Wednesday, April 1, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Khondaker Golam Moazzem

উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা নয়, বিদ্যমান সংসদ শক্তিশালী হোক – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও রুকাইয়া ইসলাম

সংস্কার

Originally posted in সমকাল on 26 March 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদীয় ‘বিশেষ কমিটি’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি আদেশ ও অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শুরু করেছে। কমিটির আলোচনা ও মতামতের আলোকে এগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হবে, যা ৩০ দিবসের মধ্যে পাস বা বাদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই সনদের আলোকে গণভোট আয়োজন অধ্যাদেশ দুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে সংসদে উচ্চকক্ষ স্থাপনের বিষয় রয়েছে।

অবশ্য সংসদে উচ্চকক্ষ স্থাপন বা উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্যবিশিষ্ট প্রস্তাবিত আকার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল না। নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি উচ্চকক্ষের ধারণাতে সম্মত থাকলেও এর কাঠামোর ব্যাপারে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল। সিপিডি ২০২৫ সালে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, সংসদীয় কাঠামোতে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশে নেই।

উচ্চকক্ষের পক্ষের যুক্তি– এটি আইন প্রণয়নের মান উন্নত করবে; সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে এবং নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতায় ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংসদের দুর্বলতার মূল কারণ কাঠামো নয়, বরং কার্যকারিতা। বিদ্যমান জবাবদিহির উপায়গুলো কার্যকর না করে নতুন কক্ষ যুক্ত করায় কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না; বরং নতুন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশের সংসদীয় কাঠামো দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফল; ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে এ অঞ্চলে প্রতিনিধিত্বমূলক আইনসভার ধারণা বিকশিত হতে শুরু করে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় সংসদের ধারণা প্রবর্তন করলেও বাস্তবে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন অব্যাহত ছিল। পাকিস্তান আমলেও পূর্ব বাংলার জনগণ কেন্দ্রীভূত শাসন ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তুলনামূলক ছোট ভূখণ্ড, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য এবং সীমিত আঞ্চলিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এক কক্ষই প্রতিনিধিত্ব ও আইন প্রণয়নের জন্য যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়েছিল।

গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা সংসদীয় ব্যবস্থার কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে; বিশেষত ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন। নির্বাহী বিভাগ এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সংসদীয় নজরদারিকে দুর্বল করেছে। সংসদীয় বিতর্ক কার্যত আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়েছে; বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ কমেছে এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা কমে গেছে। ফলে সংসদের সাংবিধানিক ভূমিকা– নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি পালনে ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। তবে এসব দুর্বলতা দ্বিকক্ষ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বোঝায় না।

এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে– বাংলাদেশের সংসদ কাঠামোগতভাবে দুর্বল নয়; বরং কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো অবহেলিত। সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালির নিয়ম অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগের ওপর তদারকির একাধিক উপায় রয়েছে। সংসদ সদস্যরা প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেন; স্থায়ী কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা করতে পারে এবং সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রগুলোতে এসব প্রক্রিয়াই নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশে এসব ব্যবস্থা বহুলাংশে নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত বা কার্যকর হয় না। ফলে নির্বাহী বিভাগ অতি ক্ষমতাশালী হয়ে পড়েছে।

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল উচ্চকক্ষকে মূলত দলীয় পরিচয়ের অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের জন্য আসন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পক্ষপাতী। তাদের মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, নাগরিক সমাজ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অগ্রগণ্য ব্যক্তি, জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী, নির্বাচনে সম্ভাবনাহীন বড় নেতা প্রমুখ। সব মিলিয়ে উচ্চকক্ষটি মূলত এলিট ক্লাবে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনির্বাচিত কিন্তু দলীয় পরিচয়ধারী এসব ব্যক্তি খুব কম ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। উপরন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্পর্ক গড়ে উঠলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের উচ্চকক্ষ যৌথভাবে সেনাবাহিনীপ্রধানকে জীবদ্দশায় সব ধরনের আইনি বিচারিক বিষয়ের ঊর্ধ্বে রাখার বিল পাস করেছে; সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে আরও কমিয়েছে। সুতরাং উচ্চকক্ষের তথাকথিত ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ বরং বর্তমানে পরিচালিত নিম্নকক্ষকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।
অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণে বোঝা যায়, দ্বিকক্ষীয় ব্যবস্থা সাধারণত রাষ্ট্রের বিশেষ ধরনের কাঠামো সম্পর্কিত। যেমন– ভারতে উচ্চকক্ষ ‘রাজ্যসভা’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালের সংবিধানের মাধ্যমে। কারণ দেশটি ফেডারেল ব্যবস্থানির্ভর; বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব প্রাদেশিক সরকার ও শাসনকাঠামো রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মূলত রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ‘রাজ্যসভা’ গঠিত হয়েছে। সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, রাজ্যসভার সদস্যরা নির্বাচিত হন রাজ্য বিধানসভাগুলোর মাধ্যমে। ফলে উচ্চকক্ষটি আইনসভায় রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষার সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

একইভাবে পাকিস্তানে উচ্চকক্ষ ‘সিনেট’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের সংবিধানের মাধ্যমে। জাতীয় পরিষদে প্রতিনিধিত্ব মূলত জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ায় ছোট প্রদেশগুলোর রাজনৈতিক উদ্বেগ মোকাবিলায় সিনেটে প্রতিটি প্রদেশকে সমান প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ফেডারেল কাঠামোর ভেতরে প্রাদেশিক ভারসাম্য বজায় রাখা। বাস্তবে কী ঘটেছে, সেটা আগেই আলোচিত হয়েছে।
একক রাষ্ট্র বাংলাদেশে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সাংবিধানিক ব্যবস্থাই নেই। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অধিকাংশ জনগণের মধ্যে নৈকট্য রয়েছে। ফলে রাজ্য বা প্রদেশভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আলাদা সংসদীয় কক্ষের কাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা নেই।

বাস্তবে বাংলাদেশে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর সংসদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় যেসব সংস্কার প্রয়োজন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য– সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী, সংসদীয় বিতর্ককে কার্যকর, বেসরকারি সদস্য বিল উত্থাপন কাঠামো শক্তিশালী, নির্বাহী বিভাগে সংসদের তদারকি নিশ্চিত করা, সংবাদমাধ্যম ও জনসাধারণের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং সংসদীয় বিতর্কে শরিক হওয়ার সুযোগ দেওয়া। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই সংসদকে শক্তিশালী করা সম্ভব।

অতীতে দেখা গেছে, যখন সংসদের ভেতরে জবাবদিহির চর্চা দুর্বল হয়েছে, তখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা সংসদের বাইরে বিকল্প সমাধান খুঁজেছে, যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু এ ধরনের বাহ্যিক সমাধান দীর্ঘ মেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে পারেনি। এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়– প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিবর্তন করা সহজ, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কষ্টকর।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে তাই নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি নয়, বরং বিদ্যমান সংসদকে কার্যকর করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। যখন সংবিধান এবং সংসদীয় নিয়মের মধ্যেই নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সব উপায় রয়েছে, তখন আরেকটি কক্ষ যুক্ত করা সমস্যার সমাধান নয়। আশা করছি, বিশেষ কমিটির বৈঠকে বিষয়গুলো বিবেচিত হবে।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও রুকাইয়া ইসলাম: সিপিডি পার্লামেন্টারি স্টাডিজে কর্মরত

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.