Home / Events / মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশে দলিতদের প্রতি বৈষম্য উচিত নয়

মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশে দলিতদের প্রতি বৈষম্য উচিত নয়

বাংলাদেশ অতি শীঘ্রই মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও দেশের দলিত জনগোষ্ঠী নিদারুণ বৈষম্যের শিকার হয়ে জীবনধারণ করছে। এই অসমতার অবসান ঘটানো সম্ভব এসডিজির মৌলিক চেতনা, ‘কাউকে পেছনে রাখা যাবে না’ এর যথার্থ উপলব্ধি ও যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এ ধরণের আলোচনা উঠে এসেছে ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এর আলোকে বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর অবস্থান’ শিরোনামে আয়োজিত একটি সংলাপ হতে।

ডঃ মেঘনা গুহঠাকুরতা, নির্বাহী পরিচালক, রিইব

অভিযান; হেকস/ইপার; সিপিডি; নাগরিক উদ্যোগ; রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস্, বাংলাদেশ (রিইব) এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ এর যৌথ উদ্যোগে গত ১২ নভেম্বর ২০১৭ রবিবার সকাল ৯.৩০ টায়, সিরডাপ মিলনায়তনে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর মাননীয় তথ্য মন্ত্রী জনাব হাসানুল হক ইনু, এম পি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম (সিনিয়র সচিব)। সংলাপের সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এর আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সংলাপে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন হেকস/ইপার এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব অনীক আসাদ এবং অভিযান এর সাধারণ সম্পাদক মিজ বনানী বিশ্বাস সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন।

ডঃ মেঘনা গুহঠাকুরতা, নির্বাহী পরিচালক, রিইব, সংলাপের মূল বক্তব্য পেশ করেন যার প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল এসডিজি এর পটভূমি, প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শ্রেণিকরণ, তাদের বর্তমান অবস্থান ও তা হতে উত্তরণের জন্য কিছু সুপারিশমালা। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও স্বাস্থ্যসেবায় দলিত জনগোষ্ঠীর সর্বনিম্ন প্রবেশগম্যতা, গুণগত ও কারিগরি শিক্ষার অভাব এবং ইতিবাচক পদক্ষেপের অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বঞ্চিত গোষ্ঠীর অধিকারবোধ ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেন। মূল বক্তব্যের পর বিশেষ আলোচক হিসেবে নাগরিক উদ্যোগ এর প্রধান নির্বাহী জনাব জাকির হোসেন বিভিন্ন গবেষণার প্রেক্ষিতে দলিত জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর উপর বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।

অনীক আসাদ, কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেকস/ইপার

সংলাপে সম্মানিত বক্তাদের কথায় উঠে এসেছে উন্নয়ন নীতিমালায় দলিত জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক অবস্থান এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে তাদের সামাজিক বহিষ্করণের চিত্র। বাংলাদেশ অবশেষে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়ন দেশের সকল মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি, রয়ে গেছে বৈষম্য। এই অবস্থা থেকে দলিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সংযোজনের লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ, খাস জমিতে দলিতদের অগ্রাধিকার, ভূমি অধিকার ও স্থায়ী বাসস্থানের অধিকার, ন্যায়বিচার লাভের অধিকার, আদি পেশা থেকে দলিতদের উচ্ছেদ রোধ, সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান অসম ও বঞ্চিত অবস্থান থেকে মুক্তির পন্থা হিসেবে আলোচকবৃন্দ দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক শনাক্তকরণ (সংখ্যা ও বঞ্চনার প্রকৃতি) এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান। এছাড়া সম্পূরক আদমশুমারীর মাধ্যমে দলিত জনগোষ্ঠীর অবস্থার প্রকৃত চিত্রের বিশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, তথ্য অধিকার আইনে তাদের প্রবেশগম্যতা, মজুরী কমিশনের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি, উন্নয়নমুখী পদক্ষেপের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ পরিবেক্ষণ প্রভৃতির দাবীও প্রকাশিত হয়। সর্বোপরি, দলিত জনগোষ্ঠীকে ‘দলিত’ শব্দটিকে নেতিবাচকভাবে না দেখে একে একটি আন্দোলনের নাম হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়।

সংলাপের বিশেষ অতিথি ড. শামসুল আলম বলেন ব্যক্তি উন্নয়নের প্রভাবে দারিদ্র্যের সূচক কমলেও অসাম্যের সূচক বাড়ছে। তবে বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কৌশলের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সুষম বন্টন এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এ অসমতা অনেকাংশে দূরীভূত করা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সংবিধানে ‘দলিত’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি না থাকলেও দরিদ্রদের জন্য পেশাভিত্তিক কর্মসূচীর কথা তিনি উল্লেখ করেন।

সংলাপের প্রধান অতিথি মাননীয় তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য নিরসনকে দুইটি ভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি সমাজবাদের দার্শনিক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির সাহায্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও যুক্তিশীল সমাজ গঠনের কথা বলেন। তিনি সরকার, বেসরকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং দলিত জনগোষ্ঠীর সাথে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করার কথা প্রস্তাব করেন এবং অস্পৃশ্যতাকে একটি দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে দাবি করে, এর সমাধানের জন্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কথা চিন্তা করার সময় এসেছে বলে ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশে-দলিত-জনগোষ্ঠীর-অবস্থান-02

 

সংলাপের সভাপতি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটি কি অর্জন করল, তা দিয়ে বিচার করতে হবে যে দেশ কি অর্জন করতে পারল। তিনি এই সরকারের আমলেই বৈষম্য বিরোধী আইনের দ্রুততার সাথে পাশ হওয়া এবং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্থিত সমস্যাগুলো নিরসনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার সুস্পষ্ট হওয়ার দাবী জানান। এছাড়া তিনি তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা ও কাঠামোতে পরিবর্তন আনয়নের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন বৈষম্য নিরসনে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প কিছু নেই।

সংলাপে সম্মানিত উন্নয়ন বিশেষজ্ঞবৃন্দ, সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Comments

Check Also

বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর অবস্থান [ছবিঘর]

অভিযান; হেক্স/ইপার; সিপিডি; নাগরিক উদ্যোগ; রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস্, বাংলাদেশ (রিইব) এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ এর যৌথ উদ্যোগে গত ১২ নভেম্বর ২০১৭ রবিবার সকাল ৯.৩০ টায়, সিরডাপ মিলনায়তনে ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এর আলোকে বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর অবস্থান’ শিরোনামে একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *