প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে, বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ছে কি? – ড. ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in প্রথম আলো on 12 October 2026

ব্যয় ও সময় বেড়ে যাওয়া যেন অবকাঠামো খাতের বড় প্রকল্পের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে | ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবকাঠামো বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, বন্দর ও নগর পরিবহনের সম্প্রসারণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করেছে এবং উৎপাদন, বাণিজ্য ও বাজারে প্রবেশ সহজ করেছে। বড় ও জটিল অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাংলাদেশ দেখিয়েছে। বাংলাদেশে আরও অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তবে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকারি বিনিয়োগ কতটা দক্ষতার সঙ্গে, যৌক্তিক ব্যয়ে ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর অবকাঠামোয় রূপান্তর করা যাচ্ছে।

সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ার কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থের চাহিদা অনেক, কিন্তু রাজস্ব আহরণ দুর্বল। একটি প্রকল্প দুর্বল প্রস্তুতি বা বিলম্বের কারণে যত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে, ততই অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যায়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনারও অংশ।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতার কিছু স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আর্থিক বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এই হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অবশ্য অর্থ ব্যয়ের হার দিয়ে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি বা কাজের মান পুরোপুরি বোঝা যায় না। তবে বাস্তবায়নের ধীরগতি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশে একটি বড় দুর্বলতা দেখা যায় প্রকল্প অনুমোদনের আগের পর্যায়ে। সম্ভাব্যতা যাচাই যথেষ্ট মানসম্পন্ন না হলে, নকশা অসম্পূর্ণ থাকলে, জমি অধিগ্রহণ শেষ না হলে কিংবা ইউটিলিটি স্থানান্তরের ব্যবস্থা না করেই প্রকল্প শুরু হলে বাস্তবায়নের সময় সমস্যা দেখা দেয়। তখন নকশা ও চুক্তি সংশোধন, সময় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।

আরেকটি সমস্যা হলো সীমিত সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি প্রকল্প নেওয়া। অনেক প্রকল্পের মধ্যে অর্থ ভাগ করে দিলে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ পায় না। ফলে বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হয় এবং অসমাপ্ত প্রকল্প ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

সব ব্যয় বৃদ্ধিকে অবশ্য দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল বলা যাবে না। টাকার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণেও প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে। এসব বাহ্যিক কারণকে দুর্বল নকশা, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয়প্রক্রিয়ার সমস্যা বা সমন্বয়ের অভাবজনিত ব্যয় বৃদ্ধির থেকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

প্রকল্প বাস্তবায়নে আরেকটি সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় পেশাগত দক্ষতা ও আন্তসংস্থা সমন্বয়ের ঘাটতি। বড় ও জটিল প্রকল্পে প্রকৌশলের পাশাপাশি সরকারি ক্রয়, অর্থ, চুক্তি, আইন, পরিবেশ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক সামলাতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতার ঘাটতি প্রকল্পের গতি ও মানকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর বা বিভিন্ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা থাকলে একটি সংস্থার বিলম্ব পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিতে পারে।

এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে একেবারে নতুন করে শুরু করতে হবে না। বেশ কিছু নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইতিমধ্যে রয়েছে। সরকারের পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট রিফর্ম স্ট্র্যাটেজি ২০২৫-২০৩০-এ সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ, প্রকল্প প্রস্তুতি ও তদারকির দুর্বলতা এবং প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনও সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির জন্য বিভিন্ন নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে।

সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাতেও সংস্কার হয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫-এর মাধ্যমে ই–জিপিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে স্বচ্ছতা ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ বেড়েছে। তাই মূল সমস্যা শুধু নিয়মের অভাব নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান নিয়ম ও নির্দেশিকা প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কতটা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর প্রকল্প অর্থায়ন এবং তার যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গেই সব ধরনের স্বল্প সুদের উন্নয়ন অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণের শর্ত মাথাপিছু আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ঋণের টেকসই অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

তবে বাংলাদেশের আয় ও অর্থায়নের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশকে ধীরে ধীরে কম রেয়াতি ও বাজারভিত্তিক অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে সুদের হার বেশি এবং ঋণ পরিশোধের শর্ত তুলনামূলক কঠিন হতে পারে। ফলে কোন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কাজগুলো অগ্রাধিকার পাবে?

প্রথমত, সঠিক প্রকল্প বাছাই এবং অনুমোদনের আগে পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই, বিস্তারিত নকশা, জমির প্রয়োজন, পরিবেশগত বিষয়, অর্থায়ন এবং ক্রয় পরিকল্পনা যথেষ্ট প্রস্তুত না হলে বড় প্রকল্প অনুমোদন করা উচিত নয়। শুধু প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় নয়, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নতুন প্রকল্পের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রকল্প শেষ করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমিত অর্থ অনেক প্রকল্পে ছড়িয়ে না দিয়ে উচ্চ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফলসম্পন্ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কম গুরুত্বপূর্ণ, দুর্বলভাবে প্রস্তুত বা দীর্ঘদিন অকার্যকর প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।

তৃতীয়ত, প্রকল্প ও চুক্তি ব্যবস্থাপনাকে আরও পেশাদার করতে হবে। বড় প্রকল্পে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাসম্পন্ন দল থাকতে হবে। প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ঘন ঘন পরিবর্তনও এড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঠিকাদার ও পরামর্শকদের আগের কাজের মান, সময়ানুবর্তিতা ও চুক্তি বাস্তবায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ কাজ দেওয়ার সময় তা বিবেচনা করা উচিত।

চতুর্থত, আন্তসংস্থা সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত করতে হবে। জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং বিভিন্ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোন সংস্থা কখন কী করবে, তা প্রকল্প শুরুর আগেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বড় প্রকল্পে সমন্বয় সমস্যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পঞ্চমত, ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বড় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ব্যয়, নির্ধারিত ও সংশোধিত সমাপ্তির সময় এবং বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। বড় ধরনের ব্যয় বা সময় বৃদ্ধি হলে তার কারণ মূল্যায়ন করতে হবে। যেখানে সমস্যা এড়ানো সম্ভব ছিল, সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রকল্প পরিচালনা ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে।

সবশেষে নতুন নিয়ম তৈরির চেয়ে বিদ্যমান নীতি ও নিয়মের কার্যকর প্রয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রকল্প মূল্যায়ন, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ক্রয় এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের অনেক ব্যবস্থা ইতিমধ্যে রয়েছে। এখন প্রয়োজন এগুলোর ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং প্রকল্পের ফলাফলের সঙ্গে জবাবদিহিকে যুক্ত করা।

বাংলাদেশে আরও অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে সামনে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা এবং ঋণ নেওয়া প্রতিটি ডলার থেকে আরও বেশি উন্নয়ন সুফল নিশ্চিত করা।

ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.