Tuesday, March 31, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Khondaker Golam Moazzem

ফ্যামিলি কার্ডে নয়ছয়ে কার লাভ? – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

Originally posted in সমকাল on 23 August 2022

সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে এক জটিল পরিস্থিতি পার করছে। এর মূল কারণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে ফারাক তৈরি হওয়ায় সংকট বাড়ছে। বিভিন্ন পণ্যে ভর্তুকির কথা বলে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে কৃষি, পরিবহন ও উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত খাতে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই বাজারে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকার শুধু পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদিও সেই নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর অন্যান্য পণ্যের দাম কী হারে বাড়বে, সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কোনো আলোচনা হয় না। ফলে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি আগেও হয়েছে। এবারও ভোক্তারা বিক্রেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকছে। ব্যবসায়ীরা যুক্তি দিচ্ছে, বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে দাম বাড়াতে হচ্ছে। তাদের যুক্তির সঙ্গে বাস্তবতার অনেক ফারাক। যেমন ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়ার অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচকাজে বাড়তি খরচ হবে, এটা সত্য। কিন্তু এর প্রভাব পড়ার কথা আগামী মৌসুমের পর। বর্তমানে চালের বাজারে শুধু পরিবহন খাতের প্রভাব পড়ার কথা। এতে সামান্য দাম বাড়ার কথা থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪ থেকে ১৫ টাকা। একইভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে ব্রয়লার মুরগি, ডিম, মাছসহ সব ধরনের সবজি ও মুদি পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই দুর্যোগকালে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। এ অবস্থায় এক কোটি মানুষের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সম্ভব হলে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে এই ফ্যামিলি কার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ ফ্যামিলি কার্ড পাচ্ছে না। বিপরীতে সামর্থ্যবান অনেকে, যাদের এই কার্ডের জন্য অযোগ্য বলা যেতে পারে, তারা কার্ড পেয়েছে। রাজনৈতিক সংশ্নিষ্টতা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে।

ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে জড়িত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো দরকার। সরকার পর্যালোচনা করে দেখতে পারে, কত সংখ্যক যোগ্য পরিবার এই কার্ডের বাইরে থেকে গেছে। একই সঙ্গে অযোগ্য কত সংখ্যক পরিবার এর আওতায় চলে এসেছে। তারপর অযোগ্যদের বাদ দিয়ে যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে। কার্ডধারীরা যাতে চাহিদামতো পণ্য পায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এর আগে আমরা দেখেছি, বারবার দিন-তারিখ নির্ধারণ করেও পণ্য সরবরাহ করতে পারেনি টিসিবি। কোথায় সংকট তা শনাক্ত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে। আর ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে।

বৈশ্বিক কারণে এই মুহূর্তে সরকারের আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সেই টানাপোড়েন দরিদ্র মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। দরকার হলে সরকারের অন্যান্য খাত থেকে অর্থ সাশ্রয় করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের পরিসর আরও বাড়াতে হবে। তেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজের পাশাপাশি আরও বেশি সংখ্যক পণ্য ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। কারণ এই মুহূর্তে বাজারে সব পণ্যের দামই এসব মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গেছে। মাসে একবার না দিয়ে এটা প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ কার্ডধারী সবাইকে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যয় সংকোচনের কথা বললেও তার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের ব্যয় সাশ্রয় নীতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার। অর্থনৈতিক অপচয় কোনোভাবে যাতে না হয়, তা তদারক করতে হবে। তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে।

পাশাপাশি সাধারণ বাজারেও সরকার সব পণ্যের দাম বেঁধে দিতে পারে। সেই দামের তালিকা সংবাদমাধ্যমে বারবার প্রচার করে ভোক্তাদের সচেতন করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশনসহ প্রশাসনকে বাজার তদারকিতে আবারও নামতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে অভিযানের পর ভোক্তারা সীমিত আকারেই সুফল পাবে। আর বড় পরিসরে সুফল আনতে হলে জ্বালানি তেলের দাম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া জরুরি। বিশেষত বৈশ্বিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমছে, তখন অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের বাড়তি দাম নির্ধারণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রসঙ্গত, গত সাত বছরে (২০১৫-২০২১) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা লাভ করেছে। এই তথ্য খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বিপিসি। বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়? বিপিসি যেহেতু সব সময় জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করেছে; তাহলে এখন ভর্তুকি তুলে নেওয়া হলো কোন যুক্তিতে?

আমরা সিপিডির গবেষণায় দেখিয়েছি, কীভাবে বছরের পর বছর লাভ করার পরও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে বিপিসি। অথচ সুসময়ের বাড়তি আয় দিয়েই বর্তমান দুঃসময় সামাল দেওয়া যেত। বিপিসি থেকে সরকার বছরে যে ৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়, সেটা সাময়িক ছাড় দিলেই জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্য সমন্বয় হয়ে যেত। একদিকে সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে; অন্যদিকে সঞ্চয় বাড়াচ্ছে বিপিসি- এই চিত্র একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থায় কল্পনা করা যায় না।

আগেই বলেছি, সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ তো বটেই; মধ্যম আয়ের মানুষকেও জীবন ধারণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত ফ্যামিলি কার্ডেও যদি দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়; এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে! একদিকে জ্বালানি তেলের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে নয়ছয়- এ চিত্র যেন বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদকেই সার্থক করে তুলছে; গোদের ওপর বিষফোড়া। এতে কারা লাভবান হচ্ছে? সরকার একবার ভেবে দেখুক।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.