Home / CPD in the Media / Dr Khondaker Golam Moazzem on state of global economy

Dr Khondaker Golam Moazzem on state of global economy

Published in Bonik Barta on Wednesday, 5 August 2015.

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ও এবারের বাজেট

৪ জুলাই মার্কেট পালস ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ও এবারের বাজেট’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বণিক বার্তার সেমিনার কক্ষে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ ক্রোড়পত্রে প্রকাশ হলো—

 

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে নানাভাবে সম্পর্কযুক্ত। বাণিজ্য তো বটে, অর্থনৈতিক উন্নয়নেও একে অন্যের পরিপূরক ভূমিকা রাখছে

বিশ্বায়নের এ সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে নানাভাবে সম্পর্কযুক্ত। বাণিজ্য তো বটেই, অর্থনৈতিক উন্নয়নেও একে অন্যের পরিপূরক ভূমিকা রাখছে। সরকার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৭-৮ শতাংশে নিয়ে যেতে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে স্বল্প সম্পদের এ দেশে বিদেশী বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগে এক ধরনের ভাটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তার পরও বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। গড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা রয়ে গেছে অনেক। সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রবেশ করতে যাচ্ছি আমরা। জ্বালানি তেলের দাম কমলেও আমাদের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করায় ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে নানামুখী সংস্কারের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত, সেবার মান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের প্রশ্ন প্রভৃতি নিয়েই আমরা আজ আলোচনা করব। তবে সবার আগে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ও এবারের বাজট শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মনজুর হোসেন।

 

 

ড. মনজুর হোসেন

গত তিন বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমছে; যেখানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল থিমই হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন

চলতি অর্থবছর কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। একটা ভালো খবর আমরা শুনেছি, গতবারের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় পূরণ হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এটি দাবি করছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে আমাদের মধ্যে সংশয় ছিল একসময়। সেদিক থেকে এবারের বাজেটে কর রাজস্ব আহরণের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে ধারণা। এ বাজেটে কর রাজস্ব আহরণে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলো দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে কিনা, সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে ৫৬ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশী অনুদান থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে বাজেটে। আবার অভ্যন্তরীণ ঋণের দুটি ক্ষেত্র রয়েছে— ব্যাংক ঋণ এবং নন-ব্যাংক ঋণ। গত বছর নন-ব্যাংক ঋণ বেশি ছিল। এবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর ফলে কী অবস্থা দাঁড়াবে, সেটা সময়ই বলবে। তবে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর ফলে ব্যাংকিং সেক্টরের সঙ্গে একটি সংযুক্ততা তৈরি হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা হয়তো আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। অর্থায়নের অনুপাতে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ১৯ শতাংশ, নন-ট্যাক্স রাজস্ব ৯ শতাংশ এবং কর রাজস্ব ৬০ শতাংশ। মূলত অর্থায়নে আমাদের বড় উত্সই হলো কর রাজস্ব। খাতওয়ারি বরাদ্দ পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, গত তিন বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমছে; যেখানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল থিমই হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ও এ বিষয়ে তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আলোচ্য খাতে বরাদ্দ কেন কমছে, তা আলোচনা হতে পারে। যেহেতু আমরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কিত বিষয়গুলোর উন্নয়নে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, সেহেতু এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমে আসাটা চিন্তার বিষয়। চলতি বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ বাজেটে যে বর্ধিত অংশ ধরা হয়েছে, সেটা আসলে নতুন পে-স্কেল দেয়ার জন্য। আর বাকিটাকে সার্বিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এবার অর্থনৈতিক দিকে একটু নজর দেয়া যাক। দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি পড়ে আছে। চলতি বাজেটে আগামী বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ শতাংশ। আমি মনে করি এটি যৌক্তিক। কিন্তু সেটি অর্জনে যে বিষয়গুলোয় নজর দেয়া দরকার, তার মধ্যে বিনিয়োগ অন্যতম। গত অর্থবছরে কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৩২ শতাংশ, এটা প্রায়ই পূরণ হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এ বছর ২৭ দশমিক ৬২ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এখানেও বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ করা যাচ্ছে।

ভ্যাট আহরণেও প্রায়ই একই ধরনের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে এবং আমদানি শুল্ক আহরণে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ২৪ শতাংশ। চলতি বাজেটে নতুন কিছু বিষয় আছে। করপোরেট কর কিছুটা কমানো হয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানিগুলোর কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং ব্যাংক ইন্স্যুরেন্স ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা অনেকেই বলছিলাম, করপোরেট কর কমানো হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটবে। সেদিক থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এটা বিনিয়োগের জন্য এক ধরনের প্রণোদনা হতে পারে।

এবার আসা যাক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে। খেয়াল করলে দেখা যাবে ২০১৪ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হচ্ছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাত্ আগের চেয়ে বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা রিকভার করছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আশা করতে পারি, আমাদের রফতানি আরো বাড়বে। রফতানি প্রবৃদ্ধি ও ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাড়লে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা মোটেই অসম্ভব হবে না।

 

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

মূল বাজেটের আকার নির্ধারণ করে এনবিআরের টার্গেট নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা বড্ড বেশি বড় হচ্ছে এবং তা অর্জনযোগ্য হচ্ছে না

ড. মনজুর হোসেনের উপস্থাপনায় বারবার এসেছে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রসঙ্গ। সেখানে ২০১১ সাল থেকে এনবিআরের টার্গেট ও অর্জনগুলো সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১১ সালে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করে। লক্ষণীয়, গত দুই বা তিন অর্থবছর পর্যন্ত এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ভিন্নমাত্রায় নিরূপিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান। মূলত এজন্যই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথমে ধরে নেয়া হচ্ছে, জাতীয় বাজেট এত হবে। জিডিপির লক্ষ্য ধরে ৫ শতাংশ ঘাটতি বিয়োগ করা হচ্ছে। এর পর যা থাকে, সেটাই অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা রাজস্ব। আবার সেখান থেকেও করবহির্ভূত রাজস্ব বাদ দিয়ে যা থাকে, তা-ই এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা সাব্যস্ত হচ্ছে। অব্যবহিত দুই বছর আগে এনবিআরের তত্কালীন চেয়ারম্যান এ ব্যবস্থার প্রতিবাদও করেছিলেন। এনবিআরের টার্গেট কী হবে, সেটা নিয়ে আগে সম্পদ কমিটির সঙ্গে এনবিআরের আলোচনার পরই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হতো। এটাই প্রথা বা নিয়ম। কিন্তু গত দু-তিন অর্থবছরে মূল বাজেটের আকার নির্ধারণ করে সেখান থেকে ঘাটতি ও করবহির্ভূত রাজস্ব বিয়োগের মাধ্যমে সাধারণ অঙ্ক কষে এনবিআরের টার্গেট নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা বড্ড বেশি বড় হচ্ছে এবং তা অর্জনযোগ্য হচ্ছে না। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মোট বাজেট থেকে ভর্তুকি বাদ দিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদের যে পরিমাণ দাঁড়ায়, তার থেকে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্বের পরিমাণ আনুপাতিক হারে বাড়িয়ে না ধরার ফলে এনবিআরের এবারের লক্ষ্যমাত্রা তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট বেশি হতে হয়েছে। এখানে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্বের জোগানদাতা সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতার ও দায়িত্বশীলতার ওপর বাড়তি চাপ বা দায়িত্ব দেয়াটা ততটা আমলে না নেয়ায় গাণিতিক নিয়মে চাপটা এনবিআর রাজস্বের ওপর পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০১৪-১৫ অর্থবছর রাজস্ব আয়ের ‘সংশোধিত’ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বা হচ্ছে— অর্থবছর শেষ হওয়ার পরের দিন ঘোষিত এ সংবাদ নিঃসন্দেহে প্রশান্তিদায়ক, স্বস্তির ও অভিনন্দনীয়। এ সাফল্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাম্প্রতিক বাড়তি প্রয়াস-প্রচেষ্টা ও দক্ষতার ফসল। রাজস্ব বোর্ড তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ হিসাবের ভিত্তিতে রাজস্ব আয়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বা ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অর্জিত বা ঘোষিত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে যথাযথ জমাপ্রাপ্তির হিসাব মিলিয়েই প্রকৃত আয়ের অবস্থা জানা যাবে। ঘোষিত রাজস্ব আয় হিসাবের মধ্যে সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম প্রাপ্তি কিংবা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকায় আপিলকারীর উত্স থেকে প্রাপ্তিও রয়েছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার দু-তিন মাসের মধ্যে সমন্বিত হিসাব মেলালে আশা করা যায়, বর্তমানে ঘোষিত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ হয়তো বেশিও হতে পারে।

 

 

মামুন রশীদ

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যতটা প্রাধান্য পাওয়া উচিত পূর্বোক্ত খাতগুলোর, তার চেয়ে ঢের দরকার পুঁজির সংবর্ধন— ব্যক্তি ও জাতীয় পুঁজির সংবর্ধন

আমি আশা করেছিলাম, বাজেট-সংক্রান্ত আলোচনায় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত নিয়ে বেশি আলোচনা হবে। এরই মধ্যে টেলিভিশন কিংবা বণিক বার্তাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে বাজেট নিয়ে যেসব পর্যবেক্ষণ এসেছে, প্রত্যাশা করেছিলাম সেসবে মূলত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতের একটা ছোঁয়া থাকবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতটি আরো জরুরি; কারণ এর সঙ্গে মার্কেট পালসও জড়িত। মার্কেট পালসও চায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ুক। আমরা জানি, আমাদের পুঁজিবাজারের যে সমস্যা রয়েছে, সেটা ছোট ছোট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা। আমরা এটাকে পরিবর্তন করতে চাই। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্বিনির্মাণে আমাদের পুঁজিবাজারের স্থায়িত্ব দরকার। আমাদের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বহির্মুখী হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ইদানীংকালের দুটি বিষয় অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। এক. বিশ্বায়ন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উঠে আসছে, দেশের পণ্য বিশ্ববাজারে আরো যাচ্ছে, বাইরে বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। দুই. পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সবার ঐকমত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে আমাদের পুঁজিবাজার আরো স্থায়িত্ব অর্জন করবে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা করলে আমাদের আমদানি ও রফতানির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমদানির ক্ষেত্রে আমরা দেখি, কীভাবে ক্যাপিটাল মেশিনারি কেনার ক্ষেত্রে উত্সাহিত করা হচ্ছে। গেল কয়েক বছরে বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো। মনজুর হোসেন যথাযর্থই বলেছেন, আমাদের ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে রয়েছে। সেক্ষেত্রে কিছুটা রিকভার করেছে ২৮ শতাংশ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সরকারি প্রচেষ্টা। তবে সে বিনিয়োগ আমাদের বহির্মুখী খাত সম্প্রসারণ বা রফতানি আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যয়িত হচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বিনিয়োগ যেখানে যাচ্ছে, সেগুলো প্রাধিকার খাত নয়। প্রাধিকার খাত হতে পারে যদি না আমরা আগের মতো দারিদ্র্য বিমোচন বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতকে ধরে বসে থাকি। এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যতটা প্রাধান্য পাওয়া উচিত পূর্বোক্ত খাতগুলোর, তার চেয়ে ঢের দরকার পুঁজির সংবর্ধন— ব্যক্তি ও জাতীয় পুঁজির সংবর্ধন। এ দুটোকে বাড়াতে অবশ্যই চাই বিনিয়োগ।

বিশ্ব অর্থনীতির চলন খেয়াল করলে দেখা যায়, চীনের প্রবৃদ্ধি জানুয়ারি-মার্চে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, সেটা ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশ চীনের একটি প্রতিযোগী দেশ হিসেবে তৈরি পোশাক খাতে ব্যক্তি পুঁজির সংবর্ধন ত্বরান্বিত করতে সরকারের আরো উদ্যোগ আশা করব।

বাংলাদেশে অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক দিক আমরা লক্ষ করছি। নিম্নমধ্যম পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি এবং ক্রমবর্ধমান স্থানীয় সুদের হারের হ্রাস। এগুলোর আলোকে তৈরি পোশাক খাতকে প্রণোদিত ও বিদেশী বিনিয়োগকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারি, সেটি নিয়ে ভাবা দরকার। আমার দেখতে পারছি, আমাদের সেবা খাতে বিদেশী বিনিয়োগ উত্সাহের স্ফুরণ ঘটেছে। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সে ধরনের স্ফুরণ দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিচ্ছে, ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ভূমি অধিগ্রহণে তিন থেকে চার বছর লাগছে। ফলে উদ্যোক্তারা নিরুত্সাহিত হচ্ছেন।

বিদ্যুত্ খাতেও আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার অনেক উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্যে রামপাল প্রকল্প সরকারের একটি ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট। এ প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। আমরা আগেই দেখেছি, ইকুইটি প্রিন্সিপলের ভিত্তিতে এনভায়রনমেন্টাল কমপ্লায়েন্ট প্রজেক্টের দিকে বিদেশী অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে ঝুঁকছে। এমনকি ভারতের আদানি ও রিলায়েন্স গ্রুপের বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে বেশ উত্সাহ দেখতে পাচ্ছি। এক্ষেত্রে জ্বালানি খাতের প্রস্তাবিত প্রজেক্টগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগ যেমন বাড়বে, তেমনি রফতানি বাড়বে।

