Originally posted in বণিকবার্তা on 3 February 2026
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ
প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো
আলোচনা
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য কোনো মিথ নয়, এটি এখন বাস্তবতা। গত সরকারের সময় জমি নেই, খরচ বেশি—এ ধরনের যুক্তি দিয়ে একে অবাস্তব প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। আজ এটি সফল প্রযুক্তি, বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে প্রমাণিত।
যত দিন ফসিল ফুয়েল খাত প্রাধান্য ধরে রাখবে এবং ফেজ আউট হবে না, তত দিন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারী তখনই আসবেন, যখন তাঁরা রিটার্নের নিশ্চয়তা দেখবেন। তাই ফসিল ফুয়েল থেকে জায়গা তৈরি না করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সব সময় চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে।
এখানে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ম্যাক্রো থেকে মেসো ও মাইক্রো পর্যায়ে আনতে হবে। নীতিনির্ভর আলোচনার বাইরে গিয়ে বাস্তবায়ন, অপারেশন ও লজিস্টিক দিকগুলোতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
আমাদের ইনস্টিটিউশনগুলো এখনো ফসিল ফুয়েলকেন্দ্রিক। এই কাঠামো দিয়ে এনার্জি ট্রানজিশন সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। বোর্ড, প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ—সব জায়গায় ফসিল ফুয়েলের প্রভাব আছে। বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়ার দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান সংযোগ দেয় না; কারণ, ফসিল প্ল্যান্ট থেকে তাদের আয় আসে। এটি একধরনের প্রতিরক্ষামূলক স্বার্থ।
কাগজে ভালো কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ইপিএসএমপির ভেতরে নীতিগত ভ্রান্তি রয়েছে। টেকনিক্যাল পর্যায়ে কর্মরত জনবলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ফলে আগ্রহও নেই। মানবসম্পদ পর্যায় থেকেও বাধা তৈরি হচ্ছে।
ফসিল ফুয়েলের জন্য একধরনের আর্থিক সুবিধা কাঠামো আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অন্যটি—এই বৈষম্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। ব্যাংকগুলো ক্যাপাসিটি পেমেন্টের নিশ্চয়তা না পেলে ঝুঁকি নিতে চায় না।
গত সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাত, বিদেশি কোম্পানি ও বিদেশি সরকারের মধ্যে একটি শক্ত নেক্সাস তৈরি হয়েছিল। এমনকি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। বিদেশি দেশগুলো পলিসি প্রণয়নে ঢুকে পড়েছে, যেখানে এলএনজি ও কয়লাকে ঘুরিয়ে নবায়নযোগ্য খাত বানানোর চেষ্টা দেখা গেছে। সমাধানের পথে আমাদের ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জিতে জোর দিতে হবে।
নবায়নযোগ্য খাতকে এগিয়ে নিতে জ্বালানি সাংবাদিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বদলে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি সাংবাদিক’ ও ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ’ প্রয়োজন।
সুপারিশ
- পুরোনো ও অকার্যকর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
- গ্রিড আধুনিকীকরণ/উন্নয়ন/স্মার্ট গ্রিড সিস্টেমের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন।
- নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কর বা আর্থিক নীতিমালা প্রত্যাহার।
- গৃহস্থালি, শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিতরণের জন্য বৈচিত্র্যময় আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
- গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জ্বালানি রূপান্তর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাংবাদিক ও গবেষকদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ জোরদার করা প্রয়োজন
- নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক কমাতে স্পষ্ট ও সুসংগঠিত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অংশগ্রহণকারী
- এম শামসুল আলম, ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা। অধ্যাপক ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
- ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
- শফিকুল আলম, লিড এনার্জি এনালিস্ট (বাংলাদেশ), আইইইএফএ
- মোস্তফা আল মাহমুদ, সভাপতি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)
- তানজিনা দিলশাদ, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন
- হাসিবুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)
- ফারাহ আনজুম, বাংলাদেশ লিড, গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস কাউন্সিল (জিএসসিসি)
- নেওয়াজুল মওলা, কো অর্ডিনেটর (এনার্জি গভর্নেন্স), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
- মো. মহিউদ্দিন, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো


