করদাতার ওপর চাপ না বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়াতে হবে: ফাহমিদা খাতুন

বাড়ছে পরিচালন ব্যয়

Originally posted in কালবেলা on 24 September 2026

কঠিন সমীকরণের মধ্যে অর্থনীতি

বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা ও করোনার ধাক্কায় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাবু দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। সেই ধাক্কা নতুন করে কাটিয়ে ওঠার আশা দেখছিল সবাই। তবে একদিকে ৮ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অন্যান্য উপকরণের ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসার উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর। এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করেছে সরকার। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এ বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে রাজস্ব আদায়ের ওপর তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এরই মধ্যে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একদিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আকাশচুম্বী, অন্যদিকে আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এক কঠিন চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এ অবস্থায় সরকারের সর্বস্তরে ব্যয় সংকোচন করার কোনো বিকল্প নেই।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের ব্যয়ের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে আয় বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজস্ব আদায়ে এখন ঘাটতি রয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও কাটছে না। এমন পরিস্থিতিতে সামনে আরও কঠিন সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অর্থনীতি এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এ পরিস্থিতি সামনে আরও কত সময় দীর্ঘায়িত হবে। সেটাই এখন ভাববার বিষয়। সে অনুযায়ীই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈশ্বিক কারণগুলো শিগগির যে ঠিক হয়ে যাবে, তা বলা যাচ্ছে না। সুতরাং আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোয় বেশি জোর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারের সর্বস্তরের ব্যয়ে আরও সংকোচন দরকার। বাধ্য হয়ে ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে যে চাপ তৈরি হবে, সেটা মোকাবিলার জন্যও কৌশল থাকতে হবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি অনেকটা ছোঁয়াচে বিষয়। তাই এর ফলে যাতে মূল্যস্ফীতি বেশি না বাড়ে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এই মুখ্য অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, “অর্থনীতিতে আমাদের বেশ কয়েকটি ‘বিষফোড়া’ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম মূল্যস্ফীতি। সুতরাং এটাকেই আমাদের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিও অন্যতম কারণ। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, এলএনজির যে মূল্যস্ফীতি, সেটা যাতে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে না ছড়ায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় জোর দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি তো নেই। কারণ এত রাজস্ব তো আদায় হচ্ছে না। তাই যে বরাদ্দ আছে, সেটা যাতে যথাযথভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেখানে কাজ করা অনেক সুযোগ রয়েছে।”

জ্বালানি তেলে এক লাফে ২০ টাকা বৃদ্ধি’

২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বাজারে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিন—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপিসির লোকসান কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

তবে অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের প্রভাব শুধু পাম্পের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিজেল-নির্ভর পরিবহন, কৃষির সেচ, শিল্পের উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও জেনারেটরের ব্যয়—সবখানেই এর প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্য বলছে, বোরো ধানের মোট উৎপাদন ব্যয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সেচ ব্যয় হতে পারে এবং দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সেচ পাম্প ডিজেলচালিত। অর্থাৎ ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব কৃষিপণ্য ও খাদ্যবাজারেও পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগেও বেড়েছে জ্বালানি ব্যয়

চলতি বছর এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল সরকার। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দামও বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এপ্রিলে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগে সরকার যে এলএনজি জি-টু-জি চুক্তিতে প্রায় ১০ ডলারে কিনত, স্পট মার্কেটে তা প্রায় ২০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। একই সময়ে অপরিশোধিত তেলের দামও আগের ৫০ থেকে ৬০ ডলারের জায়গায় ১১৬ ডলারে উঠে যাওয়ার কথা তিনি জানান। অর্থাৎ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে সরকারের আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।

বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে জুন থেকে ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের গড় খুচরা দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং সঞ্চালন পর্যায়ে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। বিদ্যুতের এ মূল্য সমন্বয় শিল্প, ব্যবসা ও পরিবারের ওপর আলাদা করে ব্যয়ের চাপ তৈরি করে। শিল্পে বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে; ব্যবসায় সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর পরিবারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল সরাসরি মাসিক ব্যয়ের অংশ বাড়ায়।

এর মধ্যেই বেতন বৃদ্ধি

এ পরিস্থিতির মধ্যেই ৩১ আগস্ট সরকার নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে। নতুন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের জন্য বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৫০ শতাংশ কার্যকর হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশে উন্নীত হবে। ২০২৭ সালের জুলাই থেকে নতুন মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ভাতার পূর্ণ সুবিধা ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। পুরো নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বেতন-ভাতা ও পেনশনসহ সরকারের বার্ষিক ব্যয়ের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।

রাজস্ব ঘাটতি ও খরচের অসামঞ্জস্য

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করেছিল। ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রা যখন এত বেশি করা হচ্ছে, তখন রাজস্ব আদায়ের সাম্প্রতিক প্রবণতা খুব শক্তিশালী নয়। এনবিআরের কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রাথমিক হিসাবে জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় কমেছে। আগস্টেও ভ্যাট আদায় কমেছে। আমদানি কমে যাওয়ায় আমদানি পর্যায়ের রাজস্বেও চাপ তৈরি হয়েছে। গত দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কখনো ২৭ শতাংশের বেশি হয়নি। সেই তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। অর্থমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায় বেড়েছিল ১৪ শতাংশ, কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছিল।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেই বর্তমান অর্থনৈতিক সমীকরণের জটিলতা। সরকারকে এখন একদিকে বেতন-ভাতা ও পেনশনের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে, অন্যদিকে জ্বালানি খাতে লোকসান ও ভর্তুকির চাপ সামলাতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের অর্থও জোগাতে হবে।

মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে

সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ আগস্টের হিসাবে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এটি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, আগস্টে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় সামান্য কম ছিল। এতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাড়তি চাপে সাধারণ মানুষ

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন পে-স্কেলের কারণে সরকারি খাতের কর্মচারীদের একটি অংশের সাময়িক স্বস্তি মিললেও, দেশের মোট শ্রমশক্তির সিংহভাগই বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক/অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। সরকারি বেতন বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট চাহিদা এবং জ্বালানি-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির যৌথ চাপে বাজারে যে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হবে, তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রথম ধাক্কা লেগেছে গণপরিবহনে। এরপর পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব পড়ছে কৃষিপণ্য, মাছ-মাংস, সবজি, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন ও ব্যবসার খরচ বেড়েছে। এর বিপরীতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠীর আয় বাড়বে। তাদের ভোগব্যয় বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থনীতিতে এই অতিরিক্ত চাহিদা কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যদি একই সময়ে পণ্য ও সেবার দামও বাড়ে, তাহলে নামমাত্র বেতন বৃদ্ধির পুরোটা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় রূপান্তরিত নাও হতে পারে। অর্থাৎ বেতন বাড়ার সুফল এবং জ্বালানি-বিদ্যুতের দাম বাড়ার চাপ—দুটিই একই সময়ে অর্থনীতিতে কাজ করবে।

শিল্প ও বিনিয়োগে বাড়তি চাপের আশঙ্কা জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় উদ্বেগ হলো উৎপাদন ব্যয়। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের মধ্যেই ১৫ শতাংশের বেশি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, পরিবহন ও মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে থাকা তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম কতদিন উচ্চ থাকবে। দ্বিতীয়ত, সরকার জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তৃতীয়ত, এনবিআর বাস্তবে কতটা রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে। চতুর্থত, বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বাড়তি ব্যয় কীভাবে অর্থায়ন করা হয়। আর পঞ্চমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রা ও রাজস্বনীতির সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়। বিশেষ করে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম কালবেলাকে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল সর্বস্তরে ব্যয় সংকোচন করা। সরকারি ব্যয় কমিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় করা যেত, তা জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো জরুরি খাতে সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত ছিল। সংকট মোকাবিলায় এটাই হতে পারত একটি কার্যকর ও জনবান্ধব পথ। কিন্তু সরকার নিজস্ব ব্যয় কমানোর পরিবর্তে জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এটি সাশ্রয়ী নীতিরও সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই অর্থনীতি বিশ্লেষক আরও বলেন, এর ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের চাপ আরও তীব্র হচ্ছে। বর্তমান সংকটের সময় সরকারের উচিত ছিল জনগণের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর পরিবর্তে নিজের ব্যয় কমানো এবং সাশ্রয় করা অর্থ দিয়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় খাতে সহায়তা নিশ্চিত করা, তা না করে ভোক্তার ওপর একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপানো সাধারণ মানুষের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরকারের ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে, তবে এর সঙ্গে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সামঞ্জস্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, কিন্তু কর প্রশাসনের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করের আওতার বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি কর প্রদান সহজ করা এবং রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে সরকারের আয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের চাপও তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা সম্ভব হবে।’ ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে দেশে কিছু সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। তবে অর্থনীতি দুর্বল এবং মানুষ উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপে থাকায় একবারে দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। সরকার জ্বালানি আমদানির কর সাময়িকভাবে কমিয়ে, অপচয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখতে পারত।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.