Originally posted in খবরের কাগজ on 19 March 2026

আমাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। প্রান্তিক আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন ধরনের পরিষেবার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আমরা কতটা সাশ্রয়ীভাবে সুযোগ করে দিতে পারি, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যতের সুযোগগুলো আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও মানোন্নয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে।…
বর্তমান মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং সেক্টরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন। যারা স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হিসেবে গণ্য হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। আমাদের দেশের বহিস্থ খাত একটা ঝুঁকির মধ্যে আছে। একই সঙ্গে আমাদের বহিস্থ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং রাজস্ব আয়ের অনেক বড় একটি অংশ ঋণের পরিষেবায় চলে যাচ্ছে। সেদিকটায় আমাদের নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে আমরা যারা বৈদেশিক ঋণ থেকে বিনিয়োগ করছি সে ক্ষেত্রে যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে, সেদিকেও আমাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে তা যেন সাশ্রয়ীভাবে করা সম্ভব হয়। তাহলে বিনিয়োগ থেকে আমরা যে আয় আশা করছি সেটা আমরা পাব। আমাদের যে অবকাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিগত সময়ে অর্থনীতির ওপরে যে চাপগুলো ছিল, সেগুলো এখনো আছে। অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার নতুন করে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির যে চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো নিয়েই নতুন সরকারকে কার্যক্রম শুরু করতে হয়েছে। বর্তমান সময়ে আমাদের প্রথম যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তা হলো মূল্যস্ফীতি। এটা নিম্নআয়ের মানুষকে বড় ধরনের একটা চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে। তাদের সামনে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে বৈদেশিক রিজার্ভের নিম্নগতি, রাজস্ব জিডিপির নিম্নহার ইত্যাদি চাপ রয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা টাকার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্নমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কাজেই বর্তমান সরকারকে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেই অগ্রসর হতে হবে। সেখানে আমাদের মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসনের সঙ্গে সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয়ের দিকে আমাদের নজরদারি বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণে অবদান রাখতে হবে এবং ক্রমিত হয়ে গেলে সেটার মালিকানা গ্রহণ করতে হবে এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করতে হবে। এত বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা, বিভিন্ন ধরনের রেগুলেটরি, আইনি সমস্যা- এগুলো দু-এক বছরে আমদের সমাধান করা সম্ভব নয়। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে যথেষ্ট সময় লাগবে। প্রশাসনিক সংস্কার, আইনি সংস্কার কিংবা নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার হয়তো আমরা করতে পারব। সুশাসন অর্থাৎ আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চয় উন্নয়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারেও আমাদের সমন্বয় রক্ষা করা জরুরি। এখানে আমরা অনেক ধরনের দুর্বলতা দেখেছি। বিশেষ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা দেখা যায়। এসব বিষয়ে আমাদের সবসময় নজর দিতে হবে। অনেক সময় দেখেছি, অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করেও সমাধান পাওয়া যায় না। এবার আমাদের সময় এসেছে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা দক্ষভাবে বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়ার। অর্থনৈতিক উত্তরণের আমাদের একটা দক্ষ টিমওয়ার্ক থাকা দরকার।
মধ্যমমেয়াদে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য সামনে আমাদের বড় যে ফসলের মৌসুম আছে, সেটার উৎপাদন নির্বিঘ্ন করতে সার, বীজ, বিদ্যুৎ এগুলোর সরবরাহ নিশ্চিতে নজর দিতে হবে। সরবরাহ চেইনের মধ্যে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, তা দূর করতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কীভাবে আমরা সহজ করতে পারি, সেদিকে নজর দিতে হবে। ২ টাকার ফুলকপি ঢাকা শহরে এসে যেন ২০ টাকা না হয়, এগুলোর দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা এখন তো অনেক ভালো। সেটাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যের বড় ধরনের বিভাজন দূর করতে হবে। আর এটা করতে হলে প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ- এসব বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। ব্যক্তি খাতে যারা সামনে আসবেন তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে।
দুটি বিষয়ের প্রতি আমাদের বিশেষ মনোযোগ রাখতে হবে। আমরা জানি যে, রাজস্ব আয়ের একটা বড় অংশ আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া বিনিময় হারের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে অর্থাৎ অবনমন নীতির ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে সেটাই বলা হয়েছে। একটি হলো যেকোনো প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় সেদিকটা আমলে নেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব দায়ভার ও পরিষেবাদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সেটাও কিন্তু আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। কাজেই বেশ কিছু জায়গায় আমাদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সাবধানতা দরকার।
আমরা অনেক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করেছি। যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বৈদেশিক বিনিয়োগ আমাদের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে উন্নত করবে। একই সঙ্গে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমাদের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জ যেগুলো আছে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা বৃদ্ধি করা, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সেবা দানের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে আমরা যেন রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারি, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের ডিজিটালাইজেশনের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।দক্ষতা বৃদ্ধি করে আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক বাজারে আমরা যেন রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারি, সেদিকটা আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। দেশের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিশ্ব বাজারে ঢোকার একটা ব্যবস্থা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গেলে আমাদের প্রযুক্তি ও শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। সেগুলো মোকাবিলা করার ঝুঁকিও নতুন সরকারের সামনে আসছে। আমরা যেন ঘাটতির জায়গাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা অনুসরণ করতে পারি, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। আমাদের নিজস্ব আর্থসামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপরে আস্থা রাখতে হবে।
আমাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। প্রান্তিক আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন ধরনের পরিষেবার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আমরা কতটা সাশ্রয়ীভাবে সুযোগ করে দিতে পারি, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যতের সুযোগগুলো আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও মানোন্নয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


