Originally posted in প্রথম আলো on 26 February 2026

জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার প্রশ্নটি। গত বছর ব্যবসায়ী মহল জোরালোভাবে এই দাবি তুলেছিল। তাঁদের উদ্বেগ ছিল, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য দেশের প্রস্তুতি কতটা যথাযথ। অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে উত্তরণ স্থগিতের পক্ষে অনুকূল অবস্থান নিলেও পরে সে পথে না এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। এখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারকে চিঠি দিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন সিডিপিতে জমা দিয়ে জানিয়েছে, দেশটি এখন এলডিসি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের নভেম্বরে উত্তরণের লক্ষ্যে অগ্রসর থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নে অগ্রগতির দাবি করা হয়েছে।
উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড হলো মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। এই সূচকগুলোর ধারাবাহিক উন্নয়ন বজায় রাখা এবং উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্য ও আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়াই এখন নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
উত্তরণ বিলম্বিত করার পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো, কোভিড মহামারি, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা এবং দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রস্তুতির গতি কমিয়ে দিয়েছে। এতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা চাপে পড়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এলডিসি মর্যাদা হারালে যে শুল্ক-সুবিধা কমে যাবে, তাতে রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হতে পারে। সরকারের ধারণা, উত্তরণের সময় কিছুটা বাড়ানো গেলে সংস্কারগুলো গুছিয়ে নেওয়া এবং অর্থনৈতিক স্থিতি পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে।
জাতিসংঘের এলডিসিভুক্ত দেশগুলো কিছু বিশেষ সুবিধা পায়। এর মধ্যে আছে উন্নত দেশগুলোর বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মে বিশেষ সুবিধা, স্বল্প সুদে ঋণ এবং কারিগরি সহায়তা। এলডিসি থেকে উত্তরণ নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে। তিনটি সূচকের মধ্যে অন্তত দুটি পূরণ করতে হয়। অথবা পরপর দুই দফা পর্যালোচনায় একটি সূচকে নির্ধারিত সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে অতিক্রম করলেও উত্তরণের যোগ্যতা অর্জিত হয়।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের অধীনে এই প্রক্রিয়া তদারক করে সিডিপি। তারা প্রতি তিন বছরে অগ্রগতি মূল্যায়ন করে এবং মানদণ্ড পূরণ হলে উত্তরণের সুপারিশ করে। পরপর দুই দফা ইতিবাচক পর্যালোচনার পর বিষয়টি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল অনুমোদন করে। পরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। সাধারণত উত্তরণের সিদ্ধান্তের পর একটি দেশকে তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়। এই সময়ে এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য ও আর্থিক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসে এবং দেশকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
এলডিসি থেকে উত্তরণ স্থগিত করা সাধারণ প্রক্রিয়া নয়। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না এবং কেবল কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেও হয় না। সিডিপি চাইলে পরবর্তী ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা পর্যন্ত উত্তরণ স্থগিতের সুপারিশ করতে পারে। আবার কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের মহাসচিবকে উদ্বেগ জানালে বিষয়টি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল বা সাধারণ পরিষদে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে কোনো দেশ নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে গেলে উত্তরণ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে এবং আবার মানদণ্ড পূরণ না করা পর্যন্ত দেশটি এলডিসি হিসেবেই বিবেচিত হয়।
এ ধরনের স্থগিতের ঘটনা খুব বেশি না হলেও নজির আছে। সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ২০২৩ সালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে তিন বছরের সময় বৃদ্ধি পায়। অ্যাঙ্গোলা বৈশ্বিক তেলের দামের ধাক্কায় সূচকের অবনতি হওয়ায় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সময় বাড়াতে সক্ষম হয়। ভানুয়াতু ও কিরিবাতির মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে একাধিকবার স্থগিত সুবিধা পেয়েছে। মালদ্বীপ ২০০৫ সালের সুনামির পর উত্তরণের সময় বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে এলডিসি তালিকা থেকে বের হয়। মিয়ানমার ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সময় পায়। নেপাল ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর একই ধরনের সুবিধা পায়। কোভিড মহামারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণের সময়ও ২০২৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
উদাহরণগুলোর একটি মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল বড় ও প্রমাণযোগ্য ধাক্কা, যা সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়নের গতিকে স্পষ্টভাবে পিছিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে নয়; গুরুতর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা পরিবেশগত সংকটের প্রেক্ষাপটেই স্থগিতের অনুমোদন মিলেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি ভিন্ন। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্থরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা সত্ত্বেও মূল সূচকগুলো এখনো জাতিসংঘ নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে। ফলে কেবল পরিসংখ্যানগত ভিত্তিতে স্থগিতের পক্ষে শক্ত যুক্তি তুলে ধরা কঠিন।
তবে আবেদন গৃহীত হোক বা না হোক, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অনিবার্য। উত্তরণ অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি, কিন্তু এর সঙ্গে বড় ধরনের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জড়িত। অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা, স্বল্প সুদে ঋণ এবং বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। প্রস্তুতি যথেষ্ট না হলে রপ্তানি, রাজস্ব স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিতর্কে আটকে না থেকে উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রাজস্ব আহরণ এবং আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্কার অপরিহার্য। বাণিজ্য আলোচনায় দক্ষতা বাড়িয়ে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি এগিয়ে নিতে হবে। পণ্যমান, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার কাঠামো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা জরুরি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণী সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশলগতভাবে খাপ খাওয়ানো যায়।
স্বল্প সুদে বৈদেশিক অর্থায়ন কমে এলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করতে হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমানো এবং কর প্রদানে আনুগত্য বাড়ানো জরুরি। শুল্ককাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও রাজস্ব আহরণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিচারব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার করবে। কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ওষুধশিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উদীয়মান খাতগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ জরুরি। গবেষণা সহযোগিতা, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে উচ্চ মূল্য সংযোজনমুখী উৎপাদনে অগ্রসর হওয়াই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে কিছু জনগোষ্ঠী বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান সহায়তা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ মানবসম্পদের অগ্রগতি ধরে রাখতে সহায়তা করবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নিশ্চিত করবে, উত্তরণের ফলে বৈষম্য যাতে না বাড়ে; বরং টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু এলডিসি মর্যাদা বজায় রাখা বা না রাখার ওপর নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কৌশলগত সংস্কার বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং সম্মিলিত অঙ্গীকারের মাধ্যমে এই উত্তরণকে স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সুযোগে রূপান্তর করা কতটা সম্ভব হয়।
ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। মতামত লেখকের নিজস্ব।


