Tuesday, February 17, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

নির্বাচন ছিল প্রয়োজনীয় শর্ত, বিনিয়োগ বাড়াতে চাই সুশাসন ও সংস্কার: মোস্তাফিজুর রহমান

নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

Originally posted in শেয়ারবিজ on 17 February 202

ব্যাংক ঋণে সুদ কমিয়ে নতুন বিনিয়োগ আনা

ব্যাংক ঋণে সুদহার কমানোর পাশাপাশি দেশে নতুন বিনিয়োগ আনা নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা যেমন জরুরি তেমনি বিনিয়োগ আনতে হলে সরকারের নীতি সুদহার কমানো ও রাজস্ব খাতের অযৌক্তিক কর পরিহার করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতি চাঙ্গা করতে নতুন রাজনৈতিক সরকারকে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্তেই সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে রেকর্ড খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর আস্থার মতো জটিল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ঋণ কীভাবে আদায় হবে, সেটি এখন একটা বড় প্রশ্ন। কারণ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের যারা ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় করা যাচ্ছে না।

ব্যাংক ঋণকে নিরুৎসাহিত করতে বাড়ানো হয় সুদের হার। আর যখন ব্যাংক ঋণের সুদহার উচ্চ রাখা হয়, সেটির অর্থ দাঁড়ায় সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ চাচ্ছেন না। সরকারের এমন নীতির কারণে গত দেড় বছরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি।

অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আিইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি। এমনকি বিনিয়োগ সম্মেলন করেও সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়াগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি, যার ফলে অর্থনীতিতে গতি আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বেসরকারি খাতে সেভাবে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন সরকার দেশের অর্থনীতি চাঙা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগ ভূমি। আমরা তৈরি পোশাক নিয়ে কাজ করি। নির্বাচিত সরকার বাণিজ্য বাড়াবেন বলে প্রত্যাশা করি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, ব্যাংক ঋণের সুদহার দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। ঋণের এই অতিরিক্ত সুদ হার নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির হার এখন ৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। আগামী জুন নাগাদ সাড়ে ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন করা কঠিন হবে বলেই মনে হচ্ছে।

তাসকীন আহমেদ বলেন, একই সঙ্গে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি খাতের ঋণের এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে গেলে তা বেসরকারি খাতের ঋণগ্রহণ আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, রপ্তানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবকিছু নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে বলে আমরা আশা করছি।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, সংস্কার ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে যে প্রথম দিন থেকেই বিনিয়োগ বাড়বে, তা নয়। তবে এর ফলে একটি পজিটিভ সিগন্যাল বা ইতিবাচক বার্তা যাবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গন থেকে অনিশ্চয়তা কেটেছে বলে মনে করেন ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তবে অর্থনীতিতে পূর্ণ গতি ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করাকে ‘অপরিহার্য’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনিশ্চয়তা কেটেছে এবং এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এটি ছিল একটি নেসেসারি ফ্যাক্টর (প্রয়োজনীয় শর্ত)। কারণ বেসরকারি খাত অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন বিনিয়োগ কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়নি। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার ও বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাথমিক বাধা কাটলেও একে বিনিয়োগে রূপান্তর করতে হলে ‘সাফিসিয়েন্ট ফ্যাক্টর’ বা পর্যাপ্ত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।

সিপিডির এই ফেলো বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সুশাসন নিশ্চিত করায় মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সঠিক ফিসক্যাল পলিসি (রাজস্ব নীতি), ইজ অব ডুইং বিজনেস (সহজ ব্যবসা পরিবেশ) নিশ্চিত করা, কস্ট অব ডুইং বিজনেস (ব্যবসায়িক ব্যয়) কমানো, ইকোনমিক সেক্টরে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এসব পদক্ষেপ নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়বে।

বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসব সংস্কার ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে যে প্রথম দিন থেকেই বিনিয়োগ বাড়বে, তা নয়। তবে এর ফলে একটি পজিটিভ সিগন্যাল বা ইতিবাচক বার্তা যাবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থানের অবস্থা খারাপ। আবার ব্যাংকের সুদহারও বেশি। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ।

এতদিন ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট থাকাতে অনেক ধরনের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কাজ স্থবির ছিল। আজ মঙ্গলবার মন্ত্রিসভা গঠন হবে। নতুন দায়িত্বও পাবেন তারা। তখন আমাদের যে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাগুলো ছিল, এগুলো গতিশীলতা পাবে। যারা হয়তো অবজারভার হিসেবে সাইড লাইনে বিভিন্ন জায়গাতে ছিল তারা হয়তো পার্টিসিপেট করবে এবং ওভার-অল ধরেন একটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হয়তো আমরা যে একটা স্থবিরতা ছিল সেটি থেকে আমরা ভালোর দিকে যাব।

পরবর্তী সরকারের সামনে থাকা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসা সম্প্রসারিত না হলে কর্মসংস্থান হবে না। আর কর্মসংস্থান ছাড়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল থেকে যাবে। এটি অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, পরবর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসা ও শিল্পকারখানার কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করা। কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি মূলত প্রাণবন্ত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিল্প ভিত্তি এখনও তুলনামূলকভাবে ছোট এবং দেশটি রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। আমাদের নিজস্ব শিল্প শক্তি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে হবে।