Originally posted in নয়া দিগন্ত on 29 January 2026
নির্বাচনে আসনপ্রতি খরচ সাড়ে ১০ কোটি টাকা
মোট ব্যয় ৩,১৫০ কোটি টাকা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গণভোটের কারণে এই বাড়তি ব্যয়। যেখানে আসনপ্রতি গড় ব্যয় হবে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। যেখানে গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বা আসনপ্রতি সাড়ে সাত কোটি টাকার বেশি। আর নির্বাচনে দৈনিক খোরাকি ভাতাতে ৭৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, অন্যান্য মনিহারিতে ৫৮১ কোটি ৬১ লাখ টাকা, সম্মানীতে যাবে ৫১৫ কোটি টাকার মত বড় ব্যয় বলে ইসির তথ্য থেকে জানা গেছে।
- দৈনিক খোরাকিতে ৭৩০ কোটি ৪২ লাখ
- মনিহারি ৫৮১+ কোটি
- সম্মানী ৫১৫ কোটি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গণভোটের কারণে এই বাড়তি ব্যয়। যেখানে আসনপ্রতি গড় ব্যয় হবে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। যেখানে গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বা আসনপ্রতি সাড়ে সাত কোটি টাকার বেশি। আর নির্বাচনে দৈনিক খোরাকি ভাতাতে ৭৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, অন্যান্য মনিহারিতে ৫৮১ কোটি ৬১ লাখ টাকা, সম্মানীতে যাবে ৫১৫ কোটি টাকার মত বড় ব্যয় বলে ইসির তথ্য থেকে জানা গেছে। ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোটের দায়িত্বরতদের ভাতা, ভোটের উপকরণ প্রভৃতি খাতে ব্যয় বাড়ায় মোট ব্যয়ও বাড়ছে।
নির্বাচনী বাজেটের তথ্য থেকে জানা গেছে, এই নির্বাচন আয়োজনে কর্মরতদের জন্য দৈনিক/খোরাকি ভাতা- খাতে ৭৩০ কোটি ৪২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা, ক্ষতিপূরণ-দেড় শ’ কোটি টাকা, আপ্যায়ন ব্যয়-২৯০ কোটি টাকা, যানবাহন ব্যবহার (চুক্তিভিত্তিক)-দুই শ’ কোটি ৬৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, মেশিন ও সরঞ্জামাদি ভাড়া-১৫ কোটি টাকা, প্রচার ও বিজ্ঞাপন ব্যয়-৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যাতায়াত ব্যয়-১০৮ কোটি ৮০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, ভেনু ভাড়া এক কোটি ৮০ লাখ টাকা, শ্রমিক (অনিয়মিত) মজুরি-৩১ কোটি টাকা, পরিবহন ব্যয়-৮০ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, পেট্রল, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট-২৯৭ কোটি ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, মুদ্রণ ও বাঁধাই-১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্যাম্প ও সিল খাতে ১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, অন্যান্য মনিহারি খাতে ৫৮১ কোটি ৬১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, সম্মানী-৫১৫ কোটি টাকা, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি (মেরামত ও সংরক্ষণ)-৭০ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ব্যালট বাক্স খাতে পাঁচ কোটি টাকা, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি-২০ কোটি টাকা। ত্রয়োদশ নির্বাচনের জন্য চলতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা। পরে অতিরিক্ত বরাদ্দ ধরা হয় এক হাজার ৭০ কোটি টাকা। ফলে মোট ব্যয় তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
পোস্টাল ব্যালটপ্রতি খরচ ৭ শ’ টাকা: প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পাঠাতে ও পেতে এই খাতে খরচ হচ্ছে প্রতিটিতে সাত শ’ টাকা। আর অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ব্যালটে যাচ্ছে ২৩ টাকা প্রতিটির জন্য।
গণভোটের প্রচারে ১৪০ কোটি টাকা: বাজেট শাখা থেকে জানা যায়, গণভোটের প্রচারের জন্য সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি টাকা, তথ্য মন্ত্রণালয় চার কোটি ৭১ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় সাত কোটি টাকা, এলজিইডি ৭২ কোটি টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় চার কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় চার কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিচ্ছে। এই ছয় মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চার মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে এবং সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দেয়া হবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা গণভোট প্রচারে চার কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছে বাজেট শাখা। বাজেট শাখা জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যয় হবে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা, পরিচালনায় ব্যয় হবে এক হাজার দুই শ’ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে নির্বাচনী ব্যয় তিন হাজার কোটি টাকার উপরে গিয়ে ঠেকেছে।
২৬ কোটি ব্যালটে ব্যয় ৪০ কোটি টাকা: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠানে প্রায় ২৬ কোটি ব্যালট পেপার ছাপানো হচ্ছে। দুই ভোটের ব্যালট পেপার ছাপাতে মোট ব্যয় হচ্ছে ৪০ কোটি টাকা। তবে এই গণভোটের জন্য আলাদা করে ব্যালট পেপার কেনা হয়নি। সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের (ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ব্যতীত) জন্য ব্যালট পেপার কেনা হয়েছিল। আপাতত এসব ব্যালট পেপারই গণভোটের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য পরবর্তীতে আবারো ব্যালট পেপার কেনা হবে বলেও জানায় বাজেট শাখা।
ব্যয় নিয়ে অর্থনীতিবিদ যা বলছেন: খরচ আরো কমিয়ে আনা যেত কি না- এ প্রশ্নের জবাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রথমত হলো, বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেভাবে বাজেট করা হয় সেগুলো যথাযথভাবে প্রকল্পের চাহিদা মূল্যায়ন করে করা হয় কি না সেটা নিয়ে তো জেনারেলি একটা প্রশ্ন রয়েছে। সেক্ষেত্রে অভিযোগও রয়েছে যে বিভিন্ন ধরনের যারা ওই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভাগ বা পক্ষ তারা এবং এই ধরনের কাজগুলোতে যারা টেন্ডার করবেন বা কন্ট্রাক্টারি করবেন তাদের এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব বা নেক্সাস থাকে। এগুলোর মধ্যে অনেক ধরনের লেনদেন হয় এটা হচ্ছে জেনারেল একটা সমস্যা। তিনি বলেন, যেকোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে তো ত্রুটি থাকে। গত বাজেটও যেমন মুক্ত না এবারের বাজেটটাও সে অর্থে মুক্ত না বলেই আশঙ্কা করি।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, দ্বিতীয় কথা হলো, গত নির্বাচনটি হয়েছিল ২০২৩ এর ডিসেম্বরে। আবার এখন নির্বাচন হচ্ছে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে। সেই হিসাবে ধরলে প্রায় দুই বছরের কিছু বেশি সময়। সেই বিবেচনায় এখানে একটা ইনফ্লেশন অ্যাডজাস্টমেন্টের তো একটা বিষয় থাকেই। আমাদের জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি তো একটা প্রতিক্রিয়া বাজেটে থাকে। তো সেই হিসেবে গতবারের চেয়ে বাজেট বেশি লাগবে এটা ধরে নেয়া যায়।
সিপিডি গবেষণা পরিচালক বলেন, আবার একই সাথে যেহেতু গণভোট, ফলে গণভোটের পোস্টাল ব্যালট যেহেতু আলাদা। আবার একই সাথে বুথ সংখ্যা বাড়াতে হচ্ছে। যেহেতু দুটো ভোট সময় লাগবে সে কারণে ব্যয় এবং যেহেতু বেশি সংখ্যক কর্মকর্তাকে হয়তো নিযুক্ত করতে হবে কোন কোন জায়গায়, ফলে ব্যয় বাড়বেই। তো সেই সংক্রান্ত ব্যয় এগুলো যৌক্তিক এটা বোঝা যায়।
ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যা গণভোটের প্রচারক। সাধারণত প্রত্যাশা করা হয় যে গণভোট এমন একটা স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার, যা জনগণ জানেন এবং সে ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সে তার মতামত দেবেন। এটাই ধারণা করা হয়। কিন্তু এমন একটা গণভোট হচ্ছে যা সম্পর্কে মানুষজনের আসলে পরিষ্কার ধারণাও নেই এবং ফলে সেই ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। আবার আইনগতভাবে যেটা করার কথা না সেটাও করা হচ্ছে। অর্থাৎ হ্যাঁ ভোটের জন্য একদিকে যেমন প্রচার করা হচ্ছে। আবার না ভোট করলেও তাকে স্বৈরাচারের দোসর, এভাবে লেভেলিং করা হচ্ছে। যা আসলে গণভোটের যে অধ্যাদেশ সেটার পরিপন্থী। এটা আপনি করতে পারেন না। ফলে সেই ধরনের বিষয়গুলোকেও এখন এই বাজেটের যৌক্তিকতার ভিতরে সেই বিষয়গুলোকেও এখন জাস্টিফাই করতে হচ্ছে। ফলে গণভোটের জন্য প্রচারণা পর্যন্ত হয়তো ঠিক ছিল। কিন্তু হ্যাঁ ভোট দেয়া অথবা না ভোট দেয়া যাবে না এই যে বিষয়গুলো এবং তার জন্য বাজেট ব্যবহার এই বিষয়গুলোর পিছনে অর্থ ব্যয়টা যৌক্তিক নয় বলেই মনে হয়।
যা বলছে ইসি : নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ গণমাধ্যমকে জানান, প্রথমে আমরা জাতীয় নির্বাচনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। পরবর্তীতে আমাদেরকে সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোট করার জন্য নির্দেশনা দেয় সরকার। সে মোতাবেক আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বাজেটের চাহিদা পাঠাই। যার প্রেক্ষিতে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। সেই সাথে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ অনুযায়ী কিস্তির টাকা সময়মতো পেয়েছে নির্বাচন কমিশন।মিডিয়া প্রশিক্ষণ
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, কর্মী, যাতায়াত, খামসহ নির্বাচনী সামগ্রী বাবদ খরচ করছি। কিছু প্রচার-প্রচারণা ও কেনাকাটা কমিশন নিজেই করছে। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসির প্রেক্ষিতে এলজিইডি (সিসি ক্যামেরা), সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়, ধর্ম, তথ্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য আমাদের বরাদ্দ থেকে অর্থ নিয়েছে। তারা কিভাবে প্রচার করছে এবং কাকে দিয়ে প্রচার করছে সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না বলে জানান আলী নেওয়াজ।
এবার নির্বাচন আয়োজনে সার্বিক ব্যয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পদাক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যতটুকু আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ধরনের ভাতা খাতেই খরচ বেশি। বিভিন্ন রকম ভাতা দেয়ার জন্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবাইকে ভাতা দেয়া হয়। আমরা জানি না কেন ভাতা দিতে হবে তাদেরকে। কারণ আমি প্রস্তাব করেছিলাম এগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। কারণ তারা জাতীয় দায়িত্ব পালন করছে। তারা তো বেতন ভাতা পাচ্ছে। তাদেরকে কেন ভাতা দিতে হবে? তিনি বলেন, আমি মনে করি এগুলোর মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে। এটির লাগাম টানা দরকার।



