Originally posted in The Business Standard on 6 January 2026
পরবর্তী সরকারের কাজ: বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ডাটাবেজ তৈরি করা
বাণিজ্য বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক নেতারা মনে করছেন, দামের এই লাগামহীন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি এবং কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এতে আরও বেশি পরিবার দরিদ্র হতে চলেছে। ২০২৫ সাল শেষ হয়েছে ডিসেম্বর মাসে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার মধ্যে দিয়ে।
বাণিজ্য বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক নেতারা মনে করছেন, দামের এই লাগামহীন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি এবং কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া বড় রাজনৈতিক দল—বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিনিধিরা বলেছেন, পরবর্তী সরকারকে অবশ্যই বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক ছাড়ের সুফল যেন সত্যিই ভোক্তারা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি) ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতীয় দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) আয়োজিত নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলা হয়। রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে পত্রিকাটির কার্যালয়ে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাজ্যের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট সংস্থার অর্থায়নে আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনা পরিচালনা করেন টিবিএসের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, গত তিন থেকে চার বছর ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টিতে।
তিনি বলেন, মজুরি যতটা বাড়ছে তার চেয়ে বেশি হারে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় গড় হিসেবে বাংলাদেশের পরিবারগুলো প্রকৃত আয় হারাচ্ছে। এর ফলে সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে দারিদ্র্য বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তার মতে, উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলছে। চাকরি না বাড়লে মানুষের পক্ষে মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়।
তৌফিকুল ইসলাম খান তথ্য ব্যবহারের ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য না থাকায় নীতিনির্ধারণ দুর্বল হচ্ছে। বিশেষ করে চালের মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের উৎপাদন তথ্য পেতে দেরি হওয়ায় সরকার সময়মতো প্রস্তুতি নিতে পারছে না।”
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে এবং তা কমার গতি খুবই ধীর।
তিনি উদাহরণস্বরূপ শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের কথা তুলে ধরেন, যেসব দেশ তুলনামূলক দ্রুত উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে বের হতে পেরেছে।
তিনি বলেন, “সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানোর কথা অনেক বলা হয়, কিন্তু বাজেটের সক্ষমতা, অর্থের উৎস এবং প্রকৃত উপকারভোগী ঠিকভাবে চিহ্নিত করা—এসব বড় চ্যালেঞ্জ।”
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, নির্বাচনের পরপরই রমজান শুরু হচ্ছে। তাই নতুন সরকারের জন্য দাম নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বিএনপি আগেই একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে, যেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “পণ্য বাজারে আসার পর মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারণে দাম বাড়ে। এ সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার ছাড়া বিকল্প নেই। শুধু আমদানি বাড়ালেই ভোক্তারা স্বস্তি পাবে না, যদি সিন্ডিকেট ভাঙা না যায়।”
ইউনিয়নভিত্তিক সংগ্রহ কেন্দ্র ও মানচিত্রভিত্তিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আংশিক বাস্তবায়ন হলেও এতে বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসতে পারে।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি সক্রিয় সিন্ডিকেট আছে। এসব সিন্ডিকেট কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনা থেকে শুরু করে রাজধানীর খুচরা দাম পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য ওএমএস ও টিসিবির ট্রাকে পণ্য বিক্রয়ের মতো বিদ্যমান “স্বয়ংক্রিয় স্থিতিশীল ব্যবস্থা” সঠিকভাবে ব্যবহার করে বাজার স্থিতিশীল করবে।
তিনি আরও বলেন, ফুড-ফ্রেন্ডলি প্রোগ্রাম, টেস্ট রিলিফ (টিআর), ভিজিএফ ও মৎস্য সহায়তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি এসব কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর বলেন, তাদের দল বাজারে বাফারিং কার্যক্রম চালু করবে, কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে আমদানি সমন্বয় করবে এবং কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করবে।
তিনি বলেন, পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি পুরো সামাজিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, “আইন থাকলেও বাস্তবায়ন ও বাজার নজরদারি দুর্বল। এনসিপি ক্ষমতায় গেলে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ও দাম নিয়ন্ত্রণে আইনি সমন্বয় ও তদারকি নিশ্চিত করবে।”
গণসংহতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান রুবেল বলেন, আগেভাগে তথ্য সংগ্রহ এবং বিকল্প উৎস চিহ্নিত করা আমদানিনির্ভর পণ্যের সংকট ও মূল্যস্ফীতি কমাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পেঁয়াজ ও এলপিজি সংকটের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সময়মতো পরিকল্পনা ও নজরদারি থাকলে এসব সংকট অনেকটাই কমানো যেত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নত করা দরকার। কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন বাড়ালে ফসল নষ্ট কমবে এবং উৎপাদন ও দাম স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে।
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, বর্তমান বাজার ব্যবস্থা শোষণমূলক পুঁজিবাদের দখলে চলে গেছে। এখানে চাহিদা–যোগানের স্বাভাবিক নিয়ম আর কাজ করছে না। ফলে মুক্তবাজার কার্যকর নয়। এই অবস্থায় সরকারের বিকল্প প্রস্তুতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নেই।
তিনি বলেন, ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত এবং তা শুধু ঢাকায় নয়, গ্রামাঞ্চলেও বিস্তৃত করা দরকার, যাতে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেতে পারে।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নভেম্বর মাসে করা জনমত জরিপের ফল তুলে ধরে সংস্থাটির ডেপুটি চিফ অব পার্টি আমিনুল এহসান বলেন, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন এবং কাকে ভোট দেবে তা ঠিক করেনি।
তিনি বলেন, এই বড় অংশের ভোটারকে আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে, বিশেষ করে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে, স্পষ্ট অবস্থান ও পরিকল্পনা দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “নারী ও তরুণদের মধ্যে এই অসন্তোষই সিদ্ধান্তহীন ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়ার বড় কারণ এবং এটি নির্বাচনী রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।”
অনুষ্ঠানে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আখতার মালা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার বারবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমালেও তার প্রভাব বাজারে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ৫ শতাংশ কর ছাড় দিলে তার মধ্যে ৪ শতাংশ ব্যবসায়ীরা রেখে দেন। মাত্র ১ শতাংশ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়।
ভোজ্যতেলের বাজারে ভ্যাট ও দামের অসামঞ্জস্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি এনবিআরের কাছে কম ভ্যালু অ্যাডিশন দেখিয়ে ভ্যাট কম দেয়, কিন্তু ট্যারিফ কমিশনের কাছে বেশি ভ্যালু অ্যাডিশন দেখিয়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) বাড়ায়।
তিনি বলেন, “এই চর্চা সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত দামের চাপ সৃষ্টি করে।”