২০১৬ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রজেক্ট সম্পন্নের কথা বলছে সরকার। এটা আমাদের বাণিজ্যের লাইফলাইন, ট্রেড করিডোর। কিন্তু সেটা শেষ হচ্ছে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশিতে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো চার দফায় সরকারের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্তব্য টাকার অঙ্ক বাড়িয়েছে। এতে আমাদের ব্যালান্সশিটে প্রভাব পড়ছে।

এবার আসা যাক তেলের দাম ও পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার পরও দেশে পণ্যটির দাম সমন্বয় না করায় আমদানিকৃত তেলে আমাদের প্রায় ২ বিলিয়ন টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। কেননা এ টাকাটা সরকারি কর্মচারীদের অতিরিক্ত বেতন দিতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে সঙ্গত কারণেই অন্যান্য ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। আমাদের পুঁজিবাজারকে উত্সাহিত করার জন্য সম্ভবত এবারই সরকার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও চিন্তাপ্রসূত উদ্যোগ নিয়েছে। মার্কেট পালস ও লংকাবাংলা শুরু থেকেই বলে আসছে, পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে কিছুটা হলেও ধন্যবাদ জানাই।

 

ড. গোলাম মোয়াজ্জেম

বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাবের উত্তাপটা অনুভব করতে শুরু করেছে। সেটা আগামীতে আরো বাড়বে বলেই ধারণা

বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাবের উত্তাপটা অনুভব করতে শুরু করেছে। সেটা আগামীতে আরো বাড়বে বলেই ধারণা। সুতরাং তার জন্য একটা প্রস্তুতি দরকার। এটা একটা দিক। দুই. বাংলাদেশ এরই মধ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। এখন হয়তো নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ে বাংলাদেশ নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে, নিজের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করবে, সে বিষয়গুলো এখানে জড়িত। এর সঙ্গে কিছুটা বাজেট এবং অন্যান্য বিষয়ও জড়িত। বিশ্ব অর্থনীতির যে প্রেক্ষাপটগুলো আমাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, তার মধ্যে অবশ্যই আমদানি, রেমিট্যান্স, বিদেশে লোক পাঠানো— এমনকি বৈদেশিক রাজনৈতিক অর্থনীতি অন্যতম। দেখা যাচ্ছে, রফতানি বাজারগুলো একটা ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। সুতরাং সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়েছে, সেটাকে কেবল নিজেদের দোষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এতে বিশ্ব অর্থনীতির একটি প্রভাব আমাদের রফতানি বাজারের ওপর পড়েছে। গ্রিসের ঘটনাও আমাদের রফতানি বাজারে পড়ছে। গ্রিসের অর্থনীতিতে যে চাপ বেড়েছে, ইউরোপে যে পরিবর্তন হচ্ছে, সেগুলোও আমাদের রফতানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। আরেকটি বিষয় হলো ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। আমাদের মুদ্রার সঙ্গে এটিকে মিলিয়ে দেখলে মনে হবে যে, একটি জায়গায় আমরা স্থিতিশীল আছি। ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার অনেক অবমূল্যায়ন ঘটেছে। অর্থাত্ বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানির চেয়ে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা অনেক লাভজনক। এ সুবিধা পাচ্ছে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম। ফলে আমাদের রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এটাও মনে রাখা দরকার। তেলের মূল্যপতনের বিষয়টি কিন্তু একপক্ষীয় নয়। বর্তমানে অনেকটা একপক্ষীয় আলোচনা দেখছি। তেলের মূল্য হ্রাসের জন্য তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর রাজস্ব কমছে। ফলে তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের যে উন্নয়ন প্রকল্প থাকে, সেখানে আমাদের একটা সম্পৃক্ততা তৈরি হয় জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে। সেখানেও প্রভাব পড়ছে।

তেলের মূল্যপতনে আমাদের আমদানি ব্যয় কমেছে সত্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে টাকার বিনিময় হারের ওপর এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। টাকা প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত ডলার না কিনলে আরো শক্তিশালী হতো টাকা। সেক্ষেত্রে টাকা একটু ডিভ্যালু অর্থাত্ অবমূল্যায়ন করা হলে রফতানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক হতো। মার্কিন অর্থনীতির দুর্বল প্রভাব ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মার্কিন বন্ড কেনার ব্যাপারে যে আগ্রহ ছিল, সেটা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। এজন্য বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের পোর্টফোলিও উত্তরোত্তর বাড়ার অন্যতম কারণ এটি। এতে করে ব্যক্তিখাতে যেমন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তেমনি দ্বিপক্ষীয় স্টেট টু স্টেট বিনিয়োগেও উত্সাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সামগ্রিক আলোচনাকে বাজেটের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এর বড় অংশের সঙ্গে রাজস্ব ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের একটা সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে অনুন্নয়ন ব্যয়ের। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেখানে ধীরে ধীরে বিদেশী অর্থের তুলনায় অভ্যন্তরীণ অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। এটিকে আমরা নিজেদের সক্ষমতা বাড়ার সূচক হিসেবে নিতে পারি।

 

 

সাখাওয়াত হোসেন

বড় অবকাঠামো নির্মাণে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাজ যথাযথভাবে সম্পন্নের জন্য আর্থিক ও কারিগরি দিক থেকে যথাযথ সমন্বয় দরকার

আজকের আলোচনায় আমার জন্য উন্নয়ন বাজেটই প্রাসঙ্গিক। এবারের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় বাবদ যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা সঠিক ও সময়োচিতভাবে খরচ করতে পারলে বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হবে। দেখা যাচ্ছে, উন্নয়ন বাজেটে প্রায় প্রতি বছরই একটি শুভঙ্করের ফাঁকি থাকে। যেমন— পদ্মা সেতু কিংবা চার লেনের ট্রেড করিডোর। এখানে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে খরচ বেড়েছে। পরিকল্পিত উপায়ে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে না। বড় অবকাঠামো নির্মাণে জায়ান্ট মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে, তাদের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্নের জন্য আর্থিক ও কারিগরি দিক থেকে যে সমন্বয়ের দরকার, সেটা যথাযথভাবে হচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হলো, আমরা ব্লু ইকোনমির কথা বলছি। আসলে এটি ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা। সবে আমরা সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করেছি, এখন আমাদের তা রক্ষা করতে হবে। সমুদ্র সুরক্ষায় নিরাপত্তা দরকার। অথচ বাজেটে সমুদ্র-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ব্যয়ের কোনো প্রতিচ্ছাপ নেই। এখন আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। কিন্তু উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে ব্লু ইকোনমির শক্তি কাজে লাগাতে হবে। আমাদের আয়ের বৈচিত্র্যমুখিতা না থাকে, সম্পদ না বাড়ে, তাহলে হয়তো এক বা দুবার মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হতে পারি। তবে উন্নত দেশে পরিণত হতে পারব না। সুতরাং ব্লু ইকোনমির পূর্ণ ব্যবহারে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।

 

 

আসজাদুল কিবরিয়া

কেইপিজেড নিয়ে যে ঘটনা ঘটছে, সেটা সংকেত দিচ্ছে যে, আমরা বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে ততটা আগ্রহী নই

