Originally posted in The Daily Star on 7 October 2026
সদাই কমিয়ে আর্থিক চাপ সামলাচ্ছে মধ্যবিত্ত

ঢাকার পিকআপচালক দেলোয়ার হোসেন (৫২) গতকাল ভর্তুকি মূল্যে সরকারি ট্রাকসেল থেকে ১১০ টাকায় ৪ কেজি আটা কিনতে প্রায় ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তার স্ত্রী আগে শুধু সংসারের কাজেই মনোযোগ দিতেন। এখন তিনি প্রতিবেশীদের পোশাক সেলাই করে মাসে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা আয় করছেন, যা দেলোয়ারের ২০-২৫ হাজার টাকার আয়ের সঙ্গে যোগ হচ্ছে।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অতিরিক্ত এই আয়টুকু থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খরচ করার আগে প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব করতে হয়।’
বাংলাদেশে এই দম্পতির মতো পরিস্থিতি এখন ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। অধিকাংশ পরিবারই বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
জুন থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও রান্নার গ্যাসের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়েছে সরকার। এর ফলে মানুষের দৈনন্দিন খরচও বেড়েছে। তবে এই বাড়তি ব্যয়ের পুরো প্রভাব এখনো আগস্টের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না মজুরি। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়ছে। এতে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
কিন্তু আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো, পণ্যের দাম এখনো বাড়ছে, তবে আগের তুলনায় ধীরগতিতে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। দুটি পরিসংখ্যানই সেপ্টেম্বরের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং চলতি সপ্তাহে এলপিজির দাম বাড়ানোর আগের।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ সেপ্টেম্বর সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন সরকারি বেতন কাঠামোর ব্যয়, এসব কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
আগস্টে ওয়েজ রেট ইনডেক্স বা মজুরি হার সূচক বছরওয়ারি ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় সামান্য কম। অর্থাৎ প্রকৃত মজুরি কমছে। যেসব পরিবারের সঞ্চয় কম, তারা কম কেনাকাটা করে, ঋণ করে অথবা দুটোই করে এই ঘাটতি সামাল দিচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের পর্যবেক্ষণে থাকা ৫০টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে ৩৩টির দাম ১৭ ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৪ অক্টোবর বেশি ছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়। ১২টি পণ্যের দাম কমেছে এবং পাঁচটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ডিম, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, চিনি, আলু, গরুর মাংস ও খাসির মাংসের দামও এক বছর আগের তুলনায় বেশি ছিল।
ছোলা ও কয়েক ধরনের মসলার দামও ফেব্রুয়ারির পর বেড়েছে।
ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রধান সমস্যা হলো অনিশ্চয়তা।
‘একটির পর একটি পণ্যের দাম বাড়ছে, আর আমরা দাম কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখছি না,’ বলেন তিনি।
পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়া আরও মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া থেকে সতর্ক করে তিনি বলেন, এ ধরনের পূর্বাভাস নিজেই মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিতে পারে।
কম কিনছে মানুষ
চলমান পরিস্থিতিতে মানুষ কেনাকাটা কম করছে। পিকআপচালক দেলোয়ারের পরিবারের কেনাকাটার ধরনেই এই চাপ স্পষ্ট।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আর বেশি পরিমাণে বাজার-সদাই কিনতে পারি না। যতটুকু প্রয়োজন, অল্প অল্প করে শুধু সেটুকুই কিনি।’
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ বাবলু বলেন, ক্রেতারা এখন কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন। আগে কেউ পাঁচ লিটার রান্নার তেল কিনলেও এখন হয়তো দুই লিটার নিচ্ছেন। আবার যিনি এক লিটার কিনতেন, তিনি কখনো কখনো আধা লিটারেই সন্তুষ্ট থাকছেন।
তার দোকানে এক মাস আগে প্রতি কেজি আটার দাম ছিল প্রায় ৫০ টাকা, যা বেড়ে এখন ৬৫-৭০ টাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পণ্যের দামের তুলনায় আয় কম। মানুষ এই চাপ অনুভব করছে।’
বাবলু বলেন, এই চাপ শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা
বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং শেওড়াপাড়ায় বসবাসকারী ইসহাক বিন শরীফ মাসে ৪৬ হাজার টাকা আয় করেন, যা আগে ছিল ৪২ হাজার টাকা।
কিন্তু তার বাড়িভাড়া ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বেতন ৪ হাজার টাকা বাড়লেও এর মধ্যে ১ হাজার ৫০০ টাকা ইতোমধ্যে বাড়িভাড়াতেই চলে যাচ্ছে।
ইসহাক বলেন, সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে হলে অনেক সময় বাস অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কিংবা বাস পাওয়া কঠিন হওয়ায় তাকে মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে হয়। তিনি বলেন, এসব যাতায়াতের খরচও বেড়েছে।
মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নাদিম হোসেনের পরিবারে এই চাপ ইতোমধ্যে ঋণের বোঝা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘পণ্যের দাম আর আমার বেতনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। প্রায় এক বছর ধরে আমি ঋণগ্রস্ত। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় করতে পারছি না। একটি জিনিস কিনলে আরেকটি কিনতে পারি না।’
রান্নার গ্যাস বিশেষভাবে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাদিম বলেন, সম্প্রতি যে সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা, এলাকার বাজারে এখন ৩ হাজার টাকা দিয়েও সেটি পাওয়া কঠিন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপটেই নাদিমের এই অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে।
জুনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। আবাসিক গ্রাহকদের সবচেয়ে কম ব্যবহারের দুটি স্ল্যাব বাদ দেওয়ার পর ভারিত গড় খুচরা বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে প্রায় ১০ টাকা ৪০ পয়সায় দাঁড়ায়, যা আগে ছিল ৯ টাকা ১১ পয়সা।
২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে।
এরপর বেড়েছে পরিবহন ভাড়াও। দূরপাল্লার বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। আর ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাসভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে।
সর্বশেষ রোববার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নিয়ন্ত্রিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করেছে বিইআরসি।
যোগাযোগ করা হলে রাজধানীর ১০ জন খুচরা বিক্রেতার মধ্যে আটজনের কাছে কোনো সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। বাকি দুজন যথাক্রমে ১ হাজার ৯০০ টাকা ও ২ হাজার ২৫০ টাকা দাম চাচ্ছিলেন।
ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি এমনিতেই উচ্চমূল্যের চাপে থাকা পরিবারগুলোর ওপর আরও চাপ বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ এমনিতেই তীব্র চাপের মধ্যে আছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, গ্যাসের দাম বেড়েছে, সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ওপর এসব মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন খরচ সামলানো নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষকে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই রেস্তোরাঁগুলোতেও ক্রেতা কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁগুলোকে এখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, এলপিজি ও কাঁচামালের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এখন রেস্তোরাঁয় খাওয়া বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।’ তিনি জানান, তার রেস্তোরাঁয় ক্রেতার সংখ্যা প্রায় ১০-১৫ শতাংশ এবং বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
হাসান বলেন, ‘আগে কোনো ক্রেতা মাংসের পদ অর্ডার করতেন, এখন তিনি সবজি বেছে নিচ্ছেন। যিনি আগে কাবাব ও রুটি খেতেন, তিনি এখন হয়তো শুধু একটি মোগলাই পরোটা অর্ডার করছেন।’
সবার বেতন বাড়ছে না
সরকারি কর্মচারীরা চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী অক্টোবরের বেতন পাবেন। এর সঙ্গে জুলাই থেকে তিন মাসের বকেয়া বেতনও পাওয়ার কথা রয়েছে। সংশোধিত মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করা হচ্ছে এবং ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে।
তবে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ শ্রমিকের জন্য দেশব্যাপী এ ধরনের বেতন সংশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। বেতন সমন্বয় অনেকাংশেই ব্যক্তিগত নিয়োগকর্তাদের ওপর নির্ভর করে। ফলে আয় সবার জন্য একযোগে না বাড়লেও বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক শ্রমিককেই নিজেদের আয় থেকে সামলাতে হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, উচ্চ আমদানি শুল্ক পণ্যের দামের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে কি না, নীতিনির্ধারকদের তা খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, দেশীয় শিল্পকে আংশিকভাবে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শুল্ক আরোপ করা হলেও বাংলাদেশ এখনো অনেক পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, যেখানে দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়েনি, সেখানে সেই বাড়তি খরচ ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেললে উচ্চ আমদানি শুল্ক বহাল রাখার যৌক্তিকতা সরকারকে বিবেচনা করা উচিত।
নাজনীন বলেন, শক্তিশালী দেশীয় শিল্প এবং আয়কর আদায়ের উন্নতি রাজস্বের জন্য আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ব্যয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে, যা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলতে পারে।


