Wednesday, February 4, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবর্তনে নীতিগত ধীরগতির মাশুল গুনছে বাংলাদেশ – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in বাংলা ট্রিবিউন on 3 February 2026

বিশ্বের মাত্র ১১ বাজারে যাচ্ছে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ পোশাক

গার্মেন্টস কারখানার কর্মরত শ্রমিকরা (ফাইল ফটো)

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত ক্রমেই কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারনির্ভর হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ ক্যালেন্ডার ইয়ার ২০২৫ সালের রফতানি পরিসংখ্যান বলছে—মাত্র ১১টি দেশেই বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পোশাক রফতানি কেন্দ্রীভূত। এই ১১ দেশে বছরে বিলিয়ন ডলারের বেশি পোশাক রফতানি হয়েছে, যা একদিকে বড় সাফল্য হলেও অপরদিকে রফতানি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১১টি দেশেই রফতানি হয়েছে ৩১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির ৭৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের পোশাক রফতানির প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই নির্ভর করছে এই সীমিত কয়েকটি বাজারের ওপর।

রফতানি যেসব দেশে বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

২০২৫ সালে যেসব দেশে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, সেগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, পোল্যান্ড, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক (বিলিয়ন ডলারের প্রায় কাছাকাছি)।

সবচেয়ে বেশি রফতানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে এক বছরে বাংলাদেশের পোশাক গেছে ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে জার্মানি (৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার), যুক্তরাজ্য (৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার) এবং স্পেন (৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার)। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসে ২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার, ফ্রান্সে ২ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, ইতালিতে ১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, পোল্যান্ডে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, জাপানে ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার, কানাডায় ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার এবং ডেনমার্কে ৯৮৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় বিলিয়ন) পোশাক রফতানি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেই নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি

এই ১১ দেশের মধ্যে ১০টিই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বা ট্র্যাডিশনাল বাজার। কেবল জাপানকে নন-ট্র্যাডিশনাল বাজার হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ নতুন বাজার হিসেবে যেসব দেশে রফতানি বাড়ানোর কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনও খুব সীমিত। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্র একাই বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ দখল করে রেখেছে। জার্মানি ও যুক্তরাজ্য মিলে আরও প্রায় ২৩ শতাংশ। ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা মিলিয়ে মোট রফতানির বড় অংশ আটকে আছে।

ইইউতে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক

দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশের মোট পোশাক রফতানি আয়ের প্রায় ৪৯ শতাংশ আসে এই অঞ্চলে, কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫) রফতানি ৪.১৪ শতাংশ কমে ৯.৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ৯.৮৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ঘাটতি নির্দেশ করছে।

রফতানি কমেছে নিটওয়্যার ও ওভেন পণ্যের

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, নিটওয়্যার পণ্যের রফতানি ৫.৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৫.৭৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ওভেন পণ্যের রফতানিও ১.৮৭ শতাংশ কমে ৩.৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রফতানিকারক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ দেশের অর্থনীতির জন্য ইইউ বাজার অপরিহার্য।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কনীতির কারণে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান দ্রুত শক্ত করছে। আমাদের বাজারের তারা অধিকাংশ অংশ দখল করছে, যার ফলে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলো বাড়তি প্রণোদনা দিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আগের মতো নীতিগত সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজন।”

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান মন্তব্য করেন, “ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে বাণিজ্য স্থানান্তর ঘটেছে, বাংলাদেশ তা থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা নিতে পারেনি। ভিয়েতনাম, ভারত ও কিছু আফ্রিকান দেশ যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ ধীরগতির নীতিগত সিদ্ধান্ত, সীমিত বাজার বৈচিত্র্য এবং তৈরি পোশাক খাতের অতি নির্ভরতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশকে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়ন এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে কূটনীতি জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসার ব্যয় কমানো ও নতুন বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় গতি আনা প্রয়োজন।”

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আগাম চালানের প্রভাব, বছরের শেষভাগে গতি মন্থর

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মার্কিন বাণিজ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি পোশাক খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রফতানিকারকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে আগাম চালানের কারণে। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত পারস্পরিক শুল্ক কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন ক্রেতারা বছরের শুরুতেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পণ্য আমদানি করেন। এতে জানুয়ারি থেকে মধ্যবর্ষ পর্যন্ত রফতানি পরিসংখ্যান তুলনামূলক উঁচু দেখাচ্ছে।

এই প্রবৃদ্ধি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক বাজার প্রায় স্থবির ছিল। অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ কমে ৬৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের ইউনিট দাম শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে। তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির প্রতিফলন হিসেবেই এটিকে দেখা হচ্ছে।

রফতানিকারকদের ভাষ্য, বছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকলেও আগস্টের পর থেকে রফতানির গতি কমতে শুরু করে। উচ্চ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে চালান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

বৃদ্ধি কোথায়, কমলো কোথায়

২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কিছু বাজারে রফতানি বেড়েছে, আবার কিছু দেশে কমেছে। নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বেড়েছে। অপরদিকে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও ডেনমার্কে কমেছে। বিশেষ করে ডেনমার্কে রফতানি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে, যা ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা ও দামের চাপের ইঙ্গিত দেয়।

নিট ও ওভেন দুই পণ্যেরই আধিপত্য

এই ১১ দেশে বাংলাদেশের নিট ও ওভেন—উভয় ধরনের পোশাকেরই বড় বাজার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ওভেন পোশাকের আধিপত্য বেশি হলেও ইউরোপের অনেক দেশে নিট পোশাকের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। তবে সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দুই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রেই এই কয়েকটি দেশই বাংলাদেশের প্রধান ভরসা।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা: ঝুঁকি বাড়ছে

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত অল্প কয়েকটি বাজারে অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কোনও একটি বাজারে মন্দা, শুল্ক বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এলে পুরো খাতেই বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিলিয়ন ডলারের বাজার থাকা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রায় ৮০ শতাংশ রফতানি যদি মাত্র ১১টি দেশে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়। এখনই নতুন ও নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারে কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, জাপান ছাড়া আর কোনও নন-ট্র্যাডিশনাল বাজার বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারেনি, যা রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা নির্দেশ করে। ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সামনে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ

বিশ্ববাজারে মূল্যচাপ, ক্রেতাদের টেকসই উৎপাদন চাহিদা, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাত একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে। এই বাস্তবতায় বাজার বহুমুখীকরণ ছাড়া টেকসই রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।