আমি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততার কয়েকটি সূচক নিয়ে আলোকপাত করব। আলোচনায় এফডিআই প্রসঙ্গ এসেছে। এটা আমাদের বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমাদের দেশে এখন এফডিআই কম আসছে বলে আলোচনা শুনছি বা জানছি। কিন্তু আসলে কেন কম, সেটা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। আমি এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, আমাদের পলিসি প্রায়োরিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের বিষয়টি সেভাবে নেই। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রাক্কলন খেয়াল করলে দেখা যাবে, সে তুলনায় বরং আমাদের বিদেশী বিনিয়োগ বেশি এসেছে। তার মানে কি এই— বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার কম? এটা একটু যাচাই করা যেতে পারে। যদি আমাদের নীতিতেই থাকে বিদেশী বিনিয়োগ উত্সাহিত করা হবে না, তাহলে যতই আলোচনা করি তা বাড়বে না বা আসবে না। সম্প্রতি কেইপিজেডে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা সংকেত দিচ্ছে যে, আমরা বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে ততটা আগ্রহী নই। এটা হলো একটা দিক।

আরেকটি দিক হলো রেমিট্যান্স প্রসঙ্গ। অনেক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য বা আরব দেশগুলোয় আমাদের জনশক্তি রফতানি কমে গেছে। এর মূলে কাজ করছে কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং তেলের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে দেশগুলোর অর্থনীতির নেতিবাচক প্রবাহ। ফলে দেশগুলোর উন্নয়ন তথা নির্মাণকাজে ভাটা পড়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের রেমিট্যান্সপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতে দেশে কীভাবে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানো যায়, সেটা এখনই ভাবা দরকার।

আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে একটি প্রসঙ্গেই শুধু বলতে চাই। এবারের বাজেটে পোশাক শিল্প রফতানির ক্ষেত্রে উেস কর কমিয়ে শেষ পর্যন্ত শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই ভাল সিদ্ধান্ত নয়। গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আলোচ্য শিল্পে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ উেস কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। এটা তো কোনো ভিত্তি নয়। এটা কেবল অন্তর্বর্তীকালীন প্রণোদনা। সুতরাং এটা সমন্বয় করার একটি বিষয় আছে। পোশাক শিল্প এত বড় একটি খাত ৩০ বছর পার করেছে, এখনো ম্যাচিউর হতে পারল না, দিনের পর দিন তাদের সুবিধা দিতেই হবে— এমন তো কথা নয়। তাদের কারণে নতুন সম্ভাবনাময় খাতগুলোকেও বঞ্চিত করতে হচ্ছে। এ দিকটা দেখা উচিত। আমরা যেহেতু নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ এবং সামনে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হব, সেহেতু আগামী দিনগুলোয় যখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি হবে, তখনো কি তাদের প্রণোদনা দিয়ে আসতে হবে। তাহলে ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর কি হবে? আমার মনে হয় এ ধরনের বৈষম্যমূলক বিষয়গুলো তুলে ধরা উচিত।

 

ড. শামসুল আলম

বিশ্বে গেল অর্থবছরে এফডিআই কমেছে ১৬ শতাংশ। সে হিসাবে বাংলাদেশে কমার হার কম। এফডিআই বাংলাদেশে উত্তরোত্তর বাড়বে

আমাদের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। এমনকি তা দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের চেয়ে কম। রাজস্ব প্রবৃদ্ধির এবারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ শতাংশ; যেখানে আমাদের উপমহাদেশেই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশ। আমাদের যখনই আলাপের সুযোগ পাই, তখন বলি গ্রামে গ্রামে কোটিপতি আছে এখন। কিন্তু তাদের অনেককেই রাজস্বের আওতায় আনা হয়নি। আমাদের তো বিদেশী বিনিয়োগ তেমন নেই। আগে ফরেন এইড এবং ফরেন গ্রান্ট এলেও এখন তা তেমন আসে না। বিশেষ করে গ্রান্টের প্রবাহ প্রায়ই শূন্যের কোটায়। সে হিসেবে তো রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। তা না হলে সরকার উন্নয়নকাজ করতে পারবে না। ২০১১ সালে এই এনবিআরই কিন্তু প্রায় ২৬ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। এবার ২৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। সে হিসাবে তা বেশি নয়। চ্যালেঞ্জিং বটে। কিন্তু অনার্জনযোগ্য নয়। বলা হচ্ছে বড় বাজেট। আমার মনে হয়, মূল সমস্যাটা বড় বাজেট নয়। সমস্যাটা হচ্ছে বাস্তবায়ন। অর্থাত্ টাকার অভাব নেই। কিন্তু তার যথাযথ বাস্তবায়ন বিশেষ করে গুণগত বাস্তবায়নই মূল সমস্যা।

এবারের বাজেটে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত সুন্দরভাবে বলা হয়েছে। বিশ্বের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর প্রক্ষেপণ আছে। এবার এ প্রক্ষেপণ ৩ দশমিক ১ শতাংশ। এর আগে ছিল ২ দশমিক ২। তার আগের বছর ছিল ২ দশমিক ৩। অর্থাত্ বিশ্ব প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনটা অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশ্ব বাণিজ্য যেটা আমাদের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। এটা দিয়েই আমরা বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এবার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ শতাংশ বাণিজ্য বাড়বে। এখন বিশ্বব্যাপী তেলের দামও কম। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটের আকার আমি সঙ্গতিপূর্ণ মনে করি। এটাতে আমি শঙ্কার কোনো কারণ দেখি না, নিঃসন্দেহে এটা ইতিবাচক। সেসঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও (ভোগ ও ব্যয়) কিন্তু বাড়ছে। এটাও আরেকটি ইতিবাচক দিক। সবাই জানেন, আমরা ২০১১ সাল থেকে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে ১ বা ২ বিলিয়ন ডলার এফডিআই সেই অর্থে আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত কম বলে স্বীকার করতে হবে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এফডিআই এসেছে মাত্র ৭০০ মিলিয়ন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। আবার ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সাড়ে ৪ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বে গেল অর্থবছরে এফডিআই কমেছে ১৬ শতাংশ। সে হিসাবে বাংলাদেশে কমার হার কম। আমি মনে করি, এফডিআই বাংলাদেশে উত্তরোত্তর বাড়বে।

 

 

ড. রিজওয়ানুল ইসলাম

প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শুধু কয়েকটি খাতে জোর দিলে হবে না। এর বাইরেও আমাদের ইকোনমিক ডাইভারসিফিকেশন দরকার

বাজেটকে বিভিন্নভাবে দেখা যায়। একটা হলো, বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। এটা যদি হয়, তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত এবং অন্যান্য প্রসঙ্গের খুব বেশি প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। তাছাড়া আরেকটু নেতিবাচকভাবে এটা দেখা যায়। আমাদের সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারকরাই বলেছেন, আমরা কিছুটা জানি বাজেট কীভাবে তৈরি হয়। বিভিন্ন মহলের প্রভাব, তদবিরসহ অনেক বিষয় এখানে থাকে। সুতরাং সবকিছুর একটা সম্মিলিত ফলাফল হলো বাজেট। তা-ই যদি হয়, বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, আলোচনা করা হয়েছে, পাস হয়ে গেছে। ফলে যা-ই কিছু আলোচনা করি না কেন, এ বাজেটে অন্তত তার প্রভাব পড়ছে না। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নের ওপর কিছুটা যদি প্রভাব রাখা যায়, ভবিষ্যতে যদি কোনো প্রভাব রাখা যায়। সুতরাং নেতিবাচক বিষয়গুলো উপেক্ষা করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দু-একটি কথা বলার চেষ্টা করব। বাজেটকে আমরা বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের সুপরিসর বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্তির চেষ্টা করা দরকার। শামসুল আলম সাহেব যথার্থই বলেছেন, সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বাজেট। সেটা আদর্শ এবং সেটা যদি হয়, তাহলে তো অতি চমত্কার। কিন্তু আমি কোনো বাজেটেই দেখি না, সেটিকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কিংবা মধ্যম মেয়াদের কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়। আমি এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ধরে দু-একটি কথা বলব। বিশ্ব অর্থনীতি কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং রাজনৈতিক বিষয় বাদ দিয়ে শুধু আন্তর্জাতিক অর্থনীতি দেখতে পারি না। টিপিপিতে কিন্তু ভিয়েতনাম অন্তর্ভুক্ত এবং সেখান থেকে দেশটি অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। গত কয়েক বছরের রফতানি বৃদ্ধির হার দেখলে বোঝা যাবে, কয়েকটি অর্থনীতি আমাদের চেয়ে ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এ ধরনের বিষয়গুলো শুধু অর্থনৈতিক নাকি অর্থনীতি এবং রাজনীতির সম্মিলিত ফলাফল, সেটা নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক যে বিষয়টি এখানে একেবারেই আলোচনায় আসেনি সেটি হলো, ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা। এর আলোচনা সেপ্টেম্বর থেকেই চলছে। আমার ধারণা, এ বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ সেটি চূড়ান্ত হবে এবং বাংলাদেশসহ ১৮০টি দেশ তাতে সই করবে। তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। আমি সবগুলোয় যাচ্ছি না। ওসব লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম হচ্ছে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, এর সঙ্গে পূর্ণ কর্মসংস্থান। দারিদ্র্য সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা, আয়বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের গুণগত মান বৃদ্ধিসহ ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডায় বিভিন্ন ধরনের বিষয় আছে। সেগুলোর কিছুটা আমরা বিবেচনায় নিলে আমাদের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। অবশ্য এসব বিষয় সরকার কতটুকু বিবেচনায় নিয়েছে, তা জানি না; বাজেটে অন্তত তার প্রতিফলন দেখি না। অন্য কথায় না গিয়ে কেবল প্রবৃদ্ধির কথাই ধরা যাক। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শুধু কয়েকটি খাতে জোর দিলে হবে না। এর বাইরেও আমাদের কিছু করণীয় আছে, যেটাকে আমরা বলি ইকোনমিক ডাইভারসিফিকেশন। এটা খুবই জরুরি। এর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়, সেসবের নীতিমালা কিন্তু আমাদের বাজেটের মাধ্যমেই আনতে হবে।

বরাবরের মতো এবারের বাজেটে মোটা দাগে তেমন কোনো দিকনির্দেশনা দেখিনি। এমনকি যেগুলোয় (যেমন কৃষি খাত) ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছিল, সেগুলোয়ও তেমন নজর নেই। কৃষি খাতে আমাদের অর্জন উল্লেখযোগ্য। এ খাতে আমরা অনেক খরচ করি, ভর্তুকি দিই; কিন্তু ফলাফল সম্প্রতি কি হয়েছে, সেটা অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ। ধারাবাহিকভাবে কৃষি খাতে কী ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে তা খেয়াল করলে দেখা যাবে, কয়েক বছরে আলোচ্য খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমতির দিকে। কেবল ফসল উত্পাদন, খাদ্যশস্য উত্পাদনের দিকে তাকালে চলবে না, কৃষিকেও বহুমুখীকরণ করতে হবে। কারণ আমাদের কৃষির অন্যান্য খাত এবং কৃষিবহির্ভূত গ্রামাঞ্চলের অন্যান্য খাতেও নজর দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালার কিছুটা বাজেটের মাধ্যমেই আসতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে, এসব বাজেটে কীভাবে আসবে, এটা তো আয়-ব্যয়ের হিসাব। কিন্তু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাজেটের মাধ্যমেই এ নীতিমালা আসতে হবে।

 

 

ড. ম. তামিম

পরিকল্পনা নীতিমালার জন্যই বাজেট করা। পরিকল্পনা নীতির মধ্যে সমস্যা থাকলে যতই বাজেট করি, তাতে কিছু আসবে যাবে না

আমরা ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে আটকে আছি। এখন টার্গেট করছি ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে উন্নীত হওয়ার। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আমি দুটি বিষয় তুলে ধরছি। এক. এখন শিক্ষার যে মান আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমানে মানবসম্পদের যে অবস্থা তা নিয়ে কোনো অবস্থায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারব না। এটা একদম পরিষ্কারভাবে বলা যেতে পারে। শুধু মাধ্যমিকে যে সমস্যা তা নয়; চারটি যে পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি রয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীরা দুই বছর পর পর কেবল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে; কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। সুতরাং আমাদের শিক্ষানীতি পর্যালোচনা করার সময় এসেছে। অনেকেই বাজেটের কথা বলেছেন। আমি আসলে বাজেটকে কখনো বড় কিছু হিসেবে দেখি না। আমি পরিকল্পনা নীতিকে বড় হিসেবে দেখতে চাই। পরিকল্পনা নীতিমালার জন্যই তো বাজেট করা। পরিকল্পনা নীতির মধ্যে সমস্যা থাকলে যতই বাজেট করি, তাতে কিছু আসবে যাবে না। আমার বিশাল উদ্বেগ হলো, মানবসম্পদ। যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই গুণগত মানের মানবসম্পদ পাওয়া যাচ্ছে না এবং এ কারণেই আমাদের বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা থেকে যাচ্ছে। আমাদের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা নেই। বাংলাদেশে আমরা কি এমন একজন প্রকৌশলী পাব, যিনি পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামোর কাজ উঠিয়ে নিতে পারবেন? অবশ্যই নেই। এজন্য আমরা বাইরে থেকে প্রকৌশলী আনছি, বিদেশীদের ওপর নির্ভর করছি। এত বছরে কেন আমাদের দক্ষতা বাড়েনি? এটা নিয়ে আমার উদ্বেগ আছে।

খাতওয়ারি জিডিপি অবদান বিচার করলে দেখা যাবে, সেবা খাতে জিডিপি ৫৬ শতাংশ, ২৮ শতাংশ শিল্প এবং কৃষি খাত থেকে আসছে ১৬ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে উন্নীত করতে হলে আমরা কোন খাতে বেশি নজর দেব? এক্ষেত্রে মোটামুটি সবার কাছে পরিষ্কার যে, শিল্প খাতে মনোযোগ দিতেই হবে। এবং তা করতে হবে রফতানিমুখী শিল্পকে ঘিরে। স্থানীয় বাজার বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের রফতানিমুখী হওয়ার বিকল্প নেই। বিনিয়োগের জন্য জমি একটা বিরাট ইস্যু। দক্ষ মানবসম্পদ, এনার্জি এবং পুঁজি সংকট তো আছেই। এবার এনার্জিতে আসা যাক। এনার্জিতে বর্তমানে আমাদের যে প্রধান সমস্যা তা হলো, প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থায়ন। যেমন— রামপালে শুধু বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন টাকা লাগবে। এ টাকাটাই বাংলাদেশ জোগাড় করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক ল্যান্ডিং এজেন্সি বা ব্যাংকগুলো আইইএ দেখার এটাই কারণ। প্রজেক্টগুলোকে তো ব্যাংক উপযোগী করতে হবে। এটা করতে হলে ভ্যালু চেইনের প্রতিটি অংশই তারা দেখবে। কোথা থেকে প্রাথমিক জ্বালানি আসছে, বাজারে বিদ্যুতের দাম কত, লগ্নিকারীরা টাকা ফেরত পাবে কিনা, এগুলো সবই দেখবে। এটা দেখলে তো তারা জায়গায় জায়গায় সমস্যা দেখবে। তাছাড়া কেউ অর্থায়ন করবে না। পুরো রামপাল প্রজেক্টটা সম্পন্ন করতে হলে আমাদের বিপুল অর্থ লাগবে। সে বিবেচনায় এবারের বাজেটে জ্বালানি খাতে ১৬ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ অতি অপ্রতুল। ভবিষ্যতে আমাদের যে এনার্জি রিকোয়ারমেন্ট আছে, তার তুলনায় এটা কোনো টাকাই নয়। এখন আমাদের যে ট্রান্সমিশন সিস্টেম আছে, সেটা হ্যান্ডলিং করতে পারে মাত্র আট হাজার মেগাওয়াট। এখন দেশে বিদ্যুতের উত্পাদন প্রায় প্রতিদিনই আট হাজার মেগাওয়াট। সুতরাং ট্রান্সমিশনে আমাদের বিরাট বিনিয়োগ করতে হবে। সেগুলো আমরা বাদই দিচ্ছি, কেবল উত্পাদনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। বিদ্যুত্ খাতে এফডিআই ছাড়া হবে না। স্থানীয় বিনিয়োগে কোনো অবস্থায় এনার্জি সেক্টরের উন্নয়ন করা যাবে না। আমাদের সে টাকা নেই। এর জন্য কমার্শিয়াল ফ্রেমওয়ার্ক অব বিজনেস তৈরি করতে হবে, যাতে বিদেশী বিনিয়োগ আসে। তার পর অবকাঠামোয়ও বিনিয়োগের ব্যাপার তো আছেই। আমি বলি, মাতারবাড়ী বা যেখানেই হোক, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রের কোনো ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগই হবে না, যদি সরকার তাদের সুযোগ করে না দেয়। ভ্যালু চেইনের লিংকে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। টাকা বিনিয়োগ করে রিটার্ন না পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় এখানে কেউ বিনিয়োগ করবে না। সুতরাং এটা সরকারকে অ্যাড্রেস করতে হবে। কিছু কিছু অবকাঠামো অবশ্যই করতে হবে সরকারকে। কয়লা কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিটিও রামপালে এখনো হয়নি।

নিম্নমধ্যম আয় থেকে দেশকে উচ্চমধ্যম আয়ে উন্নীত করতে হলে এনার্জি সোর্সের বহুমুখীকরণ যেমন জরুরি, তেমনি এর নির্ভরযোগ্যতাও প্রয়োজন। বহু বছর ধরে হচ্ছে কয়লা উত্তোলনের কথা। এটাকে উপেক্ষা করে বেশি দিন থাকা যাবে না। আমাদের অচিরেই নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। নিজস্ব কয়লা উত্তোলন করতে হবে, তা বিদ্যুত্ উত্পাদনে কাজে লাগাতে হবে। একটা পর্যায়ে গেলে আমরা উচ্চ দামে কয়লা কিনতে পারব। প্রাথমিকভাবে গ্যাস দিয়ে বিদ্যুত্ খাতের যেটুকু উন্নয়ন করেছি, সেখানে পড়ে থাকলে চলবে না। এখন বিদ্যুত্ আমদানিতে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত বিদ্যুতের দামও ৬ টাকা আবার ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দামও ৬ টাকা। কিছুদিনের মধ্যে সেটা ৮ টাকায় চলে যাবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে আমরা ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইসের ধারে কাছেও নেই। আমাদের স্থানীয় গ্যাসের দাম ১ ডলার ৭০ সেন্ট এবং আমদানি করলে তার দাম ন্যূনতম ১০ ডলার হবে। আর এলএনজি আনতে গেলে ১৫ ডলারের নিচে আনা যাবে না। সুতরাং একটি বিরাট প্রাইস শক আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে। আমি মনে করি, এ বিষয়গুলো সার্বিকভাবে দেখা দরকার।

 

 

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

কানেক্টিভিটি নিয়ে এত কথা বলছি, কিন্তু এগ্রোমার্কেটিং কানেক্টিভিটি নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না

চলতি অর্থনৈতিক চিন্তায় কৃষিকে কেবল দেখা হচ্ছে, খাদ্যের জোগানদাতা হিসেবে; সম্ভাবনাময় প্রবৃদ্ধি চালক হিসেবে নয়। এবারের বাজেটেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। অনেকেই নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে বলেছে। এটা তো ভবিষ্যত্মুখী প্রবৃদ্ধিচালক। কিন্তু আমরা তো অ্যাকোয়েটিক এগ্রিকালচারের মধ্যে আছি। আধুনিক এগ্রিমার্কেটিংও আসলে বিরাট সম্ভাবনাময় খাত, এখানে বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। কানেক্টিভিটি নিয়ে এত কথা বলছি, কিন্তু এগ্রোমার্কেটিং কানেক্টিভিটি নিয়ে কোনো কথা নেই। এটা কেবল বাজেটে যে নেই তা নয়, সাধারণ অর্থনৈতিক চিন্তায়ও নেই। দেখা যাচ্ছে, কৃষক খাদ্যনিরাপত্তা দিয়েই যাবেন, কিন্তু বাস্তবে কৃষকের কোনো উন্নতি হবে না। দারিদ্র্য নিয়ে এত কথা বলি, সেটা কেবল পরিসংখ্যানিক। এখন দারিদ্র্যের নতুন ধরনের এক্সপোজিশন দরকার।

শিল্প খাত নিয়ে এবারের বাজেটে অসংলগ্ন অনেক কথা বলা হয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলা হয়েছে। এসইজেড একটি জটিল পলিসি অপশন। সুতরাং এসইজেডের বিষয়টি কার্যকর পদ্ধতিতে করতে হবে। কোরিয়ান ইপিজেড নিয়ে উভয় দিক থেকে অনেক যুক্তি এসেছে। সেসব দেখার বিষয় আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পলিসি অপশনের জায়গা থেকে আরো ভাবনা-চিন্তা করা দরকার।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত থেকে বলতে চাই, আমাদের রেমিট্যান্সপ্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ। কিন্তু জনশক্তি রফতানির নতুন বাজার সে অর্থে সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন তোলা যায়, কেন মালয়েশিয়ায় জি টু জি শ্রমিক প্রেরণ ব্যর্থ হয়েছে? প্রাইভেট সেক্টরের ব্যর্থতার কারণেই তো জি টু জি আনা হলো। কিন্তু মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে তা কেন ব্যর্থ হলো? পাঁচ লাখ শ্রমিক নেয়ার কথা ছিল। সাত হাজারের বেশি যেতে পারেনি। এখানে আমলাতান্ত্রিকতা, দুর্নীতি, দালালদের দৌরাত্ম্যের মতো সমস্যা ছিল? সৌদি আরবের শ্রমবাজার এখনো বন্ধ কেবল নারী গৃহকর্মী প্রেরণ ছাড়া। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে একটি সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে শ্রমিক প্রেরণে বেসরকারি খাতের সংযুক্ততা বাড়ানো। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো বন্ধ। বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই মিলিয়ন শ্রমশক্তি যুক্ত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাংলাদেশ তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না। সুতরাং জনশক্তি পাঠানো আমাদের জন্য খুবই জরুরি, নতুন রেমিট্যান্স মার্কেট দরকার। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক নিজস্ব এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ে উন্নীত হয়েছে। আমি মনে করি, এটা নিছকই পরিসংখ্যানিক পুরস্কার। নিম্নমধ্যম আয় থেকে উচ্চমধ্যম আয়ে উন্নীত কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে? যে ধরনের আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা এ মুহূর্তে বলবত্, এটা দিয়ে এনার্জি পলিসি ভিশন, কোনো রকম ব্রেকথ্রু, গ্রোথ স্ট্র্যাটেজির গ্যাপ, ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম ছাড়া দ্রুত উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়া সম্ভব নয়।

 

 

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

এবারের বাজেট একটি ইনক্রিমেন্টাল বাজেট, পারফরম্যান্স বেজড নয়। আমাদের সময় এসেছে অন্তত কিছু সেক্টরে পারফরম্যান্স বাজেট করার

আমি বাজেট প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চাই। এবারের বাজেট একটি ইনক্রিমেন্টাল বাজেট, পারফরম্যান্স বেজড নয়। আমাদের সময় এসেছে অন্তত কিছু সেক্টরে পারফরম্যান্স বাজেট করার। যেমন— কমিউনিকেশন সেক্টরের বাজেট হতে পারে। বাজেটে তিনটি বিষয় আছে; এক. সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব। দুই. অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা। আমাদের অর্থনীতি তো ব্যক্তিখাতভিত্তিক। এজন্য ব্যক্তিখাতের জন্য অনেক কিছু করা দরকার ছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে হঠাত্ করে বড় টার্গেট দেয়াকে আমি সমর্থন করি না। করের ক্ষেত্রে নতুন ব্যাংককে ছাড় দেয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন ব্যাংকও গতানুগতিক ব্যাংকের মতো একই কাজ করছে; তাহলে তাদের ছাড় দিতে হবে কেন? এবারের বাজেটের কিছু ভালো দিক আছে। আবার কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। যেমন— বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভ্যাটের আওতায় আনার বিষয়টি মোটেই ভালো ধারণা নয়। একদিকে বলা হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন করা হবে। অন্যদিকে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন না করলে এলডিসি থেকে ওঠা যাবে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়া যাচ্ছে না, সুতরাং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভ্যাট নিতে হবে। চূড়ান্তভাবে এ ভ্যাটের বোঝা তো শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে। এটা একেবারে অনৈতিক। ছোট ছোট কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ওপর ভ্যাট বসানো হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় ভালো মানের কিছু কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে। সেখানে অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েও পড়ে। এখন ভ্যাটের বোঝা তাদের ওপর চাপানো হবে। সরকার চাইলে বড় বড় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ওপর ভ্যাট বসাতে পারত। এসব সিদ্ধান্ত মোটেই ভালো হয়নি। তিন. বাজেটের অন্যতম উদ্দেশ্য সুষম উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং দারিদ্র্য বিমোচন। এক্ষেত্রে কেবল এ বাজেট নয়; ধারাবাহিক বছরগুলোর প্রতিটি বাজেটই ব্যর্থ হয়েছে। দারিদ্র্য কেবল ২১-২৪ শতাংশে নিয়ে আসার সোজাসাপ্টা মাত্রা দেখলে চলবে না, দারিদ্র্য প্রক্রিয়ার ডাইমেনশনটিও দেখতে হবে; দেখতে হবে কীভাবে দরিদ্র মানুষ তৈরি হচ্ছে এবং তারা যে ধীরে ধীরে আরো নিষ্পেষিত হচ্ছে, সেটা দেখতে হবে। যেমন— স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে আলোচ্য খাতে গরিব লোকের চিকিত্সা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সেখানে রোগ প্রতিরোধ টিকা দেয়াই তো যথেষ্ট নয়; এর বাইরেও অনেক বিষয় আছে। সেটা নিশ্চিত করা দরকার। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য মানুষ যেতে পারছে না। কারণ সেখানে ব্যয় অনেক বেশি। আবার শিক্ষাও বেশ ব্যয়বহুল। তাহলে গরিব লোক কোথায় যাবে? বাজেটে এসব বিষয়ে শক্তিশালী প্রণোদনা অনুপস্থিত। আমি কেবল এ বাজেটের কথা বলছি না, প্রকৃতপক্ষে নব্বইয়ের দশক থেকেই আয়বৈষম্যের বিষয়টি পেছনে চলে গেছে। আমরা কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কথা বলছি। কিন্তু সুষম বণ্টনে গুরুত্ব দিচ্ছি না।

আরেকটি বিষয়ে আমি জোর দিতে চাই। আমাদের রফতানি বৈচিত্র্য নেই। এদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রিসের মন্দায় আমাদের রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটাও চিন্তা করা উচিত। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। কিন্তু সেটার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এবার ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। রেমিট্যান্সের ফলে গ্রামে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এটা পরবর্তীতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

অনেকেই বলেন বাইরে বিনিয়োগ করতে দিতে হবে। ব্যাপারটি একটু খেয়াল করুন। চট করে তা করলে আমাদের ক্ষতি হবে। আমি যখন গভর্নর ছিলাম, তখন বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা চলছিল। তখন ভারত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছিল। ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট কেস বাই কেস বিবেচনা করে উন্মুক্ত করা উচিত। মোটেই ঢালাওভাবে নয়। ভারত এখনো সবার ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট উন্মুক্ত করেনি। বাজেটে আমরা সবসময় নজর দিই ব্যাংকিং অর্থায়নের দিকে। এখন ইকুইটি অর্থায়নের দিকে জোর দেয়া উচিত। আমাদের ইকুইটি ফিন্যান্সিং উত্সাহিত করতে হবে।

 

 

ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

যে দেশে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে না, সে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ে না

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে আমাদের সংযুক্তি ঘটে কয়েকটি উপায়ে। এক. বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে। এর সঙ্গে রফতানি-আমদানি দুই-ই যুক্ত। দুই. বিদেশী বিনিয়োগ। তিন. অন্য ক্যাপিটাল ইনফ্লো বা আউটফ্লো। সেটা অবশ্য নন-এফডিআই ক্যাপিটাল ইনফ্লো। চার. রেমিট্যান্স। উল্লিখিত উপায়ে আমরা বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত। এখন প্রশ্ন হলো, এগুলোর সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক কী? ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে এ সম্পর্কে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে? রফতানির কথা চিন্তা করলে দেখা যাবে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত আমাদের জন্য মোটামুটিভাবে ভালো ইঙ্গিত বহন করছে। এ কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন দুই-ই কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু এখানে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধির কতটুকু সম্পৃক্ততা আছে? আমি সম্প্রতি একটি ছোট নির্দেশিকা বিশ্লেষণ করেছি। সেখানে জিডিপি না দেখে উন্নত দেশের ভোগ ব্যয়টা দেখেছি। সুতরাং তাদের ভোগ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ থেকে পণ্য কেনার বিষয়টি হলো প্রাথমিক নির্দেশক। এটাও দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রফতানি নিম্নমুখী হয়েছে। কাজেই ওসব দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়লে তাতে আমরা কতটুকু উপকৃত হব, আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়বে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে এ আশাটা কতটুকু বাস্তবসম্মত— সেটা আলোচনার বিষয়।

আরেকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে, আমাদের রফতানির বৈচিত্র্য দরকার। এর জন্য বাজেটে বিশেষ কোনো উদ্যোগ দেখিনি। অবশ্য আগে নতুন বাজার বা নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কাজেই অন্য কোনো কিছু যেহেতু করা হয়নি, হয়তো সেগুলো অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সেগুলো মূল্যায়ন করে নতুন কিছু করা যেত কিনা, সেটি নিয়ে কোনো উদ্যোগ দেখিনি। জ্বালানি তেলের দাম কমায় আমদানির জন্য সেটা একদিকে ভালো। তাতে ভর্তুকির মাত্রা কম হবে। তার পর অন্যান্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল বা কিছুটা নিম্নগামী। সুতরাং সেজন্য আমাদের লেনদেন ভারসাম্যের প্রাক্কলনও কিছুটা ভালো থাকবে। আবার বলা হচ্ছে তেল রফতানিকারক দেশ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আয়ের মাত্রা কমে গেছে। আমাদের বেশির ভাগ রেমিট্যান্স আসে সেখান থেকে। সেক্ষেত্রে এখানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা, সেটাও দেখার বিষয়। দেখা যাচ্ছে, তেলের দাম কমা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকারি ব্যয় এখন পর্যন্ত কমেনি। সুতরাং রেমিট্যান্সপ্রবাহে তেমন সমস্যা হবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। আকামা ইস্যু, ওমরাহ করতে গিয়ে থেকে যাওয়া, অবৈধ অভিবাসীর মতো সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি। বাজেট তো কেবল টাকার অঙ্কের হিসাবের ব্যাপার নয়। এখানে সেসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা কিছু নেই। তবে এখানেও বৈচিত্র্যহীনতা আছে। জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের নতুন বাজার নেই। সেক্ষেত্রে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় জনশক্তি রফতানি করা যায় কিনা, সেটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার; যেসব দেশ এখনো কৃষিভিত্তিক অথচ যেখানে শ্রমশক্তির অভাব আছে। সুতরাং নতুন বাজার সৃষ্টি করা যায় কিনা, তাও দিকনির্দেশনার প্রশ্ন। আবার রেমিট্যান্সের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে। এখানে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ আছে। মাথাপিছু রেমিট্যান্সের দিক থেকে আমাদের দেশই সবচেয়ে নিম্ন। শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে আমাদের মাথাপিছু রেমিট্যান্স কম। সুতরাং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ উত্পাদনশীলতা বাড়াতে পারি, তেমনি বাইরে রফতানি করে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি করতে পারি। বাজেটে এ সম্পর্কে তেমন দিকনির্দেশনা দেখিনি। দেখা গেছে, চলতি বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমে গেছে। এক্ষেত্রে কেবল বরাদ্দ বাড়ালে হবে না, গুণগত মানও বাড়াতে হবে।

এর পর আসা যাক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রসঙ্গে। আমি বলব, এখানে কিছুটা উদ্যোগ আছে। যেমন— চীন ও জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। কোরিয়ান অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রেক্ষিতে এসব কতটুকু হবে, সেটা ভবিষ্যতে দেখার বিষয়। আমার একটা অভিজ্ঞতা হলো, যে দেশে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ে না, সে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আসে না। এদিকে আমাদের অভ্যন্তরীণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সাড়ে ২১ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে। সেখানে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি স্পেশাল ইকোনমিক জোনের কথা বলা হয়েছে, বিদ্যুতের সমস্যা কিছুটা উপশম হয়েছে। তবে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির ব্যাপারে খুব একটা উদ্যোগ বাজেটে দেখিনি। দেশী এবং বিদেশী উভয় বিনিয়োগের পূর্বশর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণায় বলেছেন, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন নির্ভর করবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতেরও সম্পর্ক আছে। কেননা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা না থাকলে বৈদেশিক অনুদান, ঋণ কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ কোনোটাই পাব না।

শ্রুতি লিখন: হুমায়ুন কবির

আলোকচিত্রী: জাহিদুল ইসলাম সজল

Comments

Check Also

Press Reports on Recommendations for the National Budget FY2017-18

As part of the Independent Review of Bangladesh’s Development (IRBD) programme CPD organised a media …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *