Tuesday, March 10, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কর ও ভিসা বন্ড: মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in প্রথম আলো on 8 January 2026

ভিসা, প্রবাসী আয় ও ভ্রমণে কড়াকড়ি যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠাতে নগদ লেনদেনে প্রতি ১০০ ডলারে অতিরিক্ত ১ ডলার কর চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে কার্যকরের ঘোষণা আগেই ছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ ৩৮ দেশের নাগরিকদের অবশ্যই ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত দেওয়ার ঘোষণা এল।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে তিনটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাও বন্ডের শর্তে যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের রেমিট্যান্স, ভিসা ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ বাংলাদেশের জন্য নতুন করে চাপ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, রেমিট্যান্সে অতিরিক্ত কর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এর ফলে অনানুষ্ঠানিক পথে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উৎসাহিত করতে পারে। আর ‘ভিসা বন্ড’ হিসেবে জামানত বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের লোগোছবি: রয়টার্স

তবে সাবেক এবং বর্তমান কূটনীতিকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপগুলোকে ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তা আকস্মিক নয়। কারণ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় তিনি বিভিন্ন দেশের লোকজনের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কমানোসহ অভিবাসনের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার কথা বারবার বলেছেন। ফলে এগুলোকে তাঁর পূর্বঘোষিত নীতির বাস্তবায়নের আলোকেই দেখা সমীচীন।

আর ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনীতিক সূত্রগুলোও বিশ্লেষকদের এমন ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন যে এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে, এর ইঙ্গিত সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশকে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নানাভাবে অতিরিক্ত সময় সেখানে থেকে যাওয়া এবং অনিয়মিত হওয়ার বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসন ভালোভাবে দেখছে না। এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দেশটি অনানুষ্ঠানিকভাবে নানা আলোচনায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশকে দিয়েছে।

আবার ভিসা বন্ডের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক তালিকা ‘ইমিগ্রান্ট ওয়েলফেয়ার রেসিপিয়েন্ট রেটস বাই কান্ট্রি অব অরিজিনের’ কথাও বলা হচ্ছে। ৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের মধ্যে কোন দেশের নাগরিকেরা বেশি সরকারি সহায়তা (ওয়েলফেয়ার) নিচ্ছেন, তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এই তালিকা তুলে দিয়েছেন তিনি। ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের ওই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম স্থানে। তাতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকে।

ভিসা বন্ডের তালিকায় বাংলাদেশ

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে গত মঙ্গলবার জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে ৩৮ দেশের নাগরিকদের অবশ্যই ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড বা জামানত দিতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২২.৩১ টাকা হিসাবে)।

শুরুতে গত বছরের আগস্টে ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশের তালিকায় ছয়টি দেশের নাম যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে তারা আরও সাতটি দেশের নাম এই তালিকায় তোলে। এরপর মঙ্গলবার বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশের নাম যোগ করল যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর জন্য (কয়েকটি ছাড়া) এ বন্ডের শর্ত ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

এই তালিকার মোট ৩৮ দেশের মধ্যে বেশির ভাগই আফ্রিকার। তবে লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশও রয়েছে। নতুন নিয়মের ফলে দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য এখন মার্কিন ভিসা পাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে; যা দেশটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে আরোপিত কড়াকড়ি আরও জোরালো করতে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ পদক্ষেপ।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মার্কিন ভিসা আবেদনকারী সবাইকে সশরীর সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হবে।

কোলাজ | প্রথম আলো

মার্কিন কর্মকর্তারা ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত এ ভিসা বন্ড বা জামানতের বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকেরা যাতে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময় অবস্থান না করেন, সেটি নিশ্চিত করতে এ পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তবে এ জামানত জমা দিলেই যে ভিসা পাওয়া নিশ্চিত হবে, তা নয়। যদি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় বা ভিসা পাওয়া ব্যক্তি ভিসার সব শর্ত মেনে চলেন, তবে ওই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

নতুন যেসব দেশের ওপর এ ভিসা বন্ডের শর্ত কার্যকর হচ্ছে, সেগুলো হলো বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, বেনিন, বুরুন্ডি, কেপভার্দে, কিউবা, জিবুতি, ডোমিনিকা, ফিজি, গ্যাবন, আইভরি কোস্ট, কিরগিজস্তান, নেপাল, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, তাজিকিস্তান, টোগো, টোঙ্গা, টুভালু, উগান্ডা, ভানুয়াতু, ভেনেজুয়েলা ও জিম্বাবুয়ে।

এর আগে ওই তালিকায় থাকা দেশগুলো হলো ভুটান, বতসোয়ানা, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, গাম্বিয়া, গিনি, গিনি-বিসাউ, মালাউই, মৌরিতানিয়া, নামিবিয়া, সাও তোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে, তানজানিয়া, তুর্কমেনিস্তান ও জাম্বিয়া।

পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের ওয়েবসাইটে আরও জানিয়েছে, এসব দেশের ইস্যু করা পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে ইচ্ছুক কেউ যদি বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন, তবে তাঁকে অবশ্যই ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১৫ হাজার ডলারের বন্ড জমা দিতে হবে। পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বন্ডের এ অর্থের পরিমাণ ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করা হবে। আবেদনকারীকে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ‘আই-৩৫২’ ফরমও জমা দিতে হবে। এ ছাড়া আবেদনকারীদের মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘Pay.gov’-এর মাধ্যমে বন্ডের শর্তাবলিতে সম্মত হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিমালা কঠোর করতে গত বছরের আগস্টে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (ইউএসসিআইএস) হালনাগাদ করা হয়।

নির্দিষ্ট তিন বিমানবন্দর

ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়, ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও বহির্গমন করতে হবে। তা না হলে তাঁদের প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে অথবা তাঁদের দেশত্যাগের তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ না হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। নির্ধারিত প্রবেশপথগুলোর মধ্যে রয়েছে বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (বিওএস), জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জেএফকে) ও ওয়াশিংটন ডুলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (আইএডি)।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিমালা কঠোর করতে গত বছরের আগস্টে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (ইউএসসিআইএস) হালনাগাদ করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভিবাসনের আবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাই-বাছাইয়ের নিয়ম ট্রাম্প প্রশাসন জুন (২০২৪) মাসে চালু করে। এটি আরও বিস্তৃত করে ‘আমেরিকাবিরোধী কার্যকলাপের’ অনুসন্ধানের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবীর গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিসা বন্ড অবশ্যই আমাদের জন্য সুখবর নয়। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কমিয়ে আনা বা নিরুৎসাহিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন অনেকগুলো উদ্যোগ নিয়েছে, এটা তার অন্যতম। ফলে রেমিট্যান্সের ওপর নতুন করে করারোপ আর ভিসা বন্ড বাংলাদেশে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক পরিসরের ভ্রমণে প্রভাব ফেলবে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের ১২ মাসের এ পরীক্ষামূলক কর্মসূচি শুরু হয়েছে গত ২০ আগস্ট। সরকারি বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে আগস্টে পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে, অনেক বিদেশি নাগরিক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলেও তাঁদের প্রস্থানের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এতে প্রমাণিত হয় যে প্রতিবছর হাজার হাজার নন-ইমিগ্রান্ট দর্শনার্থী ভিসার শর্ত মেনে নির্ধারিত সময়ে দেশ ছাড়েন না।

কংগ্রেসে দেওয়া এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ জানায়, ২০২৩ অর্থবছরে ভিসাধারীদের প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখের প্রস্থান করার কথা ছিল; কিন্তু ওই বছর প্রায় ৪ লাখ মানুষ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গেছেন।

ভিসা বন্ডের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো হয়তো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো জনগণের স্তরে একটা ধাক্কা তৈরি করল।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রেমিট্যান্স পাঠাতে নগদ লেনদেনে অতিরিক্ত কর অনানুষ্ঠানিক পথে প্রবাসী আয় পাঠানোকে উৎসাহিত করার প্রবণতা বাড়াতে পারে। এটা রেমিট্যান্সের ওপর সরাসরি ধাক্কা। আর ভিসা বন্ড বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্র যাওয়াকে শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, কঠিন করে তুলবে। তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্স পাঠাতে কর ও ভিসা বন্ড—দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি।’

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.