///পাকিস্তানের ভাঙন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় – রওনক জাহান

পাকিস্তানের ভাঙন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় – রওনক জাহান

2017-04-17T11:45:45+00:00 April 10th, 2017|Op-eds and Interviews, Rounaq Jahan|

Published in দৈনিক ইত্তেফাক on Monday, 10 April 2017

পাকিস্তানের ভাঙন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়

১৯৭২ সালে প্রকাশিত আমার প্রথম বইটি ইংরেজি ভাষায় কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় যার নাম ‘পাকিস্তান: ফেইলুয়র ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’। বইটি গত ৪৫ বছর ধরে দেশে এবং বিদেশে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ে আসছে। এখনো অনেক পাঠক মনে করেন পাকিস্তান কেন ভেঙে গেল এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় কেন হলো তার একটি ভালো বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে হলে এই বইটি পড়া প্রয়োজন। এত যুগ ধরে বইটি দেশে-বিদেশে সমাদৃত হওয়ায় লেখক হিসেবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। যেহেতু আমাদের দেশের বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই বাংলায় লেখাপড়া করে তাই বহুদিন ধরেই অনেকে আমাকে বইটির একটি বাংলা অনুবাদ করার জন্য অনুরোধ করে চলেছেন। কিন্তু সন্তোষজনক না হওয়ায় এখন পর্যন্ত বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। আজকে আমি এ লেখায় বইটির প্রধান কিছু প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপরে আলোকপাত করব।

এই বইটির কাজ আমি প্রধানত শুরু করি ১৯৬৭-৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যলয়ে পিএইচডি থিসিস হিসেবে। ১৯৬৫ সালে আমি যখন প্রথম হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য যাই, তখন দেখি সে দেশে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইউব খানকে বিবেচনা করা হচ্ছে খুবই সুখ্যাত একজন আধুনিক নেতা হিসেবে— যিনি তার দেশকে স্থিতিশীল রাখছেন এবং তার ফলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। ১৯৫০-৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাষ্ট্র বিজ্ঞানীই সামরিক শাসককে সুনজরে দেখতেন। তারা ভাবতেন সামরিক শাসন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনে এবং তার ফলে দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আগায়।

হার্ভার্ডে আমার অধ্যাপকদের এমন মনোভাব দেখে আমার খুবই আশ্চর্য লাগল। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার দুই বছর আগে ১৯৬২ সাল থেকেই তখন আমাদের দেশে আইউব বিরোধী আন্দোলন আমি দেখে এসেছি। তাই আমার থিসিসে আমি বিশেষ করে আইউব খানের শাসন আমলের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণের উপর জোর দিয়েছি এবং দেখতে চেয়েছি আইউবের দশ বছরের শাসন, যাকে তিনি ‘উন্নয়নের দশক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই দশকের প্রভাব দেশের রাজনীতির ওপর কেমন পড়ছে। অনেক তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করে আমি দেখলাম যে, যদিও তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর, বিশেষ করে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর কিছুটা জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু বাঙালিদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের যে দাবি ছিল তা তিনি আমলেই নিচ্ছিলেন না। ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল একটি ক্ষুদ্র সামরিক এবং বেসামরিক আমলা গোষ্ঠীর হাতে, যেখানে বাঙালিদের কোনো অংশীদারিত্ব ছিল না। আমার থিসিসে বহু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমি দেখিয়েছিলাম কেমনভাবে পাকিস্তান ধীরে ধীরে ভাঙনের পথে চলেছে এবং কেমন করে ধীরে ধীরে বাঙালিরা স্বায়ত্তশাসন এবং পরে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে আগাচ্ছে।

এই বইটিতে কিছু তাত্ত্বিক ধারণার অবতারণা করেছিলাম যা আগে কোনো গবেষক করেননি। যেমন আমি বিশ্লেষণ করেছি পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন ও জাতি গঠনমূলক নীতি ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে এবং তাতে করে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভাঙনের দিকে এগুচ্ছে। রাষ্ট্র গঠনের নামে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার একের পর এক ক্ষমতা নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করেছে। সামরিক এবং বেসামরিক আমলারা দেশ শাসন করছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কখনোই ক্ষমতায় সমঅধিকার দেওয়া হয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে ছিল বহু জাতি, দরকার ছিল সব জাতিকে সমঅধিকার এবং সব জাতিকে স্বায়ত্ত শাসন দেওয়া। ভারত যেভাবে ভাষাভিত্তিক সব জাতিকে স্বীকার করে নিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের কোনো সরকার সেরকম দূরদর্শী বহুজাতিভিত্তিক নীতি গ্রহণ করেনি এবং তারই ফলে শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রই টিকে থাকতে পারেনি। এছাড়া আমি আরো আলোচনা করেছি কিভাবে বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিবর্তন হচ্ছে। পাকিস্তান হওয়ার সময় বাঙালিদের নেতৃত্বে ছিল উর্দু ভাষাভাষী বাঙালিদের হাতে, যেমন খাজা নাজিমুদ্দিন, কিন্তু পরে নেতৃত্ব চলে যায় বাংলা ভাষাভাষীদের হাতে, যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতৃত্বের এই বিবর্তনও আমাদের আন্দোলনকে ক্রমাগত স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আমার থিসিসের কাজ শেষ হয় ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে। যেহেতু আমার থিসিসের কাজ খুবই সময়োপযোগী ছিল তাই কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় পোস্ট ডক্টোরাল ফেলো হওয়ার জন্য। যার প্রধান কাজ হবে আমার থিসিসকে বর্ধিত ও পরিমার্জিত করে বই হিসেবে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে দিতে হবে প্রকাশনার জন্য।

আমি ১৯৬৯-১৯৭০ সালে থিসিসটিকে বইয়ে রূপ দেওয়ার কাজ করি। সেই সময় দুইজন অধ্যাপক পাণ্ডুলিপি পড়ে মন্তব্য দেন। হাওয়ার্ড রিগিন্স, যিনি শ্রীলঙ্কার ওপর বিশেষজ্ঞ, তিনি বলেন, আমার কাজ খুবই বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ। আরেকজন ওয়েন উইলকক্স, যিনি পাকিস্তান বিশেষজ্ঞ, তিনি বললেন, অনেক তথ্যউপাত্ত আছে—তবে আমি বইটি লিখেছি বাঙালি দৃষ্টিকোণ থেকে।

যাহোক, বইটি প্রেসে দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল। এরপর ১৯৭২ সালে বইটি যখন প্রকাশিত হলো তখন সকলেই বলল, এর চেয়ে আর কোনো ভালো বই প্রকাশিত হয়নি যা পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন কেন পাকিস্তান ভেঙে গেল এবং কেন বাংলাদেশের জন্ম হলো। বইটি বহু বছর যুক্তরাষ্ট্রের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকায় ছিল এবং এখনো বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকায় আছে।

লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞানী