Originally posted in কালেরকন্ঠ on 14 October 2026
সংকটে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হচ্ছে
তিতাস গ্যাসের চুরি বন্ধ করতে পারেনি সরকার। জ্বালানি নিরাপত্তার অভাবে দেশের অনেক শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে সবুজ প্রবৃদ্ধি (গ্রিন গ্রোথ) অর্জন ও জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে অর্থায়ন কাঠামোর উন্নয়ন, কার্যকর প্রণোদনা এবং সরকারের শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এক নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংলাপে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় না নিলেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ নির্ভরতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে এবং ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে নীতি প্রণয়নের কাঠামো থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য করছাড়, ভর্তুকি, আমদানি শুল্কে ছাড় এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির মতো কার্যকর প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু শিল্প মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক উদ্যোগ দিয়ে এ পরিবর্তন সম্ভব নয়। বরং পুরো অর্থনীতিতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সমন্বিত শিল্পনীতি প্রয়োজন।
সবুজ রূপান্তরের অর্থায়ন প্রসঙ্গে সেলিম রায়হান বলেন, বৈশ্বিক অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হলেও জলবায়ু মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে। অর্থায়ন কাঠামো এমনভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে শুধু বড় ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান নয়, নতুন উদ্যোক্তারাও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুযোগ পান।
তিনি আরো বলেন, সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ুশক্তি ও পানির ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিও বিবেচনায় নিতে হবে। জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন থাকতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিতে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন খাতে আরো বেশি অর্থায়ন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রশমনে এবং ৩৫ শতাংশ অভিযোজনে বরাদ্দ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির বিকল্প উৎস বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্য, প্রাপ্যতা ও সম্প্রসারণের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা বাড়লেও জমির স্বল্পতা এ খাতের সম্প্রসারণে বড় চ্যালেঞ্জ। নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত দুই দশকেও চামড়াশিল্পের জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ লক্ষ্যে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) জন্য সহজলভ্য সবুজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, রুফটপ সোলার স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এ খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (ক্যাপেক্স) মডেলে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে প্রায় ছয় থেকে আট কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। তাই স্থাপন ব্যয়ের পাশাপাশি অর্থায়ন ও পরিচালনগত চ্যালেঞ্জেরও সমাধান করতে হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিপিআরসি) পরিচালক (উদ্ভাবন) ড. হাসান মাহমুদ জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেন। নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, রুফটপ সোলার ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় কমানো সম্ভব। তবে বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, করসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা ও নীতির দুর্বল বাস্তবায়ন এ ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারে বাধা হয়ে আছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের প্রকল্প অর্থনীতিবিদ মেহেরুন্নেসা আই চৌধুরী সবুজ প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমের (সিবিএএম) মতো আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন শর্ত পূরণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সংলাপে সৌর প্যানেল ও ইনভারটারের মান, নেট মিটারিং ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা, সৌরসেচ এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, তখন জলবায়ু অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, জনসচেতনতা বাড়ানো, কারিগরি সহায়তা সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংক্রান্ত নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধি অর্জন ও টেকসই জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করা সম্ভব।


