CPD study on women’s unaccounted labour cited

Cited in The Daily Jugantor on Thursday, 30 October 2014.

নারীর ক্ষমতায়নই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত

সালমা ইসলাম

বাংলাদেশে ছেলেমেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ প্রশ্নে সম্প্রতি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এসব প্রতিক্রিয়ার বেশির ভাগই ছিল গতানুগতিক। উল্লিখিত বিষয়ে বেশির ভাগ আলোচক পরিচিত পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার আলোকে মত ব্যক্ত করছেন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গতানুগতিক মন্তব্য করার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জানার সীমাবদ্ধতাই স্পষ্ট হয়। যে কোনো বিষয়ে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার বাইরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য বিবেচনায় নিয়ে মতপ্রকাশ করা উচিত। স্থান-কাল নির্বিশেষে কোনো তরুণ যতটা মুক্তভাবে নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ পায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো তরুণী তা পায় না। এতে অনেক তরুণীর সার্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কেবল বিয়ের কারণেই যে তরুণ-তরুণীদের সার্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় তা নয়; আরও অনেক কারণে তরুণ-তরুণীরা তাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, এটি নতুন কোনো তথ্য নয়।

সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিভিন্ন দেশে তরুণ-তরুণীদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী পছন্দের চাকরি পেতে দেরি হয়। এ সমস্যা হঠাৎ তীব্র আকার ধারণ করেছে, এমন নয়। তবে কয়েক বছর আগে বিশ্বমন্দা শুরু হওয়া পর এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একটি মানসম্মত চাকরি একজন কর্মীর জীবনের মোড় যত দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে, অন্য কিছু তা পারে না। তাই ছেলেমেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ প্রশ্নে প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে একটি ছেলে বা মেয়ে কী করে নিজেকে মানসম্মত চাকরির জন্য যোগ্য কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, সেদিকেও বিশেষভাবে আলোকপাত করা হবে, এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে তা লক্ষ্য করা যায়নি। বর্তমান বাস্তবতায় কোনো দেশে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার কাজটি কঠিন। তাই এ বিষয়ক যে কোনো আলোচনায় মানসম্মত কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত।

দুই

বর্তমানে বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ১৮ বছর বয়সী কোনো তরুণী কি মানসম্মত কোনো কর্মে যোগদানের যোগ্যতা অর্জন করে? কেবল ১৮ কেন- মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পরও দেশে কোনো তরুণী যে পছন্দমতো চাকরি পান না, এটি নতুন তথ্য নয়। কাজেই একজন তরুণী তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পরপর পছন্দমতো কোনো কর্মে যোগদান করতে পারছেন কি-না, এ বিষয়েই আমাদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যাতে দ্রুত কর্মসংস্থান বাড়ে তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি কী করে রফতানি বাড়ানো যায় এ নিয়েই আমাদের বেশি চিন্তা করা উচিত।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন নারীকে সচেতন হতে সাহায্য করলেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে যে কোনো সময় তার জীবন স্থবির হয়ে পড়তে পারে। একই কথা একজন তরুণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও একজন তরুণ যেভাবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবেলার জন্য যে কোনো কর্মে যুক্ত হতে পারেন, একজন তরুণী তা পারেন না। তাকে তার পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতাসহ অন্য অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ ধরনের বিভিন্ন কারণে উন্নয়নশীল দেশের যে কোনো তরুণের তুলনায় কোনো

তরুণীর পছন্দমতো চাকরি পাওয়া এবং জীবনযাত্রার মান অক্ষুণ্ন রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। তা না হলে নারীর অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পশ্চাৎপদ সমাজে নারীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হন। উন্নয়নশীল দেশের নারীদের বঞ্চনার ভয়াবহ চিত্র প্রতিনিয়ত মিডিয়ায় আলোচিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক উন্নতিসহ নারীর ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ইউনিসেফের নতুন ডেটা উদ্ধৃত করে বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ২২ জুলাই ২০১৪ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি তিনজনে একজন নারীর বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। ১৮ বছরের নিচে বিয়ে হয়েছে বর্তমানে বিশ্বে এমন নারীর সংখ্যা ৭০ কোটি। এ তথ্যেই স্পষ্ট হয়, বাল্যবিয়ে সারা বিশ্বেই অন্যতম এক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ সমস্যা সফলভাবে মোকাবেলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিন

নারী-পুরুষ সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিদিনই ঘরে-বাইরে এমন কিছু কাজ করে থাকেন যা কখনোই আনুষ্ঠানিক হিসাবের মধ্যে ধরা হয় না। কিন্তু এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজেরও কোনো না কোনো মূল্য থাকে। দু-একটা ব্যতিক্রম ঘটনা বাদ দিলে আমাদের দেশে প্রতিদিন নারীরাই পুরুষের তুলনায় ঘরের কাজে বেশি সময় দিয়ে থাকেন। আবার অনেক পুরুষ রয়েছেন যারা বাইরের কাজে এত বেশি সময় দেন যে, তাদের পক্ষ ঘরের কাজে সময় দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। কিন্তু কোনো পরিবারে নারী পুরুষ দু’জনেই চাকরিজীবী হলে সাধারণত লক্ষ্য করা যায়- পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরে কিছুটা বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করেন, একই সময় পরিবারের চাকরিজীবী নারী সদস্য কর্মস্থল থেকে ফিরে গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত সময় কাটান। গৃহকর্মে নারীদের এই বাড়তি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এই বাড়তি দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নারীরা সমাজে সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো কোনো পরিবারে নারীর

এই বাড়তি দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। আবার এই বাড়তি দায়িত্ব পালনের পরও কোনো কোনো পরিবারে একজন নারী তার প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন।

সম্প্রতি গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) ও ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ বাংলাদেশের গৃহিণীরা প্রতিনিয়ত যেসব কাজ করেন তার আর্থিক মূল্য কী দাঁড়ায়- এ বিষয়ে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। উল্লিখিত দুই সংস্থার গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের গৃহিণীদের দৈনন্দিন কাজের বার্ষিক অর্থমূল্য ১১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয় বলে নারীদের এ কর্মমূল্য কখনোই হিসাব করা হয় না। উল্লিখিত জরিপটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতেই সম্পন্ন করায় জরিপটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন নারী সংসারে মোট ১২ ধরনের কাজ করে থাকেন, আর পুরুষ করেন মাত্র তিন ধরনের কাজ। সময়ের হিসাবে গৃহস্থালি কাজে একজন নারী পুরুষের তুলনায় প্রায় তিনগুণ সময় দিয়ে থাকেন। উল্লিখিত গবেষণায় গ্রাম ও শহরের চিত্র একই বলে দাবি করা হলেও পারিবারিক অবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক সচ্ছলতার বিবেচনায় গ্রাম ও শহরের চিত্রে অনেক ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে শহরের মানুষের সংগ্রামের তুলনা করা ঠিক হবে না। বিশেষত চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও উপকূলীয় এলাকায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা শহরের মানুষের সংগ্রামের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। তবে এ কথা ঠিক, শহরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের চিত্র শহরে বসবাসকারী অন্য সবার থেকে একেবারেই আলাদা। কাজেই শহরে বসবাসকারী নিুবিত্ত নারীদের জীবন সংগ্রামও যে আলাদা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে শহরে কিংবা গ্রামে যে কোনো পরিবেশে নিুবিত্ত নারীদের যে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ দুঃখজনক হল, যে কোনো পরিবেশে বসবাসকারী এই নিম্নবিত্ত নারীরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তারা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছেন।

পাঁচ হাজারেরও বেশি পরিবারের ওপর পরিচালিত উল্লিখিত জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, খুব কম সংখ্যক মাত্র ৩২ শতাংশ নারী পূর্ণকালীন চাকরি করে। আর উল্লিখিত পরিবারে পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছে ৮২ শতাংশ পুরুষ। ফলে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রে নারীর মতামত উপেক্ষা করা হয়। পরিবারে নারীর প্রতি এ উদাসীনতা তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ পরিবারে প্রাপ্য মর্যাদা না পেলে তাদের অনেকেই এক ধরনের হতাশায় ভুগতে পারেন। এ বৈষম্য দূর করতে পর্যায়ক্রমে নারীদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। এর জন্য দরকার নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ বাড়ানো। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ বাড়ালে স্বাভাবিকভাবেই নারীর সার্বিক জীবনধারা পাল্টে যাবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে স্বাভাবিকভাবেই নারীদের কর্মসংস্থানও বাড়বে। কর্মসংস্থান বাড়লে দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে, যা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

চার

মিডিয়ায় প্রকাশিত নারী নির্যাতন বিষয়ক তথ্যগুলো বিবেচনায় নিলে যে কোনো বিবেকবান মানুষই যে উৎকণ্ঠিত হবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে যেসব কারণে নারীরা নির্যাতনের শিকার হন তার অন্যতম হল যৌতুক। অতীতে কোন পরিপ্রেক্ষিতে যৌতুকের প্রচলন হয়েছিল- এর সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল হলেও এ ভয়াবহ ব্যাধি থেকে কেন মুক্তি মিলছে না, এ নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। মানুষের সচেতনতা না বাড়ালে এ ব্যাধি থেকে সহজে মুক্তি মিলবে না। যৌতুক গ্রহণ যে একটি ঘৃণ্য বিষয় এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক বাবা-মা সন্তানের যৌতুক নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। এ প্রবণতা থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিত ব্যক্তিদের নৈতিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন, এমন অনেক ব্যক্তিও যৌতুক নিতে বিব্রতবোধ করেন। কাজেই শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান ইতিবাচক প্রবণতাগুলো ধরে রাখার চেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।

পাঁচ

প্রেমঘটিত কারণে অনেক তরুণী প্রতারণার শিকার হয়। এ ধরনের প্রতারণা থেকে প্রচণ্ড হতাশার প্রেক্ষাপটে কোনো কোনো তরুণী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুচ্ছ কারণেও অনেক তরুণী আত্মহত্যা করে থাকে। অভিভাবকরা সচেতন হলে তরুণীদের প্রতারিত হওয়ার আশংকা কমবে। দুঃখজনক হল, যে বয়সে একজন তরুণীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার কথা- ওই বয়সেই কোনো কোনো তরুণী ভুল পথে পা বাড়ায়। এর জন্য কেবল যে সংশ্লিষ্ট তরুণী দায়ী তা নয়; বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতাও এর জন্য কম দায়ী নয়। আমাদের চারপাশে বিদ্যমান বাস্তবতা তরুণ-তরুণীদের উচ্চতর গবেষণা ও উন্নত নৈতিকতার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে কি? এসব সীমাবদ্ধতার অবসানে কী করণীয়?

সমাজে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব হলে উল্লিখিত সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। একসময় বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্লাসের বাইরেও সময় দিতেন। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। শিক্ষক-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে তরুণ-তরুণীরা বড় কিছু করার জন্য উন্মুখ হবে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রতারণার ঘটনাগুলোর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

দারিদ্র্যের কারণে অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হন। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বস্তিতে এ সমস্যা প্রকট। বাবা-মা ও অভিভাবকরা কর্মস্থলে চলে গেলে তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে বস্তির অনেক তরুণী বাবা-মা-অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে নির্যাতনের শিকার হয়।

কর্ম সংকটের কারণে রাজধানীসহ সারা দেশের বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া অন্য অনেক কারণেও রাজধানীমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বস্তিতে বসবাসকারী তরুণী ও বিভিন্ন বয়সী নারীরা নানা রকম নির্যাতনের শিকার হন। এক পর্যায়ে নির্যাতিত নারীদের কারও কারও ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আশংকাও বেড়ে যায়। রাজধানীসহ সারা দেশে বস্তিতে বসবাসকারী জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়লে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে- বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ক মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোনো সমস্যাই প্রকট হওয়ার আশংকা সৃষ্টি না হয়। এ সমস্যার সমাধানে গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়টি অনেকদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। এ বিষয়ক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ছয়

বিভিন্ন পর্যায়ে নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় কম বেতন পান। এ বৈষম্যের অবসানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নারীরা শ্রমিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে তাদের শিশু সন্তানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা হয়, তা চিহ্নিত করে সেসব সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগও অব্যাহত রাখতে হবে।

বর্তমানে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়ও নারীরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করছেন। নারীর ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে আশা করা যায়, নারীরা আগামীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দুঃখজনক হল- নারীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকার এ সময়েও তারা আপনজন কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হন। পারিবারিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের চিত্রও হতাশাজনক। এ প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিষয়টি বহুল আলোচিত। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে গৃহীত পদক্ষেপ থেকে এক্ষেত্রে কী অগ্রগতি হয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন জরিপ এবং মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো পর্যবেক্ষণে যে বিষয়টি সবার কাছে সহজেই স্পষ্ট হয় তা হল নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করা না গেলে নারী নির্যাতনের হার কমবে না। বর্তমানে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষিত নারীদের কতজন মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছে?

প্রতিবন্ধী নারীদের অসহায়ত্ব পুরুষ প্রতিবন্ধীদের তুলনায় অনেক বেশি- এটা সহজেই অনুমান করা যায়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়ার পরও অনেক নারী প্রতিবন্ধীকে প্রতিনিয়ত অবর্ণনীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়। প্রতিবন্ধীদের দুর্ভোগের অবসানে আমাদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সাত

দেশে দেশে নারীর ক্ষমতায়নে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবে নারীর ক্ষমতায়নের প্রকৃত চিত্রটি কেমন, একবার সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। অস্ট্রেলিয়া, চীন ও ফ্রান্সে প্রথম নারী পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন যথাক্রমে ১৯৪৩, ১৯৫৪ ও ১৯৪৫ সালে। জাপানে ১৯৪৬ সালের আগে কোনো নারী পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম নারী পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ১৯৪৮ সালে। সুইজারল্যান্ডে ১৯৭১ সালের আগে কোনো নারী পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি। যেখানে অনেক উন্নত দেশেই নারীর অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে দেরিতে, সেক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোনো কোনো এলাকায় নারীরা যে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে- এটা সহজেই অনুমান করা যায়। এ প্রেক্ষাপটে পিছিয়ে থাকা নারীদের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দিকনির্দেশনা অব্যাহত থাকার পরও কেন এক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না- এ বিষয়ে বহুমুখী গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি। বর্তমান বাস্তবতায় নারীর মুক্তির জন্য গৃহীত পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত নারীর ক্ষমতায়ন। এক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রয়াস অব্যাহত না থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছানো কত কঠিন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আলাদাভাবে নারীদের পক্ষে কথা বলার বিষয়টি বিব্রতকর। আমরা সব মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে চাই। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম, যেদিন নারীদের পক্ষে আলাদাভাবে লিখতে হবে না।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষ যাতে নিজেকে বিকশিত করার ন্যূনতম সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে যেসব কর্মকাণ্ড চলছে, সেসবের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের একজন মানুষও যাতে নিজের বঞ্চনার কথা ভেবে হতাশ না হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ কর্মদক্ষতা প্রদর্শনে প্রয়োজনীয় সুযোগ প্রদান করা না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, যুগান্তর