Rehman Sobhan’s 82nd Birthday: Tribute from Prof. Abdul Bayes

Published in The Financial Express on Saturday, 11 March 2017
OPINION

The tale of a towering teacher

Abdul Bayes

Prof. Rehman Sobhan

Today is the birthday of one of our iconic teachers. Born in Calcutta on March 12, 1935, Rehman Sobhan (82) rose to the peak of his fame through his rich research, particularly on political economy. On this auspicious day, we shower our warm greetings – Happy Birthday, Sir.

Truly speaking, the first two years of our life in the Department of Economics of Dhaka University (1967 and 1968) passed off a bit monotonously. Sometimes absence of teachers, allegedly engaged in the preparation for the Civil Service Examination, adversely affected classes. The situation was possibly not far from what Adam Smith said about his teachers in around 1740: “In the University of Oxford, the greater part of the public Professors has for these many years, given up altogether even the pretence of teaching”.  Obviously, we decided to spend more time in the library where, during the break or boredom, biryani and tea from Sharif Mia’s canteen served as a respite.

The frustration was soon over. We were told that three ‘super-stars’ in the discipline of Economics of that period namely, Rehman Sobhan, Anisur Rahman, and Azizur Rahman Khan would  be taking courses. Rehman Sobhan would lecture on Pakistan Economics — a subject generally considered dreary and dull. Some of our seniors suggested that we better sip a cup of coffee in the cafeteria rather than bear with the ‘boring’ class. Defying the advice, we chose to attend Rehman Sobhan’s lectures. Soon things began to turn all rosy for us. The way Rehman Sobhan spoke about the socio-economic and political events of the then Pakistan enchanted the ‘houseful’ class giving no scope to drowse. The long and beautifully crafted sentences in English, often laced with wit and wisdom, kept us enchanted. Further, his occasional quips led to a lot of laughter in the class. Some of his remarks about the then Pakistan economy still ring in my ears: “…the economy of Pakistan is a multi-storied building built on a wooden structure which is not even of teak”; “Nawab Abdul Gafur Khan Hoti is the greatest Chinichor of Pakistan”, etc. etc.

That’s not the end of the story. We were asked to submit a term paper based on field-level information. We collected information braving the scorching sun and heavy showers. Rehman Sobhan used to monitor the progress regularly. Possibly, that exercise was the beginning of our engagement with empirical research.

Later on, his publication of the magazine Forum was another feather in his cap. Eminent Professors like Nurul Islam, Anisur Rahman and Wahidul Huq  contributed to the magazine. With a distinct leaning to left ideology, Forum was a stern critique of the development policies of the then Pakistan.

In the 1960s, Rehman Sobhan, along with other economists, under the intellectual leadership of  Professor Nurul Islam, contributed to the drafting of the Six-point Programme that became the basis for the struggle for autonomy of the then East Pakistan. Prof Rehman Sobhan’s contribution to the cause of our liberation is a hallmark in history. Taking many known and unforeseen risks, he crossed the border to join the liberation war, and from March 26 to December 16, 1971, served as a roving ambassador for Bangladesh to lobby in the United States and other countries. After independence, he joined the Planning Commission as a Member and was deeply engaged in the formulation of the first Five Year Plan of Bangladesh. As an adviser to the caretaker government under Justice Shahabuddin, he prepared a Task Force Report on the economy of the country.

abdul-bayes-NewA critique of economic policies in the Marxist tradition, Rehman Sobhan reckons that unless the structural causes of inequality are taken into due consideration “neither targeting of development resources to the resource-poor, nor the extension of social protection is likely to resolve the problem of inequality in South Asia…The poor are embedded in certain inherited structural arrangements…. which reinforce each other to effectively exclude them from participating in the benefits of development or the opportunity provided by open markets”.

The ever-smiling Rehman Sobhan’s love for the country and the people knows no bound. He is a truly democratic soul devoted to dialogues. After retiring from the Bangladesh Institute of Development studies (BIDS), he set up the think-tank Centre for Policy Dialogue (CPD) to pursue an argumentative approach to socio-economic and political development of this country. In his own words, “I wanted to create a forum in which people of diverse backgrounds and political views would sit together and develop a culture of having intelligent and civilised arguments…”

We wish you a long and productive life, Prof Rehman Sobhan.

The writer, a former Professor of Economics at Jahangirnagar University, is acting Chair, Economics and Social Science Department (ESS), BRAC University.

abdul.bayes@brac.net


 

Published in কালের কন্ঠ on Saturday, 11 March 2017

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

তিনি আমাদের ‘কালের কণ্ঠ’

আবদুল বায়েস

প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান একজন ‘কালের কণ্ঠ’। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি সংকটকালে তাঁর ঐন্দ্রজালিক কণ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে চলেছে। ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই বিরল প্রতিভার মানুষটি বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও আমার অন্যতম প্রিয় একজন শিক্ষক; প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত। আজ শুভ জন্মদিনে অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

দুই

পরম সৌভাগ্য যে আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম। এটা ছিল প্রথমকাল। একজন জাদুকরের মতো রেহমান সোবহান জাদুমুগ্ধ করে ছাত্র-ছাত্রী ধরে রাখতেন। ক্লাসে তাঁর সম্মোহনী ও সমুদ্ভাসিত ভাষণে চোখের পাতা ফেলা কিংবা উসখুস করার সুযোগ দিতেন না। কথা শোনার জন্য সব সময় ‘হাউজফুল’ ক্লাসে সবাই উত্কর্ণ হয়ে থাকতাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনর্গল ইংরেজি ভাষায় লম্বা বাক্যের অলংকারসমৃদ্ধ শব্দসমেত ভাষণে পুরো ক্লাস মাত; পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে ক্লাস শেষ হলে শুরু হতো মৃদু গুঞ্জন। এমনিতে কাটখোট্টা ও গুরুগম্ভীর মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন রসে টইটম্বুর। মাঝেমধ্যে তাঁর সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত।

তিন

আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ এই মানুষটি একটি অসাধারণ পরিবারে জন্ম নেন। দার্জিলিং ও লাহোরে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। বাবার ইচ্ছা ছিল চামড়াশিল্পের ওপর উচ্চশিক্ষা নেবেন; কিন্তু বনে গেলেন অর্থনীতিবিদ। তিনি অবশ্য বলে থাকেন যে অর্থনীতি পড়ার আগ্রহ কোনোকালেও ছিল না, অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠা নাকি নিছক একটা ‘অ্যাকসিডেন্ট’। এই যে না চাইতেই অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠা তার মানে দাঁড়ায় নাচতে জানলে সব উঠোনই সোজা। পলিটিক্যাল ইকোনমির এমন কোনো শাখা-প্রশাখা নেই, যেখানে তাঁর পদচারণ নেই।

চার

তিনি প্রথম বোমা ফাটালেন ১৯৬১ সালে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য নিয়ে এক সেমিনারে, পাকিস্তানে বিরাজমান দুই অর্থনীতির কথা তুলে ধরে। বয়স তখন বড়জোর ২৬ বছর, একজন ইয়াং লেকচারার মাত্র। মজার ঘটনা হলো, ঠিক তার পরের দিন বিখ্যাত ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দুটি শিরোনাম জায়গা নিল—একদিকে রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতি এবং অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এক অর্থনীতি। এমনই করে মাত্র ২৬ বছরের রেহমান সোবহান লৌহশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কপালে ভাঁজ ফেলার এবং আরামের ঘুম হারাম করার সব বন্দোবস্ত করে ‘কালের কণ্ঠ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন!

পাঁচ

আমাদের তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে টার্ম পেপার লেখাতেন। সে লক্ষ্যে রোদ-বাদলে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। পরবর্তী সময় বের করলেন একটি প্রতিবাদী পত্রিকা ‘ফোরাম’। এর মাধ্যমে হয়ে উঠলেন সেই কালের কণ্ঠ। খুব অল্পদিনের মধ্যে পত্রিকাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে তরুণ প্রজন্ম তথা বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মন কেড়ে নিল। ওই পত্রিকায় রেহমান সোবহান ছাড়াও ওয়াহিদুল হক, আনিসুর রহমান, নুরুল ইসলাম ও অন্যান্য বিদগ্ধ সমাজবিজ্ঞানী ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতেন। তবে ওই সব লেখা বাদ দিলেও প্রায় ৩০টি বই, ২০টি রিসার্চ মনোগ্রাফ ও প্রফেশনাল জার্নালে ১৪০টি লেখাসহ তিনি গড়েছেন প্রকাশনার এক পাহাড়। দ্বিতীয়কাল পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে একটি ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক দলিল প্রণয়নে লিপ্ত থাকেন। ঢেঁকি যে স্বর্গে গেলেও ধান ভানে তার প্রমাণও তিনি রেখেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে প্রথম দিন থেকে নজর দিলেন গবেষণালব্ধ একটা টাস্কফোর্স রিপোর্ট তৈরির জন্য, যা পরবর্তী সরকারকে অর্থ ও সমাজ নীতির ওপর কিছুটা হলেও ধারণা দেবে।

ছয়

দারুণ মজার মানুষ রেহমান সোবহান। মুখে মুচকি হাসি লেগেই আছে, হোক সেটা চরম রাগের সময় কিংবা সমালোচকের মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সিপিডির বিভিন্ন ডায়ালগে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে দেখেছি তিনি থাকেন মধ্যমণি হিসেবে; বাকি সবাই অপেক্ষাকৃত নিষ্প্রভ—এমনকি মন্ত্রী, এমপি, দাতাগোষ্ঠীর সদস্য। মানুষ তিনি মহান হৃদয়েরও। অধ্যাপক রেহমান সোবহান আপাদমস্তক মানবিক; আদর্শগত অবস্থান থেকে সাম্যবাদী ও মার্ক্সীয় চিন্তা-চেতনায় লালিত ও পুষ্ট। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ছয় দফার খসড়ায় উল্লিখিত বৈষম্য দূরীকরণে লক্ষ্য ও কৌশলকে, যা পরবর্তী সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুঘটক হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। একটি ন্যয়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে। সেই দলিলে উপস্থাপিত সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ঠিক করার দায়িত্বে অন্যদের সঙ্গে অধ্যাপক রেহমান সোবহানও ছিলেন।

সাত

তৃতীয়কাল তাঁর কণ্ঠ শুনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মাধ্যমে। সিপিডি আজ দেশে-বিদেশে বেসরকারি থিংক-ট্যাংক হিসেবে সুপরিচিত। যত দূর মনে পড়ে, বিভিন্ন বাহানায় দাতাগোষ্ঠীর শর্তারোপ ও সরকার কর্তৃক সেই শর্ত বিনা বিতর্কে গ্রহণ এবং সার্বিকভাবে সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক বিতর্কের অভাব থেকে তিনি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। জীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি অসমতার বিরুদ্ধে এক অদম্য যোদ্ধা হিসেবে থাকছেন রেহমান সোবহান। এই তো সেদিন আমাদের ‘কালের কণ্ঠ’ ৮২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক সেমিনারে দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোগত বৈষম্য নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন। বললেন, মরা ব্যাঙ কুয়ায় রেখে যেমন পানি সেচে লাভ নেই, তেমনি কাঠামোগত বৈষম্য বজায় রেখে শুধু দরিদ্রের জন্য সম্পদ নির্দিষ্টকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্য দূর করা যাবে না। মাথার ওপর বিপ্লবের বাজ পড়ার আগেই বৈষম্য নিরোধে সব ব্যবস্থা নিতে সবাইকে আহ্বান জানালেন।

 

এমনইভাবে কালের কণ্ঠ রেহমান সোবহান সমাজের সেবায় নিয়োজিত। তিনি আগামীকালেরও কণ্ঠ।

আজ ৮২তম জন্মদিনে আবারও তাঁর দীর্ঘ উৎপাদনক্ষম জীবন কামনা করি।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


 

Published in বণিকবার্তা on Saturday, 11 March 2017

অধ্যাপক রেহমান সোবহান

চিত্ত যার ভয়শূন্য উচ্চ যার শির

আবদুল বায়েস

_MG_6524

আজ প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর রেহমান সোবহানের শুভ জন্মদিন। বাংলাদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ার মহিমান্বিত এ মানুষটির জন্ম কলকাতায়, ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ। তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে স্যারকে দু-একটা কথা বলতেই হচ্ছে। কেননা আমার জীবনের বিভিন্ন ধাপে তাঁর প্রবল প্রভাব অনুভব করে থাকি। সে কথা না হয় পরে হবে, তার আগে সম্পর্কের কথাটা একটু বলে নিই।

কথায় আছে, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলাম ১৯৬৭ সালে। প্রথম দুই বছর কোনোমতে কেটেছে মাঝে মাঝে ক্লাস না হওয়ার করুণ কাহিনী নিয়ে। তৃতীয় বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে উঠে শুনি রেহমান সোবহান নামে একজন শিক্ষক ক্লাস নেবেন। তিনি নাকি খুব বিখ্যাত ব্যক্তি। চারদিকে হাঁকডাক পড়ে গেল। এমনিতেই তো ক্লাস হয় না, তার ওপর ক্লাস নেবেন রেহমান সোবহান এবং পড়াবেন পাকিস্তান ইকোনমিকস— এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি! কিন্তু আমাদের বাড়া ভাতে ছাই দিতে চাইল দু-একজন সিনিয়র ভাই এই বলে যে, স্যার এক ফোঁটা বাংলা জানেন না, তার ওপর পড়াবেন রসকষহীন একটি বিষয়। সুতরাং ক্লাস না করে ক্যান্টিনে বসে চা খাওয়া অধিকতর কল্যাণকর। কিন্তু কী কারণে জানি না, সেদিন সেই উপদেশ অগ্রাহ্য করে ক্লাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ওই যে ক্লাসে গেলাম, যেতেই থাকলাম— কখনো সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ক্যান্টিনে ঢুঁ মারার কথা ভাবিনি। ভাবনা একটা ছিল অবশ্য, তবে তার ঠিক উল্টোটা— আহ্, ক্লাসটা যদি আরো দীর্ঘায়িত হতো! সেই থেকে রেহমান সোবহান আমাদের প্রিয় শিক্ষক।

 

দুই

রেহমান সোবহান স্যার সম্মোহনী ও সমুউদ্ভাসিত ভাষণে ক্লাসে চোখের পাতা ফেলা কিংবা উসখুস করার সুযোগ দিতেন না; কথা শোনার জন্য সবসময় ‘হাউজফুল’ ক্লাসে সবাই উত্কর্ণ হয়ে থাকতাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনর্গল ইংরেজি ভাষায় লম্বা বাক্যের অলঙ্কারসমৃদ্ধ শব্দসমেত ভাষণে পুরো ক্লাস মাত। আপাতদৃষ্টে কাটখোট্টা ও গুরুগম্ভীর এবং ফ্রেমের পুরু লেন্সে বড় চোখে তাকালেও ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন রসে টইটুম্বুর। ক্লাসে বসে মাঝে মাঝে তাঁর সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। যেমন— ‘পাকিস্তানের অর্থনীতি কাঠের মাচার ওপর নির্মিত বহুতলবিশিষ্ট একটা দালান মাত্র এবং সেই কাঠ আবার সেগুন কাঠও নয়;’ ‘নবাব আবদুল গফুর খান হোতি ইজ দি গ্রেটেস্ট চিনি চোর অব পাকিস্তান’ ইত্যাদি। এমনতর আরো অনেক মজার ঘটনার কথা মনে করা যেতে পারে যেমন— ১৯৬৯ সালের কোনো একদিন। পুরো পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল; যেন একটা উত্তপ্ত কড়াই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং ৬ দফার বাস্তবায়ন চেয়ে মিছিল আর গগণবিদারি স্লোগানে কলাভবন তথা পুরো ক্যাম্পাস প্রকম্পিত। রেহমান সোবহান আমাদের ক্লাসে পড়াচ্ছেন পূর্ব-পশ্চিম অর্থনৈতিক বৈষম্য। হঠাত্ গগণবিদারী আওয়াজ তুলে একটা মিছিল এসে ক্লাসরুমের সামনে থামল; কিছুক্ষণের মধ্যে দরজায় আঘাত এবং ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পীড়াপীড়ির শব্দ। স্যার দরজা খুলে ইংরেজিতে যা বললেন, তার সারমর্ম হলো— তোমাদের মধ্যে থেকে একজন ক্লাসের ভেতর এসে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের ওপর ভাষণ দাও; আমরা ধৈর্য নিয়ে শুনব। কারণ পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য ছয় দফার ভিত্তি। আর যদি সেটা করতে না পার তো এখান থেকে চলে যেতে পার। বলা বাহুল্য, এক মুহূর্তের মধ্যে স্লোগানধারী দল মাথা নিচু করে প্রতিবাদহীন প্রস্থান করতে বাধ্য হয়েছিল।

তিন

আর এসব কারণেই বোধহয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্রজীবনের বৈকালিক আড্ডায় প্রায়ই ‘অনুপস্থিত মধ্যমণি’ হিসেবে থাকতেন আমার প্রিয় স্যার রেহমান সোবহান। আড্ডার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত তাঁর বিলেতি চেহারা, বিলেতি ভাষা, বিলেতে পড়াশোনা, জর্ডানের রাজপরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা ইত্যাদি। তাছাড়া সব মাথা এক করে এও ভাবতাম যে পুরোপুরি একজন বাঙালি না হয়েও তিনি কী করে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সম্পূর্ণ সমর্পিত এবং বাংলাদেশে একটা বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে বুদ্ধিবৃত্তিক কারিগর হয়ে দেখা দিলেন!

চার

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির। ১৯৬১ সালে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য নিয়ে এক সেমিনারে পাকিস্তানে বিরাজমান দুই অর্থনীতির কথা তুলে ধরলেন। তখন তিনি একজন ইয়ং লেকচারার মাত্র— বয়স বড়জোর ২৬ বছর। মজার ঘটনা হলো, একদিন পর বিখ্যাত পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দুটো শিরোনাম জায়গা নিল: একদিকে রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতি, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এক অর্থনীতি। বিশ্বাস করা যায়— মাত্র ২৬ বছরের রেহমান সোবহান বৈষম্যের ওপর বিশ্লেষণধর্মী পর্যবেক্ষণ রেখে লৌহ শাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কপালে ভাঁজ ফেলার ও আরামের ঘুম হারাম করার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন! এ যেন অনেকটা বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানোর মতো অবস্থা! তাই বলে ভয়ে তিনি চুপচাপ, গুটিসুটি হয়ে বসে ছিলেন, তা কিন্তু নয়। এগিয়ে গেছেন বাঙালির স্বাধিকারের কথা নিয়ে; সান্নিধ্যে গেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিবিদদের। তিনি শিরদাঁড়া উঁচু করে ছিলেন এবং এখনো আছেন। কারণ নীতির স্বার্থে কখনো আপস করেননি। তাছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই নানা ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করা এবং বিদেশে রোভিং অ্যাম্বাসেডর হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে লিপ্ত থাকা প্রমাণ করে তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালির জন্য নিবেদিতপ্রাণ। আর তাই বোধহয় প্রয়াত অধ্যাপক আখলাকুর রহমান বলতেন, ‘রেহমান সোবহান বাঙালিদের চেয়েও বেশি বাঙালি।’

পাঁচ

মনে পড়ে তিনি অত্যন্ত যত্নসহকারে টার্ম পেপার লেখাতেন। পান থেকে চুন খসতে দিতে চাইতেন না বলে আমাদের রোদ-বাদলে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। অনুমান করি, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, প্রায়োগিক গবেষণার সূত্রপাত ওখান থেকেই। পরবর্তী সময়ে বের করলেন একটা প্রতিবাদী পত্রিকা ‘ফোরাম’। খুব অল্পদিনের মধ্যে পত্রিকাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে তরুণ প্রজন্ম তথা বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মন কেড়ে নিল। উক্ত পত্রিকায় রেহমান সোবহান ছাড়াও লিখতেন ওয়াহিদুল হক, আনিসুর রহমান, নুরুল ইসলাম। অন্য বিদগ্ধ সমাজবিজ্ঞানীরাও ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতেন। চাউর আছে যে, দুই অর্থনীতি তত্ত্ব নিয়ে ফোরামসহ অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখাগুলো সাধারণ মানুষের মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। বলতে দ্বিধা নেই যে, ফোরাম পত্রিকায় বিশেষত তাঁর লেখা থেকে অর্থনীতির জটিল বিষয় পাঠকবান্ধব করে লেখার শিক্ষাটা পেয়েছিলাম এবং পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখার অভ্যাস আমাকেও কিছুটা প্রভাবিত করেছে। তবে ওই সব লেখা বাদ দিলেও প্রায় ৩০টি বই, ২০টি রিসার্চ মনোগ্রাফ ও প্রফেশনাল জার্নালে ১৪০টি লেখাসহ তিনি গড়েছেন প্রকাশনার এক পাহাড়। কথায় বলে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন প্রথম দিন থেকে নজর দিলেন গবেষণালব্ধ একটা টাস্কফোর্স রিপোর্ট তৈরির জন্য, যা পরবর্তী সরকারকে অর্থ ও সমাজনীতির ওপর কিছুটা হলেও ধারণা দেবে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য ও কৌশল-সংক্রান্ত অবদান রেখেছেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে।

ছয়

দারুণ মজার মানুষ রেহমান সোবহান। মুখে মুচকি হাসি লেগেই আছে— হোক সে চরম রাগের সময় কিংবা কট্টর সমালোচকের মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ও সিপিডির বিভিন্ন ডায়ালগে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে তাঁকে দেখেছি মধ্যমণি হিসেবে; বাকি সবাই যেন অপেক্ষাকৃত নিষ্প্রভ— এমনকি মন্ত্রী, এমপি, দাতাগোষ্ঠীর সদস্য। মানুষ তিনি মহান হূদয়েরও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ইংরেজিতে আমার লেখা প্রথম বইয়ের ‘ফরওয়ার্ড’ লেখাতে দুরুদুরু বুকে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। খুব একটা আশা নিয়ে ফিরেনি, কারণ ওই যে প্রবাদ বলে— হাতি ঘোড়া গেল তল, ভেড়া বলে কত জল! একজন প্রভাষক ইংরেজি ভাষায় একটা টেক্সট বই লিখেছেন এবং তা-ও পড়েছে কিনা রেহমান সোবহানের মতো প্রথিতযশা প্রতিভার হাতে! পরবর্তীতে দেখা গেল, আমার বইয়ের প্রচুর গুণকীর্তন করে তিন পৃষ্ঠাব্যাপী প্রশংসাপত্রসহ যথাসময়ে পাণ্ডুলিপি ফেরত এসেছে। আমি আনন্দে আত্মহারা, গর্বে আমার বুকের ছাতি ছত্রিশ! পড়ার ঘরের শেলফে রাখা জাবির প্রথম প্রকাশনা বইটি আজও রেহমান সোবহানের মহান হূদয়ের কথা থেকে থেকে জানান দেয়। প্রফেসর রেহমান সোবহান আপাদমস্তক মানবিক; আদর্শগত অবস্থান থেকে সাম্যবাদী ও মার্কসীয় চিন্তা-চেতনায় লালিত ও পুষ্ট। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ছয় দফার খসড়ায় উল্লিখিত বৈষম্য দূরীকরণে লক্ষ্য ও কৌশলকে— যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুঘটক হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল— একটা ন্যায়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা নেয়া হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে। সেই দলিলে উপস্থাপিত সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ ঠিক করার দায়িত্বে অন্যদের সঙ্গে প্রফেসর রেহমান সোবহানও ছিলেন।

সাত

তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আজ দেশে-বিদেশে বেসরকারি থিংক ট্যাংক হিসেবে সুপরিচিত। যদ্দূর মনে পড়ে, বিভিন্ন বাহানায় দাতাগোষ্ঠীর শর্তারোপ ও সরকার কর্তৃক সেই শর্ত বিনা বিতর্কে গ্রহণ এবং সার্বিকভাবে সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক বিতর্কের অভাব থেকে তিনি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। জীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি অসমতার বিরুদ্ধে এক অদম্য যোদ্ধা হিসেবে থাকছেন রেহমান সোবহান। এই তো সেদিন ৮২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক সেমিনারে দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোগত বৈষম্য নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন। বললেন যে, মরা ব্যাঙ কুয়ায় রেখে যেমন পানি সেচে লাভ নেই, তেমনি কাঠামোগত বৈষম্য বজায় রেখে শুধু দরিদ্রের জন্য সম্পদ নির্দিষ্টকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্য দূর করা যাবে না। মাথার ওপর বিপ্লবের বাজ পড়ার আগেই বৈষম্য নিরোধে সব ব্যবস্থা নিতে সবাইকে আহ্বান জানালেন।

আজ ৮২তম জন্মদিনে আবারো তাঁর উত্পাদনক্ষম জীবন কামনা করি। জন্মদিনের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাই প্রফেসর রেহমান সোবহান আপনাকে— চিত্ত যার ভয়শূন্য উচ্চ যার শির…।

 

লেখক: সাবেক উপাচার্য ও অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


 

Published in সমকাল on Saturday, 11 March 2017

‘জাদুকর’ শিক্ষক, মানবিক সমাজবিজ্ঞানী

জন্মদিন
আবদুল বায়েস

আজ ১২ মার্চ, ২০১৭। প্রফেসর রেহমান সোবহানের শুভ জন্মদিন। ১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই বিরল প্রতিভার মানুষটি আমার প্রিয় একজন শিক্ষক এবং প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত। ৮২-তে পা ফেলার জন্য তাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। স্মৃতিতাড়িত হয়ে দেখি, সেই উত্তাল ‘৬৯ সাল থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক সম্পর্ক পরিসরে স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয়ের পরিসর প্রায় অর্ধ শতাব্দীর। তা ছাড়া শিক্ষক হিসেবে জ্ঞানদানসহ আমার জীবনে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তার প্রবল প্রভাব আজও অনুভব করি। তাই সদাশয় ও সমুজ্জ্বল এমন একজন সুহৃদ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে কলম ধরেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে প্রথম দু’বছর (১৯৬৭-১৯৬৮) জুৎসই ছিল বলা যাবে না। অনেকটাই টেনেটুনে পার করতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো শিক্ষকের অনুপস্থিতি অস্বস্তির কারণ ঘটাত। শুনতাম, নির্দিষ্ট শিক্ষক মহোদয় ক্লাস বাদ দিয়ে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) ‘তকমা’ আঁটার জন্য দিনরাত পড়াশোনা, ঘোড়ায় চড়া কিংবা টেনিস খেলা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। অ্যাডাম স্মিথ আজ থেকে প্রায় ৩শ’ বছর আগে, সম্ভবত ১৭৪০ সালের দিকে, তার শিক্ষকদের নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, দু’একজনের সঙ্গে তার মিলও খুঁজে পেতাম। অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বছর ধরে অধ্যাপকদের বেশিরভাগ এমনকি পাঠদানের ভানও করে না। এমন যখন অবস্থা, তখন সুযোগ পেলেই মধুদা’র ক্যান্টিনে বাটার টোস্ট ও ডিম খেয়ে সোজা চলে যেতাম লাইব্রেরিতে, যেখানে শরীরে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আসত শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের বিরিয়ানি ও চা থেকে।

যাক সে কথা। অবশেষে ক্লাস না হওয়ার কষ্ট একদিন শেষ হয়। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে বাতি দেখা দিলে আমাদের পিত্তে পানি পড়ে। জানলাম, অর্থনীতি অধ্যয়ন জগতের তৎকালীন তিন অত্যুত্তম তারকা (সুপার স্টার) রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান ও আজিজুর রহমান খান আমাদের ক্লাস নেবেন। বিশেষত সাহেবি চেহারার রেহমান সোবহান তৃতীয় বর্ষে পড়াবেন শুষ্ক ও নীরস বলে কথিত একটা বিষয় ‘পাকিস্তান ইকোনমিকস’। সব শুনে দু’একজন সিনিয়র ভাই বলেই ফেললেন, বেহুদা একঘেয়েমির এই ক্লাস না করে বরং ক্যান্টিনে গিয়ে চা খাও, সম্ভবত সেটা হবে কাজের কাজ। কী কারণে জানি না, সেদিন উপদেশ অগ্রাহ্য করে ক্লাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং ওই যে ক্লাসে গেলাম, যেতেই থাকলাম। কখনও সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ক্যান্টিনে ঢুঁ মারার ইচ্ছা জাগল না। ইচ্ছা ছিল বরং ঠিক উল্টোটা- আহ্, ক্লাসটা যদি আরও দীর্ঘায়িত হতো!

এমনতর ভাবনার পেছনে কাজ করেছেন ‘জাদুকর’ রেহমান সোবহান। একজন জাদুকর যেমন জাদুমুগ্ধ করে দর্শক ধরে রাখে, তিনিও তেমনি ক্লাসে সম্মোহনী ও সমুদ্ভাসিত ভাষণে চোখের পাতা ফেলা কিংবা উসখুস করার সুযোগ দিতেন না। তার কথা শোনার জন্য সব সময় ‘হাউসফুল’ ক্লাসে সবাই উৎকর্ণ হয়ে থাকতাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনর্গল ইংরেজি ভাষায় লম্বা বাক্যের অলংকারসমৃদ্ধ শব্দসমেত ভাষণে পুরো ক্লাস মাত। আপাতদৃষ্টে কাঠখোট্টা ও গুরুগম্ভীর মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন রসে টইটম্বুর। মাঝেমধ্যে তার সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। যেমন, ‘পাকিস্তানের অর্থনীতি কাঠের মাচার ওপর নির্মিত বহু তলবিশিষ্ট একটা দালান মাত্র এবং সেই কাঠ আবার সেগুন কাঠও নয়’; ‘নবাব আবদুল গফুর খান হোতি ইজ দি গ্রেটেস্ট চিনি চোর অব পাকিস্তান’ ইত্যাদি।

রেহমান সোবহান ধনী ও অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দার্জিলিং ও লাহোরে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাতে পাড়ি দিলেন। বাবার ইচ্ছে ছিল, তিনি চামড়া শিল্পের ওপর উচ্চশিক্ষা নেবেন। কিন্তু না। ধনীর দুলালরা সাধারণত যা করে তা-ই করলেন। ক্রিকেট খেলা দেখে ও এশিয়ান বিশেষত সিলেটি রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিয়ে সময় কাটানো। তার সঙ্গে অবশ্য যুক্ত ছিল দেশ-বিদেশের খবর এবং নির্দিষ্ট করে বললে রাজনীতি নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলা। এই দুলালদের মধ্যে অবশ্য হাতে গোনা ক’জন ‘ক্ষণজন্মা’ প্রতিভাবান থাকে, যারা ইচ্ছে করলে সমাজের জন্য অনেক কিছু করতে পারে। তেমনি একজন তুখোড় মেধাবী রেহমান সোবহান। তিনি অবশ্য বলে থাকেন, অর্থনীতি পড়ার আগ্রহ কোনোকালেও তার ছিল না। অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠা নাকি তার নিছক একটা ‘অ্যাক্সিডেন্ট’। তবে তিনি যা-ই বলুন, না চাইতেই অর্থনীতিবিদ হয়ে ওঠার মানে দাঁড়ায়- নাচতে জানলে সব উঠোনই সোজা। মোট কথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্রজীবনের বৈকালিক আড্ডায় প্রায়শ ‘অনুপস্থিত মধ্যমণি’ হিসেবে থাকতেন আমার প্রিয় স্যার রেহমান সোবহান। আড্ডার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত তার বিলেতি চেহারা, বিলেতি ভাষা, বিলেতে পড়াশোনা, জর্ডানের রাজপরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা ইত্যাদি। তা ছাড়া, সব মাথা এক করে এও ভাবতাম, পুরোপুরি একজন বাঙালি না হয়েও তিনি কী করে বাঙালির স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে সম্পূর্ণ সমর্পিত এবং বাংলাদেশে একটা বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে বুদ্ধিবৃত্তিক কারিগর হয়ে দেখা দিলেন!

প্রসঙ্গত ওই কারিগরের একটা কাণ্ডের কথা না বললেই নয়। ১৯৬১ সালে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য নিয়ে এক সেমিনারে পাকিস্তানে বিরাজমান দুই অর্থনীতির কথা তুলে ধরলেন। তার বয়স তখন বড়জোর ২৬; একজন ইয়ং লেকচারার মাত্র। মজার ঘটনা হলো, ঠিক তার পরদিন বিখ্যাত পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দুটো শিরোনাম জায়গা নিল :একদিকে রেহমান সোবহানের দুই অর্থনীতি ও অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এক অর্থনীতি। বিশ্বাস করা যায়- মাত্র ২৬ বছরের রেহমান সোবহান বৈষম্যের ওপর বিশ্লেষণধর্মী পর্যবেক্ষণ রেখে লৌহশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কপালে ভাঁজ ফেলে দেওয়া ও আরামের ঘুম হারাম করার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন! এ যেন বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো! তাই বলে ভয়ে তিনি চুপচাপ, গুটিসুটি হয়ে বসে ছিলেন, তা কিন্তু নয়। এগিয়ে গেছেন বাঙালির স্বাধিকারের কথা নিয়ে; হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিবিদদের সানি্নধ্যে গেছেন। তিনি শিরদাঁড়া উঁচু করে ছিলেন এবং এখনও আছেন। কারণ, নীতির প্রশ্নে কখনও আপস করেননি। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই নানা ঝুঁকি নিয়ে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে বিদেশে রোভিং অ্যাম্বাসাডর হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে লিপ্ত থাকেন। প্রয়াত অধ্যাপক আখলাকুর রহমান বোধ হয় সে জন্যই বলতেন, ‘রেহমান সোবহান বাঙালিদের চেয়েও বেশি বাঙালি।’

১৯৬৯ সালের কোনো একদিন। পুরো পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল; যেন একটা উত্তপ্ত কড়াই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও ৬ দফার বাস্তবায়ন চেয়ে মিছিল আর গগনবিদারী স্লোগানে কলাভবন তথা পুরো ক্যাম্পাস প্রকম্পিত। রেহমান সোবহান আমাদের ক্লাসে পড়াচ্ছেন পূর্ব-পশ্চিম অর্থনৈতিক বৈষম্য। হঠাৎ গগনবিদারী আওয়াজ তুলে একটা মিছিল এসে ক্লাসরুমের সামনে থামল। কিছুক্ষণের মধ্যে দরজায় আঘাত এবং ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পীড়াপীড়ির শব্দ। স্যার দরজা খুলে ইংরেজিতে যা বললেন তার সারমর্ম হলো :তোমাদের মধ্য থেকে একজন ক্লাসের ভেতর এসে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের ওপর ভাষণ দাও; আমরা ধৈর্য নিয়ে শুনব। কারণ, পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য ৬ দফার ভিত্তি। আর যদি সেটা করতে না পার তো এখান থেকে চলে যেতে পার। বলা বাহুল্য, এক মুহূর্তের মধ্যে স্লোগানধারী দল মাথা নিচু করে প্রতিবাদহীন প্রস্থান করতে বাধ্য হয়েছিল।

গল্পের এখানেই শেষ নয়। তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে টার্ম পেপার লেখাতেন। সে লক্ষ্যে আমাদেরকে রোদ-বাদলে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। অনুমান করি, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, প্রায়োগিক গবেষণার সূত্রপাত ওখান থেকেই। পরবর্তীকালে বের করলেন একটা প্রতিবাদী পত্রিকা- ‘ফোরাম’। খুব অল্প দিনের মধ্যে পত্রিকাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে তরুণ প্রজন্ম তথা বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মন কেড়ে নিল। ওই পত্রিকায় রেহমান সোবহান ছাড়াও ওয়াহিদুল হক, আনিসুর রহমান, নুরুল ইসলাম ও অন্যান্য বিদগ্ধ সমাজবিজ্ঞানী ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতেন। চাউর আছে- দুই অর্থনীতিতত্ত্ব নিয়ে ফোরামসহ অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত তার লেখাগুলো সাধারণ মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। বলতে দ্বিধা নেই, ফোরাম পত্রিকায় বিশেষত তার লেখা থেকে অর্থনীতির জটিল বিষয় পাঠকবান্ধব করে লেখার শিক্ষাটা পেয়েছিলাম এবং পত্রিকায় তার নিয়মিত লেখার অভ্যাস আমাকেও কিছুটা প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়। তবে ওইসব লেখা বাদ দিলেও প্রায় ৩০টা বই, ২০টা রিসার্চ মনোগ্রাফ ও প্রফেশনাল জার্নালে ১৪০টি লেখাসহ তিনি গড়েছেন প্রকাশনার এক পাহাড়। ঢেঁকি যে স্বর্গে গেলেও ধান ভানে_ তার প্রমাণও তিনি রেখেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন প্রথম দিন থেকে নজর দিলেন গবেষণালব্ধ একটা টাস্কফোর্স রিপোর্ট তৈরির জন্য, যা পরবর্তী সরকারকে অর্থ ও সমাজনীতির ওপর কিছুটা হলেও ধারণা দেবে।

দারুণ মজার মানুষ রেহমান সোবহান। মুখে মুচকি হাসি লেগেই আছে, হোক সে চরম রাগের সময় কিংবা সমালোচকের মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ও সিপিডির বিভিন্ন ডায়লগে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে দেখেছি, তিনি থাকেন মধ্যমণি হিসেবে। বাকি সবাই অপেক্ষাকৃত নিষ্প্রভ, এমনকি মন্ত্রী-এমপি, দাতা গোষ্ঠীর সদস্য। মানুষ তিনি মহান হৃদয়েরও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ইংরেজিতে আমার লেখা প্রথম বইয়ের ‘ফরওয়ার্ড’ লিখাতে দুরুদুরু বুকে তার কাছে গিয়েছিলাম। খুব একটা আশা নিয়ে ফিরিনি। কারণ, ওই যে প্রবাদ- হাতি-ঘোড়া গেল গেল তল, ভেড়া বলে কত জল! একজন প্রভাষক ইংরেজি ভাষায় একটা টেক্সট বই লিখেছে এবং তা-ও পড়েছে কি না রেহমান সোবহানের মতো প্রথিতযশা প্রতিভার হাতে! পরে দেখা গেল আমার বইয়ের প্রচুর গুণকীর্তন করে তিন পৃষ্ঠাব্যাপী প্রশংসাপত্রসহ যথাসময়ে পাণ্ডুলিপি ফেরত এসেছে। আমি আনন্দে আত্মহারা, গর্বে আমার বুকের ছাতি ৩৬! পড়ার ঘরের শেল্ফে রাখা জাবি’র প্রথম প্রকাশনা এই বইটি আজও রেহমান সোবহানের মহান হৃদয়ের কথা থেকে থেকে জানান দেয়। প্রফেসর রেহমান সোবহান আপাদমস্তক মানবিক; আদর্শগত অবস্থান থেকে সাম্যবাদী ও মার্কসীয় চিন্তা-চেতনায় লালিত ও পুষ্ট। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ৬ দফার খসড়াতে উলি্লখিত বৈষম্য দূরীকরণে লক্ষ্য ও কৌশলকে, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুঘটক হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল; একটা ন্যয়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে। সেই দলিলে উপস্থাপিত সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ঠিক করার দায়িত্বে অন্যদের সঙ্গে প্রফেসর রেহমান সোবহানও ছিলেন।

তার প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আজ দেশে-বিদেশে বেসরকারি থিংক-ট্যাংক হিসেবে সুপরিচিত। যদ্দুর মনে পড়ে, বিভিন্ন বাহানায় দাতা গোষ্ঠীর শর্তারোপ ও সরকার কর্তৃক সেই শর্ত বিনা বিতর্কে গ্রহণ এবং সার্বিকভাবে সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক বিতর্কের অভাব থেকে তিনি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। জীবনের শুরু থেকে অদ্যাবধি অসমতার বিরুদ্ধে এক অদম্য যোদ্ধা হিসেবে থাকছেন রেহমান সোবহান। এই তো সেদিন ৮২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক সেমিনারে দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোগত বৈষম্য নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন। বললেন, মরা ব্যাঙ কুয়ায় রেখে যেমন পানি সেচে লাভ নেই, তেমনি কাঠামোগত বৈষম্য বজায় রেখে শুধু দরিদ্রের জন্য সম্পদ নির্দিষ্টকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্য দূর করা যাবে না। মাথার ওপর বিপ্লবের বাজ পড়ার পূর্বেই বৈষম্য নিরোধে সব ব্যবস্থা নিতে সবাইকে আহ্বান জানালেন।

 

বাংলার মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে যার এত চিন্তা-ভাবনা, সেই স্যারকে আমার লেখা দু’লাইন উপহার দিলাম :

গেয়েছ জীবনভর বাঙালির মুক্তির গান

চিরঞ্জীব হও তুমি- রেহমান সোবহান।

আজ ৮২তম জন্মদিনে আবারও প্রফেসর রেহমান সোবহানের দীর্ঘ উৎপাদনক্ষম জীবন কামনা করি।

– প্রাক্তন উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়