Originally posted in কালের কণ্ঠ on 4 January 2026
সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত হচ্ছে কাল
৮ মেগাপ্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ১২,২৫৪ কোটি
অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির প্রভাব
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) সরকারের ব্যয় সংকোচনের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে দেশের মেগাপ্রকল্পগুলোর ওপর। অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির প্রভাব পড়েছে দেশের বেশির ভাগ বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে। সংশোধিত এডিপিতে একযোগে আটটি মেগাপ্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এতে করে পরিবহন, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, বন্দর, বিমানবন্দর ও নগর যোগাযোগ খাতে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
৮ মেগাপ্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ১২,২৫৪ কোটিপরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল সোমবার সংশোধিত এডিপি পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় চূড়ান্ত করা হবে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ধরা ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কাটছাঁট হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
তবে সব প্রকল্পেই বরাদ্দ কমেনি। ব্যতিক্রম হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে বরাদ্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এ প্রকল্পে আগের মতোই ১০ হাজার ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ বহাল রয়েছে। আর বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া উড়ালসড়ক প্রকল্পে।
সংশোধিত কর্মসূচিতে এই প্রকল্পে অতিরিক্ত এক হাজার ১৩৪ কোটি যোগ হওয়ায় মোট বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে নগর পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মেট্রো রেল প্রকল্পগুলোতে। মেট্রো রেল লাইন-৬ প্রকল্পে বরাদ্দ ৩২৩ কোটি কমিয়ে এক হাজার ৩৪৭ কোটি থেকে এক হাজার ২৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। আরো বড় কাটছাঁট করা হয়েছে মেট্রো রেল লাইন-১ প্রকল্পে। এখানে বরাদ্দ আট হাজার ৬৩১ কোটি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
একইভাবে মেট্রো রেল লাইন-৫ উত্তর অংশের বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। এই প্রকল্পে বরাদ্দ এক হাজার ৪৯০ কোটি থেকে কমে ৫৯২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সড়ক খাতের বড় প্রকল্পগুলোর অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে বরাদ্দ এক হাজার ৮৭২ কোটি থেকে কমিয়ে এক হাজার ৫৬২ কোটি টাকা করা হয়েছে। ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক প্রকল্পেও বরাদ্দ কমেছে, যদিও পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, এখানে ৫৫ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ এলিভেটেড সড়ক প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে ৯৫ শতাংশের বেশি। মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কের ওপর মেঘনা-ধনাগোদা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ। এসব প্রকল্পে বরাদ্দ হ্রাস পাওয়ায় উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের গতি মন্থর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বন্দর ও বিমানবন্দর খাতে বরাদ্দ সংকোচনের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ চার হাজার ৬৮ কোটি থেকে কমিয়ে এক হাজার ৮৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে বরাদ্দ এক হাজার ৩৯ কোটি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩০৬ কোটি টাকা। দ্রুতগতির বাস ব্যবস্থা (বিআরটি) প্রকল্পেও বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪২৫ কোটি থেকে ১৬৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
রেলের বড় প্রকল্পগুলোও রেহাই পায়নি। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। যমুনা রেল সেতু প্রকল্পে কাটা পড়েছে ৯১০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটার গেজ রেললাইনকে ব্রড গেজে রূপান্তর প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হ্রাসের চিত্রও উদ্বেগজনক। যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীতে চারটি ৫০০ শয্যার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে দুই হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের প্রায় ৮৮ শতাংশ। সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে ৯৪ শতাংশ। চাঁদপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পে কাটা পড়েছে ৮৫ শতাংশের বেশি অর্থ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুগদা মেডিক্যাল কলেজ সম্প্রসারণসহ আরো কয়েকটি স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রকল্পে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নয়ন সহায়তা প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৭৬ শতাংশের বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৯৪ শতাংশ। সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ প্রকল্পেও বড় অঙ্কের কাটছাঁট হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। ইমপ্রুভিং আরবান গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রোজেক্ট (আইইউজিআইপি) থেকে কাটা পড়েছে প্রায় ৭১০ কোটি টাকা। ঢাকা স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৪১ শতাংশের বেশি। নগর এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রতিরোধমূলক সেবা প্রকল্পগুলোর বরাদ্দও ৮০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
আরএডিপি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক প্রকল্পে বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশার চেয়ে ধীর, বিদেশি সহায়তার অর্থছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার উন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় সড়ক, রেল ও নগর পরিবহন প্রকল্পের কাজ আরো ধীর হয়ে পড়তে পারে। এতে বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হতে সময় বাড়বে এবং পরিবহনব্যবস্থার দক্ষতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উন্নয়ন ব্যয় কমে গেলে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।



