সেতুতে মোট ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এ সেতুর কাজ শেষ হবে বলে আশা করছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় ইতোমধ্যে শিল্পায়নের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মংলা বন্দরে পদ্মা সেতুর সুফল এখনই পাওয়া যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ইতোমধ্যে চালু হয়ে গেছে। গার্মেন্টসসহ রফতানিমুখী নানা ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে।’

সাবেক এই মন্ত্রীর মতে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়ার আগেই দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় ‘শিল্প বিপ্লব’ ঘটবে। ২০১৮ সালের পর অর্থনীতিতে এর সুফল পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘২০৫ একর জমি নিয়ে এই অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন হচ্ছে। এই অঞ্চলে ইপিজেড আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সবই হচ্ছে পদ্মা সেতুকে সামনে রেখে। খান জাহান আলী বিমানবন্দর এখন পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হতে যাচ্ছে। রেলের কাজও চলছে পুরোদমে। এর সঙ্গে চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ এবং পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হলে দক্ষিণাঞ্চল হবে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চল।’

এদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ। খুলনা চেম্বারের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুততম হবে। এতে সময় ও যাতায়াত খরচ কমবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ অঞ্চল থেকে দেশের দূর-দূরান্তে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীরাও দারুণভাবে উপকৃত হবেন।

খুলনা চেম্বারের সভাপতি কাজী আমিনুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা নিশ্চিত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যুগান্তকারী উন্নয়ন হবে। এ অঞ্চলের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি আসবে, আয় বৈষম্যও কমে যাবে।’

খুলনা চেম্বারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মংলার গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহন করে মংলা বন্দরের মাধ্যমে রফতানি ও আমদানি করতে উৎসাহিত হবেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর পায়রা বন্দরের গুরুত্বও বাড়বে। প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা হলে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এই বন্দরও এক বৃহত্তম বন্দরে রূপান্তরিত হবে। এমনকি ভূটান, পূর্ব নেপাল ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব প্রদেশের জন্য পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

খুলনা চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিমায়িত মৎস্য ও পাট শিল্প যার অধিকাংশ খুলনা থেকে রফতানির মাধ্যমে আয় হয়ে থাকে। পদ্মা সেতু হলে এই আয় আরও বাড়বে। পাশাপাশি কমে যাবে পণ্য পরিবহণেরও খরচ। একইভাবে পদ্মা সেতুতে রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকায় দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন, সাধারণ মানুষের যাতায়াতসহ পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গেও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের এক নতুন সম্ভাবনার দিক উন্মোচিত হবে।

অবশ্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়নের সুফল পেতে এখনই গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, পদ্মা সেতু কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দেবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হলে দেশে পদ্মা সেতুকেন্দ্রীক সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ভবিষ্যতে এই সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুর সড়ক ও রেলপথ এই দু’য়ের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলকে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, রফতানি বাড়াতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বপ্নের এই সেতুকে মাথায় রেখে মানুষ নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে দিয়েছে। সামনে আরও নদী বন্দর, সমুদ্র বন্দর চালু হতে যাচ্ছে। মংলা বন্দরেরও প্রসার ঘটছে, ইকোনমিক জোন হচ্ছে। এ কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়নের সুফল পেতে এখনই গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর ওপর জোর দিতে হবে।’

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি লিয়াকত হোসেন লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে আমার একটি কারখানা ছিলো। পদ্মা সেতু হচ্ছে দেখে চট্টগ্রামের ওই সম্পত্তি বিক্রি করে বাগেরহাটে শিল্প গড়েছি। আমার মতো অনেকেই পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা দেখে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাতেই নতুন নতুন শিল্প গড়ে তুলছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতুর সুফল পেতে এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এই সময়ে ভ্যাট, ট্যাক্স আরোপের নামে অহেতুক হয়রানি করা না হলে ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলকে বেছে নেবে। ইতোমধ্যে ফরিদপুর, মাদারীপুর এবং খুলনার খালিশপুরের অর্থনৈতিক জোনের সীমানা নির্ধারণ হয়ে গেছে। হয়ত আগামী দশ বছরের মধ্যে এই অঞ্চল হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাজধানী।’

খুলনা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. মিজানুর রহমান মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মংলা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগযোগ বাড়বে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা আমূল পরিবর্তন হবে। বেনাপোল, এমনকি পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বাড়বে।’

পদ্মা সেতুকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২১ জেলায় নানারকম শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতু হচ্ছে, এর সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস আর বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হবে শিল্পের নগরী। কয়েকটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এই অঞ্চলে ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। নতুন করে জুট মিল গড়ে উঠছে। ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা হয়েছে, ইপিজেড করা হয়েছে। পায়রা বন্দরে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে তোলা হচ্ছে।’ এসময় তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও ফোর লেনের রাস্তার দাবিও জানান।

Comments

Check Also

জাতীয় রপ্তানি ড্যাটায় এক্সেসরিজকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান ড. মোয়াজ্জেম

তৈরি পোশাক শিল্পের এক্সেসরিজ খাত এগিয়ে যেতে না পারলে মূল খাত অর্থাৎ পোশাক খাতের রপ্তানিও এগিযে যেতে পারবে না। তখন রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। বর্তমানে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তুলনামূলক কম দামে মানে উন্নত দেশীয় এক্সেসরিজ সরবরাহ করছেন এসব খাতের উদ্যোক্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *