Originally posted in সমকাল on 3 February 2026

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন গণভোটের বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা উপেক্ষা করে তা অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে গণভোটে সরকার, সরকারের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গণভোটে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে। একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ ভোটের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেওয়া এবং ‘না’ ভোট প্রদানকারীদের পতিত সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করা– আইনগতভাবে সরকারের নিরপেক্ষতা ধরে রাখার বাধ্যবাধকতার পরিপন্থি। এ ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান সম্পর্কিত অধ্যাদেশের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করতে দেখা গেছে। যদিও সব মন্ত্রণালয় এটা মেনে চলছে না।
প্রসঙ্গত, গণভোটে মাত্র একটি উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে চারটি প্রশ্ন নয়, বরং ১২২টি প্রশ্নের ব্যাপারে অবস্থান জানাবে। বিশ্বব্যাপী গণভোটের প্রচলিত কাঠামোতে এ ধরনের প্রশ্ন ও উত্তর দেখা যায় না। আরও স্পষ্ট করে বললে, এ ধরনের গণভোটে প্রাপ্ত রায় থেকে ‘জনআকাঙ্ক্ষা’র প্রকৃত প্রতিফলন হয় না।
এ গণভোটের আয়োজন, অনুষ্ঠান এবং তাতে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে করণীয় বিষয়ে নির্ধারিত হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের দুটো অধ্যাদেশ ও আদেশের আলোকে– ক. জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫; এবং খ. জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫। মনে রাখা দরকার, এই উভয় আদেশ এবং অধ্যাদেশ আগামী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তবে সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারা অনুসারে সাংবিধানিক কোনো ধারা পরিবর্তন সম্পর্কিত কোনো বিল পাসের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রেও দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন পড়বে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে মৌলিক ত্রুটি রয়েছে। এ আদেশের কতিপয় অনুচ্ছেদ সংবিধান পরিপন্থি। প্রথমত, এ আদেশের ১০(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত সিদ্ধান্ত’ সংবিধানে বর্ণিত ১৪২ নম্বর ধারা অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত বিল পাসের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের যে সমর্থন প্রয়োজন, এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুতরাং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আগে জাতীয় সংসদে এ ধরনের সংশোধনপূর্বক জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে। দ্বিতীয়ত, আদেশের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সাংবিধানিক সংস্কারকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা এবং উক্তরূপ সংস্কার বিষয়ে অন্য কোনভাবে অনুমোদন বা সম্মতির প্রয়োজন হইবে না’– যা বলা আছে তা অসাংবিধানিক। পরিষদ গৃহীত সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে– যেহেতু এ সংস্কার সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত। সুতরাং ১৪ নম্বর ধারার প্রয়োজনীয় সংশোধন করে তা সংসদে অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে প্রথম অধিবেশনে।
জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ পরিচালনা করবেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সম্মতিতে নির্বাচিত একজন ‘সভাপ্রধান’ এবং ‘উপসভাপ্রধান’। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এ পরিষদের আওতাভুক্ত হওয়ার কথা নয়, যা কেবল মূল জাতীয় সংসদের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে পূর্ণ বেঞ্চে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে হওয়া উচিত। এমনকি ‘সভাপ্রধান’ হিসেবে স্পিকারকে বা ‘উপসভাপ্রধান’ হিসেবে ডেপুটি স্পিকারকে নির্বাচিত করে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও মূল সংসদের অধিবেশনে সংবিধান সম্পর্কিত বিল উত্থাপন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সংবিধান সংস্কার আদেশের কার্যাবলিও বিলুপ্তি অনুচ্ছেদে (অনুচ্ছেদ ৭) বলা হয়েছে, ‘পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করিবে এবং তাহা সম্পন্ন করিবার পর পরিষদের কার্যক্রম সম্পন্ন হইবে’। সংসদীয় রেওয়াজ অনুসারে এভাবে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া যায় না। সংবিধান অনুসারে যে কোনো বিল সংসদে উত্থাপনের পর আলাপ-আলোচনার পর, প্রয়োজনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতামতের ভিত্তিতে আলোচনার পর সংসদে উত্থাপিত হয় অনুমোদনের জন্য। এ প্রক্রিয়ায় একটি বিল আইনে রূপান্তরিত হতেই অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে সংবিধান সংস্কার আদেশ এবং গণভোটের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বিপুলসংখ্যক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন পড়বে, যা সময়সাপেক্ষ। গণভোটের প্রশ্নে যে ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলা হচ্ছে, তার একটি বিষয়েও সকলে ঐকমত্য হয়নি। মাত্র চারটি বিষয়ে প্রায় সকলের ঐকমত্য রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংবলিত অনেক প্রশ্ন রয়েছে; বিশেষত বিএনপির। এমনকি গণভোটে সন্নিবেশিত ‘পিআর’ পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সুতরাং ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ৭ (১) (গ) বাদ দেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, দলগুলো রাজনৈতিক ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকার অনুযায়ী নির্বাচন-পরবর্তীকালে তাদের সংসদ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জুলাই সনদের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার শুরুতে সময় অতিবাহিত হবে কার্যপ্রণালি নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে। অনুচ্ছেদ ৭(৩) অনুসারে কার্যপ্রণালি নির্ধারণের দায়িত্ব সংস্কার পরিষদের। তবে সংবিধান সংস্কার আদেশের সংশোধন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যপ্রণালি বিধি নির্ধারণ এবং এসব বিষয়ে আইন, বিচার, ও সংসদীয় কার্যক্রমবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা করা সময়সাপেক্ষ বিষয়। সুতরাং ১৮০ দিনের সময় বেঁধে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ অসাংবিধানিক, দুর্বল এবং চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।
সংবিধান সংস্কার আদেশের অনুচ্ছেদ ৯ অনুসারে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ তপশিল-২ অনুযায়ী পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন– এ মর্মে বলা হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধানে উল্লেখ নেই– এমন কোনো প্রশাসনিক কাঠামোতে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার (যা অনির্বাচিত) ঘোষিত সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সংসদ সদস্যদের শপথ নেবার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ৯ নম্বর অনুচ্ছেদের সংশোধন করে আইনটি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাসের পরই কেবল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর আগে পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলে তা অসাংবিধানিক হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একটি নতুন প্রেক্ষাপটে গঠিত হতে যাচ্ছে। এ সংসদের প্রারম্ভিক দায়িত্বের মধ্যে সংবিধান সংস্কার অন্যতম। একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে তা টেকসই হতো। এ সংসদ কতটুকু প্রতিনিধিত্বশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। উপরন্তু যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কারের প্রচেষ্টা নেওয়া হচ্ছে, তা দুর্বল, ত্রুটিপূর্ণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে অসাংবিধানিক। তড়িঘড়ি করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার জন্য শুভ নয়।
মনে রাখা দরকার, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে যে প্রক্রিয়ায় আলোচনায় এনেছে, নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে তেমন সুযোগ না থাকারই কথা। উপরন্তু নতুন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ও বিরোধী দল নির্বাচন-পরবর্তী যে রাজনৈতিক পরিবেশে থাকবে, সে প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার (এমনকি ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলেও) জটিল ও কঠিন হবে। সুতরাং সংবিধান সংস্কার বিষয়ে কোনো সময় নির্দিষ্ট না করে প্রয়োজনীয় আদেশ ও অধ্যাদেশ পরিমার্জন করে, তাড়াহুড়ো না করে, সাংবিধানিক সাংঘর্ষিক ধারা এড়িয়ে সংস্কারের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। এ জন্য আগামী পুরো সংসদকাল বা তার চেয়েও বেশি সময়ের প্রয়োজন হলেও তার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আগামী সংসদের সদস্যদের নির্বাচন হওয়া, শপথ নেওয়া এবং প্রথম অধিবেশনে তাদের অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকাল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সিপিডি


