Professor Rehman Sobhan’s book reviewed

Published in Prothom Alo on Saturday, 5 September 2015.

কালেরপুরাণ
রেহমান সোবহানের ‘বাংলাদেশ যাত্রা’

সোহরাব হাসান

cpd-rehman-sobhans-book-review-bangladesh-two-economies-2015

যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এ দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে অর্থনীতির পণ্ডিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে নিঃস্ব বস্তিবাসী এককাট্টা হয়ে পাকিস্তানিদের তাড়িয়েছেন, সেই বৈষম্য কি আমরা দূর করতে পেরেছি? ‘লাখো প্রাণের বিনিময়ে’ একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেলেও কি আমরা সবার ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছাতে পেরেছি? নির্দয় সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যে সাহস নিয়ে সেদিন আমরা কলম ধরেছিলাম, হাতের লেখনীকে যুদ্ধের হাতিয়ার বানিয়েছিলাম, সেই সাহস ও প্রত্যয় কি অটুট রাখতে পেরেছি?

গত ২৯ আগস্ট ডেইলি স্টার ভবনে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের ফ্রম টু ইকোনমিস টু টু নেশনস: মাই জার্নি টু বাংলাদেশ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তাদের কণ্ঠে এবং অভ্যাগতদের আলাপচারিতায় এসব প্রশ্নই ঘুরেফিরে এসেছে। সবাই স্বীকার করেছেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং অর্জনের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।

১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল—এই ১০ বছরে লেখা অধ্যাপক রেহমান সোবহানের নিবন্ধ, কলাম ও সম্পাদকীয় ইত্যাদির সমাহারে গ্রন্থিত হয়েছে ফ্রম টু ইকোনমিস টু টু নেশনস: মাই জার্নি টু বাংলাদেশ। আইউব খানের সামরিক শাসনের গোড়ার দিকে, ১৯৬১ সালে এক একাডেমিক আলোচনায় তিনি ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব হাজির করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এই চৌকস অর্থনীতিবিদ দেখিয়ে দেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কী ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। রপ্তানির সিংহভাগ আয় পূর্ব পাকিস্তান থেকে এলেও বাজেটের বেশির ভাগ বরাদ্দ পায় পশ্চিম পাকিস্তান। শিল্পকারখানা, সামরিক স্থাপনা—সবকিছুই হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। রেহমান সোবহান যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, দেশের যে অংশ পিছিয়ে আছে, সেই অংশের উন্নয়নে রাষ্ট্রের অধিক বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁর কথা আমলে নেয়নি।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বিরোধী দলের সম্মেলনে ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করলে সমগ্র দেশে তার পক্ষে সৃষ্টি হয় গণজাগরণ। এরপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান পেরিয়ে দেশ ধীরে ধীরে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়। রেহমান সোবহান লিখেছেন, ছয় দফা তখন আর একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি থাকে না, এ দেশের মানুষের মুক্তির সনদ হয়ে ওঠে। কাকতালীয় হলো রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতি তত্ত্ব, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা এবং ১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাব—সবই উত্থাপিত হয়েছিল লাহোরে। সেই অর্থে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও ভাঙার প্রস্তাব আসে এক স্থান থেকেই। আইউব খান ছয় দফাকে দেখেছিল পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে এবং অস্ত্রের ভাষায়ই তিনি এর জবাব দিয়েছিলেন।

রেহমান সোবহানের টু ইকোনমিস টু টু নেশনস প্রকৃতার্থে ষাটের দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের দলিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তরুণ অধ্যাপক দুই অঞ্চলের বৈষম্য নিয়ে কে বল বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কেই লিপ্ত হননি, তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদেরও আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ষাটের শেষ দিকে তিনি যখন ড. কামাল হোসেন, হামিদা হোসেন, সালমা সোবহান প্রমুখকে নিয়ে সাপ্তাহিক ফোরাম প্রকাশ করেন, তখন তাঁর লেখা কলাম বা নিবন্ধ হয়ে ওঠে রাজনীতিক, পেশাজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রাণের কথা। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করেছেন, আবার কৃষক সমিতির মহাসমাবেশ দেখতে, মাওলানা ভাসানীর বক্তৃতা শুনতে সন্তোষে ছুটে গিয়েছেন এবং সেখান থেকে ফিরে এসে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। তিনি নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন গণসংগ্রামের বৃহৎ পরিসরে।

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে অনেকেই বিতর্ক করেন, কে কখন ঘোষণা করেছেন, কার ঘোষণা কতজন শুনেছেন ইত্যাদি; কিন্তু রেহমান সোবহান এসব বিতর্ক এই যুক্তিতে নাকচ করে দেন যে একাত্তরের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার মুহূর্তে গোটা বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কার্যত তখন থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীন। পরবর্তী ২৫ দিন দেশ পরিচালিত হয়েছে শেখ মুজিবের নির্দেশে। তাঁর ভাষায়, স্বাধীনতার মূল নায়ক সাধারণ মানুষ এবং একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল গণযুদ্ধ।

রেহমান সোবহানের এই পর্যবেক্ষণ অধিকতর বস্তুনিষ্ঠ এ কারণে যে গোটা আলোচনা-প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এক পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় ক্ষমতার হিস্যা নিয়ে তখন আর আলোচনা হচ্ছিল না; আলোচনা হচ্ছিল কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে দুটি দেশ আলাদা হয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ মুহূর্তে অালোচনা ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

২৫ মার্চ রাতে যখন রেহমান সোবহান পাকিস্তানি সাংবাদিক মাজহার আলী খানকে (তারিক আলীর বাবা) নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মাজহার আলী খানকে যত শিগগির সম্ভব ঢাকা ত্যাগের পরামর্শ দেন। একই পরামর্শ দিয়েছিলেন পাকতুন নেতা খান আবদুল ওয়ালী খান ও বালুচ নেতা গাউস বক্স বিজেঞ্জোকেও।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতি তত্ত্ব আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি যখন লাহোরে নিবন্ধটি উপস্থাপন করেছিলেন, তখনই পাকিস্তানিদের মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। আইউব খান নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘রেহমান সোবহান কে?’ এভাবেই একজন তরুণ বাঙালি অর্থনীতিবিদ গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

কিন্তু তারপর কী হয়েছে? যেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সেই বৈষম্য কি কমেছে? রেহমান সোবহান কয়েক বছর আগে এই নিবন্ধকারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান আমলে এক দেশ দুই অর্থনীতি ছিল, এখন এক দেশ দুই সমাজ হয়েছে। একটি গুলশান-বনানী–বারিধারার সমাজ, আরেকটি গ্রামগঞ্জে প্রান্তিক মানুষের সমাজ।

আলোচনায় আরও একটি বিষয় বেশ জোরালোভাবে এসেছে যে, তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ বিশেষ করে শিক্ষক, আইনজীবী, লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একত্র করতে পেরেছিলেন। তাঁরা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করেছেন। সেদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ একই স্রোতে মিশেছিল বলেই দোর্দণ্ড পাকিস্তানি শাসকদের আমরা পরাস্ত করতে পেরেছিলাম। কিন্তু আজকের রাজনীতি বিভক্তি ও বিভেদের চোরাগলিতে হারিয়ে যাচ্ছে।

রেহমান সোবহান যখন যেখানেই থাকুন না কেন, নিজেকে আড়াল করে কাজ করেছেন; বইয়ের নাম মাই জার্নি হলেও তিনি কোথাও নিজের কথা বলেননি, বলেছেন সমষ্টির কথা। তাঁর প্রশ্ন, যে সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে সফল করে তুলেছিল, তাদের কথা কি আমরা মনে রেখেছি? সেই প্রশ্নের জবাবও আমরা পাই বইয়ের শেষ নিবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে যাওয়ার অর্থ হলো স্বাধীনতাযুদ্ধে সাধারণ মানুষ যে জীবন দিয়েছে, তাদের ঋণকে সম্মান জানাতে ব্যর্থ হওয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই নেতৃত্বগুণ ছিল, যা পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা রুখে দিতে এবং মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিল। প্রকৃত অর্থে জনগণের এই ব্যাপক অংশগ্রহণই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছে। এই একই কারণে একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সমাজ বিনির্মাণের প্রয়োজনীয় উপাদান ও গণতান্ত্রিক অধিকার সাধারণ মানুষের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। কিন্তু আমরা তার বদলে অধিকতর অযোগ্য সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে স্বাধীনতার সুফল খুবই স্বল্পসংখ্যক মানুষের কাছে পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং তারা সমকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।’

এই ধরনের কর্মকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করে রেহমান সোবহান লিখেছেন, ‘আমরা এখনো রাজনৈতিক বিভক্তি ও সামাজিক অসন্তোষকে জিইয়ে রাখছি, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে।’

স্বাধীনতা মানে কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, স্বাধীনতা মানে জাতি–ধর্মনির্বিশেষে সেই ভূখণ্ডের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। তাঁর বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখা ।

কিন্তু সেই অধিকার কি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? পারিনি বলেই রেহমান সোবহানের কণ্ঠে হতাশার সুর লক্ষ করি।

সেদিনের আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই, এই ভেবে বিস্মিত হই যে তখন আমরা যা চিন্তা করেছি, তা-ই লিখতে পেরেছি। ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়েই আমরা তা লিখেছি। কেননা, সেই চিন্তা আমাদের ভেতর থেকে এসেছিল বলেই আমরা তা পেরেছি। আজ আমি যখন একটি নিবন্ধ লিখি, আমার এক সপ্তাহ লেগে যায় এবং এই স্বাধীন বাংলাদেশে অন্যদের মতো আমিও একটি লেখা ছাপতে দেওয়ার আগে পাঁচবার ভাবি। আজ আমি যা লিখি, তার প্রতিটি শব্দ নিয়েই আমাকে ভাবতে হয়। কিন্তু আমরা যখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, লেখার টেবিলে বসে দুই ঘণ্টায় একটি লেখা শেষ করতে পারতাম।’

এই না পারাটা তাঁর একার ব্যর্থতা নয়; আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। অর্থাৎ একাত্তরে যে গণতান্ত্রিক ও পরমতসহিষ্ণু রাষ্ট্রের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারার ব্যর্থতা।

কলম যে তরবারির চেয়ে ধারালো হতে পারে, কলমের কালি যে আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে, সেটাই রেহমান ও তাঁর সহযাত্রীরা পাকিস্তান আমলে তা–ই দেখিয়েছেন। ফোরামে প্রকাশিত তাঁদের প্রতিটি লেখা শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি উজ্জীবিত করেছে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতাকামী মানুষকে।

একাত্তরে এবং তার আগে রেহমান সোবহানের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা আমরা জানি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে তিনি আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছুটে গিয়েছিলেন। আবার সেখান থেকে ফিরে এসে মুজিবনগরে ফিরে মন্ত্রিসভার কাছে রিপোর্টও পেশ করেছিলেন। তিনি হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থনৈতিক দূত।

আর স্বাধীনতার পরে রেহমান সোবহান প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সবখানেই তিনি মেধা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এমনকি নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর স্বল্পকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য থাকাকালে তিনি বিশাল টাস্কফোর্স রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা হিসেবে। যদিও কোনো সরকার কিংবা রাজনৈতিক দল সেই টাস্কফোর্সকে আমলে নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি।

তারপরও রেহমান সোবহানের অভিযাত্রা থেমে নেই। তাঁর বাংলাদেশ যাত্রার এক পর্ব শেষ হয়েছে একাত্তরে। দ্বিতীয় পর্ব এখনো চলছে। অভিনন্দন তাঁকে।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।