Originally posted in বাংলাদেশ প্রতিদিন on 5 November 2026
ঝুঁকিতে দেশের অর্থনীতি
শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন, নাশকতা ও ষড়যন্ত্রে তীব্র অস্থিরতার মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এবং ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের এ খাতটি ঘিরে অনিশ্চয়তায় ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। যদিও শ্রমিক মজুরি বোর্ড গঠন করে দ্রুত সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পোশাক খাতে অস্থিরতার কারণে আসন্ন ক্রিসমাস ও শীত ঘিরে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় বিক্রয় মৌসুমে পিছিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশ। হারাতে পারে নির্ভরযোগ্যতার ভাবমূর্তি। পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতঃপূর্বে সম্ভাবনাময় চামড়া ও চা-শিল্প ধ্বংস হয়েছে ষড়যন্ত্রের কারণে। তাই পোশাক খাতসহ অর্থনীতিকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো থেকে বিরত রাখতে হবে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পাঁচ দিন ধরে ঢাকার মিরপুর, আশুলিয়া; গাজীপুরের কালিয়াকৈর; নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিক্ষোভ করে আসছেন পোশাকশ্রমিকরা। চলছে হামলা-ভাঙচুর।
বিজিএমইএর তথ্য বলছে, ১ নভেম্বর শ্রম অসন্তোষে বন্ধ ছিল ২৫৮টি কারখানা। ওই দিন কাজ না করে ফিরে আসেন ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক। ২ নভেম্বর বন্ধ কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭৯টিতে। পরদিন তা কমে আসে ৩০৬টিতে। বর্তমানে কাজে না আসা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। পোশাক ব্যবসায়ীদের হিসাবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উৎপাদন ব্যাহত হলে এবং সঠিক সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে বৈশ্বিক ক্রেতারা তাঁদের ক্রয়াদেশ ভারত, ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোয় স্থানান্তর করবেন। এ অস্থিরতা চলতে থাকলে তা পোশাক খাতের পাশাপাশি ব্যাংক, বিমা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও পরিবহনের মতো সম্পর্কিত অন্যান্য ব্যবসাবাণিজ্যকেও ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আগে পাট, চামড়া বা চা খাতের নানাবিধ পতনের পর তৈরি পোশাকশিল্পের কোনো শক্তিশালী বিকল্প খাত এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধস নামার পাশাপাশি লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক দোষারোপ ও ক্ষতিকারক উসকানি থেকে শিল্পকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের তৈরি পোশাকশিল্প অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি ব্যাংক, পরিবহনসহ অর্থনীতির অন্যান্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতও প্রত্যক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে তৈরি পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বিপুল কর্মসংস্থানের ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক; যা আমাদের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।’
ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘কেবল দরকষাকষি বা দামাদামির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় মজুরি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান ও মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কারখানার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি-এ সবকিছু বিবেচনা করেই মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। পোশাকশিল্পে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে দেশের জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। এখানে যেকোনো ধরনের বাধা এলে আমাদের দেশি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অর্জিত দীর্ঘদিনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুনাম এতে মারাত্মক ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’ শিল্পকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়ে ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘সবাইকে একসঙ্গে বসে তৈরি পোশাকশিল্প তথা পুরো অর্থনীতিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার পথ বের করতে হবে। দেশ ও উৎপাদন খাতকে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের চলমান সংকট সমাধানের নির্দিষ্ট কোনো ফর্মুলা কারও কাছে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে প্রচলিত আইন ও নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং ধারাবাহিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, যা এক দিনে বা হুট করে ঘোষণা করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। এ খাত যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ও বহুমাত্রিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।’ বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) উপদেষ্টা মোহাম্মদ মফিজ উল্লাহ বাবলু বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্দোলনের কারণে পোশাকের চাহিদা কমছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের রপ্তানি বাজারে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির মূলভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্পকে রক্ষায় সাময়িক পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দূরদর্শী ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘অতীতের সোনালি আঁশ পাট, চা কিংবা চামড়া খাতের মতো তৈরি পোশাকশিল্পকেও যদি আগুন বা ষড়যন্ত্র দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যাবে। মালিক ও শ্রমিকদের দক্ষতা ও নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই মূল ইন্ডাস্ট্রি শেষ হওয়া মানে পুরো দেশের অর্থনীতিকেই ধসিয়ে দেওয়া।’
বন্ধ কারখানা খুলে দিন শ্রমিকরা কাজে ফিরুন
আজ বৃহস্পতিবার থেকে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে যেসব কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, সেগুলো খুলে দিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে মালিকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল সচিবালয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমইএর প্রতিনিধি এবং শ্রমিকনেতারা উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিকদের আন্দোলনে নিহত ব্যক্তির পরিবারের পাশে সরকার দাঁড়িয়েছে জানিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এবং মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আপাতত ১ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পরিবারটিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। তিনি বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জন্য গাজীপুরের টঙ্গীতে ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন বলেও জানান শ্রমমন্ত্রী। সরকার সাড়া না দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবেদন বা আলোচনা ছাড়াই রাস্তায় নেমে আসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে মালিকদের উদ্দেশে শ্রমমন্ত্রী বলেন, সরকার সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। যেসব মালিক কারখানা বন্ধ রেখেছেন, তাঁদেরও কারখানা খুলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, শ্রম অসন্তোষের পেছনে শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। যারা দেশের শিল্পকারখানা ধ্বংস করতে চায় এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চায়, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মজুরি বোর্ড গঠনের অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর রবিবার দুপুর ১২টার আগেই নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। একই দিন সন্ধ্যায় এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপরও নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
এ সময় পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত নতুন মজুরি বোর্ড ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি ঘোষণা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডের ওপর সরকারের পূর্ণাঙ্গ আস্থা রয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করবেন। সেখানে অবশ্যই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা হবে, শিল্পের স্বার্থ রক্ষা হবে, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে। উপদেষ্টা বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে এবং গার্মেন্টস খাতের স্বার্থ রক্ষা করতে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই খাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ঐতিহাসিকভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে এ খাতের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকারও পোশাকশিল্পের উন্নয়ন ও শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করতে চায়।


