ঋণের উৎস বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে পারে: মোস্তাফিজুর রহমান

কঠিন হচ্ছে শর্ত

Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 29 October 2026

১০ বছরে জাপানের ঋণের সুদহার বেড়েছে ৩৫০ গুণ

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিয়মিত অনুদান, কারিগরি সহযোগিতা ও সহজ শর্তের ঋণ দিয়ে আসছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগি সংস্থা (জাইকা)। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বড় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণের গুরুত্ব বেড়েছে। এসব খাতে জাপানের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তবে গত এক দশকে সহজ শর্ত থেকে ক্রমে কঠিন হচ্ছে জাপানের ঋণ।

সুদের হার বাড়ানোর পাশাপাশি সহজ শর্ত থেকে বেরিয়ে ঋণ নিতে কঠিন শর্ত দিচ্ছে জাইকা। ২০১৫ সালে দেশটি বাংলাদেশকে প্রদত্ত উন্নয়ন ঋণের বার্ষিক সুদহার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে সেই সাধারণ স্থির সুদের হার বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে সুদহার বেড়েছে ৩৫০ গুণ বা ৩৫ হাজার শতাংশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাপানের ঋণের সুদহারে এ ধরনের পরিবর্তনে ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণের পরিমাণ বেশি হলে সুদের হারের সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ব্যয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইআরডির তথ্যমতে, ১৯৭২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাপানের প্রতিশ্রুত সহায়তার মধ্যে ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং অনুদান প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৫ সালেও জাপানের ঋণের বার্ষিক সুদ ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে ছয়টি প্রকল্পে জাপানের এক হাজার ৩৩২ কোটি ৬৫ লাখ ইয়েনের ঋণচুক্তি হয়। এসব ঋণের সুদ ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর। তবে ২০১৫ সালেই বাংলাদেশের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর জাপান ঋণের শর্ত কঠোর করার প্রস্তাব দেয়। পরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সুদ বেড়ে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে তা ১ শতাংশে উন্নীত হয়।

ইআরডি প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কিছু ঋণে সুদ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে নতুন ঋণ প্যাকেজে ১ শতাংশ করা হয়। ২০২০ সালেও ঋণের ধরন ও ঋণগ্রহীতার শ্রেণি অনুযায়ী সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালে কিছু ঋণে সুদ ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, অন্য প্যাকেজে ১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৩ সালে কিছু ঋণে তা ১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৪-২৫ সালে বিভিন্ন প্রকল্পে সুদহার ছিল ১ দশমিক ৩ থেকে ২ শতাংশ। এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সাধারণ স্থির সুদের হার ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ১ অক্টোবর থেকে তা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। তবে সব ঋণের সুদ এক নয়; ঋণের ধরন, চুক্তির সময় এবং প্রযোজ্য শর্তের ওপর হার নির্ভর করে।

জানা গেছে, বর্তমান সাধারণ শর্তে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৩০ বছর, যার মধ্যে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড। ঋণের ভাসমান সুদের প্রাথমিক হার তুলনামূলক কম হতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের একটি ঋণের সুদহার প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও বাজারের ভিত্তি হার বাড়লে ভবিষ্যতে তা বাড়তে পারে।

সুদ বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ, আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি এবং জাপানের নিজস্ব অর্থায়ন ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে। জাইকা সাধারণত ছয় মাস পর পর ঋণের শর্ত পর্যালোচনা করে। তবে নতুন ঋণের সুদ বাড়লেও পুরোনো চুক্তির সুদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই হারে বাড়ে না।

ইআরডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, জাপানের ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণ শর্তাবলিতে মূলত দুটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, যার একটি হলো স্থির সুদের হার এবং অন্যটি পরিবর্তনশীল সুদের হার। ঢালাওভাবে সব প্রকল্প ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সুদে নেওয়া হয়েছে বললে তা সঠিক হবে না। তিনি বলেন, কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বাড়ি, ভবন বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নেওয়ার মতো। গ্রাহক যদি ব্যাংককে বলেন, তিনি ৪০ বছরে ঋণ পরিশোধ করবেন, তবে ব্যাংক এক ধরনের চড়া সুদের হার নির্ধারণ করবে। আর যদি এক বছরের মাথায় পরিশোধের অঙ্গীকার করেন, তবে সুদের হার অনেক কমিয়ে দেবে। তবে দীর্ঘ সময় পাওয়ার সুবিধার্থে বাংলাদেশ সাধারণত ১০ বছরের রেয়াতকালসহ ৩০ বছর মেয়াদি আদর্শ নিয়মটিই অনুসরণ করে থাকে।

তিনি বলেন, ৫ হাজার কোটি টাকার কোনো প্রকল্পের ঋণ যদি স্থির হারের বদলে পরিবর্তনশীল হারে নেওয়া হয়, তবে সেখানে ভিত্তি পয়েন্টের হিসাব কার্যকর হয়। এক্ষেত্রে মেয়াদভেদে ৩০ ভিত্তি পয়েন্ট, ৪০ ভিত্তি পয়েন্ট, ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট কিংবা ১৫ ভিত্তি পয়েন্ট নির্ধারিত থাকে। পরিবর্তনশীল হারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সাধারণত ৩০ বছর মেয়াদি পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রাকেই প্রাধান্য দেয়। এই পরিবর্তনশীল হারের হিসাবটি জাপানের টোকিও মেয়াদি ঝুঁক্তিমুক্ত সুদের হার বা টিওআরএফের ওপর নির্ভরশীল, যা জাপানের ঝুঁক্তিমুক্ত বন্ড বাজারের সূচকের ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়। এটি ঠিক শেয়ার বাজারের মতো না হলেও বন্ড বাজারের দরপতন বা বৃদ্ধির সঙ্গে ওঠানামা করে। প্রতি দুই দিন পরপর বা প্রতিদিনই এ হার পরিবর্তিত হচ্ছে।

এদিকে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণেও অর্থায়ন ব্যয়ের পার্থক্য রয়েছে। ইআরডির তথ্য বলছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহজ শর্তের ঋণে রেয়াতকালে সুদ ১ শতাংশ এবং মূল ঋণ পরিশোধকালে ১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিতে হয়। তবে কিছু অন্য ঋণে এ হার ২ শতাংশ। আবার বাজারভিত্তিক ঋণের সুদ পরিবর্তনশীল। ঋণ পরিশোধের মেয়াদকাল ২০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে পাঁচ বছর।

বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ক্ষেত্রেও সহজ শর্তের ঋণ ও বাজারভিত্তিক আইবিআরডি ঋণের সুদ এক নয়। বর্তমানে আইডিএর ঋণে ২ শতাংশ সুদ এবং পরিশোধের মেয়াদকাল ৪০ বছর ও গ্রেস পিয়িড রয়েছে পাঁচ বছর। চীন সরকারও ২ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। তবে ঋণ পরিশোধের মেয়াদকাল ২০ বছর ও গ্রেস পিরিয়ড ধরা হয়েছে পাঁচ বছর। এ সাধারণ কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) বাংলাদেশকে ক্ষেত্রবিশেষে ১ থেকে ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ সুদ হারে ঋণ দিচ্ছে। এতে পরিশোধের মেয়াদকাল ১৮ থেকে ৩৫ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড তিন থেকে সাত বছর ধরা হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, মূলত মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুবাদে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সংস্থার সহজ শর্তের ঋণ জানালা বা সফট উইন্ডো থেকে সুবিধা পাওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে সহজ শর্তের সুবিধাজনক ঋণের সুযোগ কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক ঋণের শর্ত কঠিন হয়ে পড়া একটি স্বাভাবিক ও সাধারণ অর্থনৈতিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এ উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সুদের হারের ঊর্ধ্বমুখী চাপ সামলাতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক দর কষাকষির ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে যদি সুদের হার কিছুটা কমানো সম্ভব হয়, তবে তা দেশের ঋণ সেবার সার্বিক দায়ভার লাঘবে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট রয়েছে, তার আওতায় আলোচনা চালিয়ে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। পাশাপাশি দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার পরিধি এবং ঋণের আওতা বাড়ানো যায় কিনা, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সম্প্রতি গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণে সুদের হার গড়ে ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। এ অবস্থায় বৈদেশিক ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে মনে করেন তিনি। উদাহরণ টেনে বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বিশ্বব্যাংকের কিছু নমনীয় অর্থায়ন জানালা রয়েছে যেখানে সুদের হার এখনও প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কিছু নির্দিষ্ট অর্থায়ন সুবিধা রয়েছে যেখানে সুদের হার তুলনামূলক কম, সেগুলো নেওয়ার চেষ্টা চালানো যেতে পারে।

তিনি বলেন, যদিও অনেক ক্ষেত্রে চাইলেই বিকল্প উৎস থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ করার সুযোগ থাকে না। যেমন মেট্রোরেল প্রকল্পের ক্ষেত্রে জাপান নিজেই অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের কাজ করছে, যা অন্য কোনো দাতা সংস্থার অর্থ দিয়ে বিকল্পভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই সম্ভাবনার ভেতরে থেকে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সর্বোচ্চ কৌশলগত দর কষাকষি অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ঋণের ঝুড়ি বা পোর্টফোলিওকে আরও বৈচিত্র্যময় রাখা গেলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দর কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তায় (ওডিএ) ৭৩টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে ২৪টি ঋণ সহায়তাপুষ্ট, ৯টি অনুদান সহায়তাপুষ্ট, ৩৭টি কারিগরি সহযোগিতার এবং তিনটি ডিআরজিএ-সিএফ প্রকল্প। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার মেট্রো রেল, মাতারবাড়ী বন্দর, যমুনা রেল সেতু ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প।

Get latest updates of CPD's research, policy discourse, publications, and events.