Tuesday, February 17, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে চাই দক্ষ, সৎ ও চাপমুক্ত নেতৃত্ব – ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in কালবেলা on 16 February 2026

জনআস্থা গড়ে তুলতে দরকার দক্ষ নেতৃত্ব

বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে দুই দশক পর আবারও সরকারে ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাদের সামনে অপেক্ষা করছে একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একদিকে কয়েক মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে বিনিয়োগে স্থবিরতা। তার ওপর সরকার গঠনের পরপরই বাজেট প্রণয়নের সময় ঘনিয়ে আসা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষিত পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের শুরুটাই হতে যাচ্ছে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের ভারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব চ্যালেঞ্জ নতুন নয়; তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলো মোকাবিলার ধরনই হবে সরকারের সক্ষমতার মূল পরীক্ষা। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, প্রভাবমুক্ত ও দৃঢ় নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। টেকসই অর্থনীতির জন্য দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও জোর দেন তারা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে থাকা বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা। তাদের মতে, বিনিয়োগ পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে অর্থনীতির গতি ফেরানো কঠিন হবে। দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

একই সঙ্গে পে-স্কেল বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ সিদ্ধান্ত সময়োচিত ছিল না। নতুন সরকার গঠনের পরপরই বাজেট প্রণয়নের সময় চলে আসায় এ আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে সরকার কীভাবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বা সমন্বয় করে, সেটিই হবে একটি বড় পরীক্ষার বিষয়।

মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত নভেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। তবে রিজার্ভ বাড়া এবং ডলারের দর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা এখনই দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা গেলে এ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

অর্থনীতিতে সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতি দমনের বিষয়টি। দুর্নীতির প্রশ্নে নতুন সরকার কতটা কঠোর ও প্রভাবমুক্ত অবস্থান নিতে পারে, সেদিকেই জনদৃষ্টি থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া নতুন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। দেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে, তবে কোনো কাজই সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, নতুন সরকারের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান কাজ হবে বিনিয়োগ খাতের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা এবং এ খাতকে গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বিনিয়োগ পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে অর্থনীতির গতি ফেরানো কঠিন হবে। দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

পে-স্কেল ঘোষণার সিদ্ধান্তটিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে তিনি কালবেলাকে বলেন, পে-স্কেলের ব্যাপারটা আসলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঠিক করেনি। এটা তাদের ঘোষণা করা উচিত হয়নি। এটি নতুন সরকারের ওপর একটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে সরকার গঠনের পরপরই যখন বাজেট প্রণয়নের সময় চলে আসছে। সরকার কীভাবে এটি সামাল দেয়, তা দেখার বিষয়।

এই অর্থনীতিবিদের মতে, নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি হয়তো খুব বেশি চাপ সৃষ্টি করবে না। বর্তমানে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও ডলারের দর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা কম। নতুন সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে পারে, তবে মূল্যস্ফীতি খুব বেশি বাড়বে না। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা না গেলে এ স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না।

দুর্নীতি দমনের প্রতি বিশেষভাবে জোর দিয়ে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ। অতীতের দুর্নীতির স্মৃতি এখনো মানুষের মনে থাকায়, দুর্নীতির প্রশ্নে নতুন সরকার কতটা কঠোর ও প্রভাবমুক্ত অবস্থান নিতে পারে, সেদিকেই জনদৃষ্টি থাকবে। তাই নতুন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারে, সেদিকেই সাধারণ মানুষ তাকিয়ে থাকবে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সমস্যার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক ও দক্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন। তিনি কালবেলাকে বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো আমাদের অজানা নয়, আবার এগুলোর সমাধানও অজানা নয়। এ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় সঠিক, দক্ষ, সৎ ও প্রভাবমুক্ত নেতৃত্ব নিয়োগ করাই হওয়া উচিত নতুন সরকারের প্রথম কাজ।

তিনি বলেন, অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বিনিয়োগ ও শিল্প উন্নয়নে যুক্ত সংস্থাগুলোতে (যেমন বিডা ও বেজা) এমন নেতৃত্ব দিতে হবে, যারা সমস্যাগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারবেন এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যুরোক্রেটিক চাপের বাইরে থেকে সমাধান দিতে সক্ষম হবেন। রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত এমপিদের মধ্য থেকে যারা অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় মানসিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারবেন এবং ব্যুরোক্রেসিকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন, তাদের দিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে সাজানো উচিত। শুধু মন্ত্রী নয়—সংস্থার চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী ও সচিব পর্যায়েও একই ধরনের দক্ষ ও প্রভাবমুক্ত মানসিকতার মানুষ নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাজানোই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

তার মতে, সরকারের প্রথম ছয় মাসই হবে একটি বড় ‘টেস্ট কেস’, এই সময়েই বোঝা যাবে নতুন নেতৃত্ব বাস্তবে কাজগুলো কতটা বুঝতে পারছে এবং সিদ্ধান্ত নিতে কতটা সক্ষম।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, নতুন সরকারের সামনে বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, পে-স্কেল ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়া, দারিদ্র্য বিমোচন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, সবকিছুর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। নতুন সরকার গঠনের পর প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যেও এটি অন্যতম। দেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে, তবে কোনো কাজই সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে না।