Saturday, April 11, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

ঋণ বিতরণে কড়াকড়ি যাচাই ও রিজার্ভ সুরক্ষার ওপর জোর দিতে হবে – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড on 8 April 2026

চলতি মূলধন হিসেবে ৮ শতাংশ সুদে অফশোর ডলার ঋণ পাবেন রপ্তানিকারকরা

ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস

অর্থায়ন ব্যয় কমানো এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে রপ্তানিকারকদের জন্য কম সুদে অফশোর ডলার ঋণ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রস্তাবিত এই স্কিমের আওতায়, রপ্তানিকারকরা ৮ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন, যা বর্তমানে স্থানীয় মুদ্রা বা ‘টাকায়’ নেওয়া ঋণের ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ সুদের তুলনায় অনেক কম। শিগগিরই এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করে কার্যক্রমের কাঠামো জানানো হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রপ্তানিকারকরা দৈনন্দিন ব্যবসায়িক খরচ—যেমন বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য কার্যকর মূলধনের চাহিদা—মেটাতে এই ঋণ ব্যবহার করতে পারবেন। ঋণ পরিশোধ করতে হবে রপ্তানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে, ফলে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে।

এছাড়া ঋণগ্রহীতা রপ্তানিকারক প্রয়োজনে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে ঋণের ডলার সোয়াপ করে টাকা নিতে পারবেন। এজন্য তাকে বাড়তি সুদ গুণতে হবে না।

নীতিনির্ধারকদের মতে, এ ধরনের সুবিধা রপ্তানিকারকদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের রপ্তানি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, “উদাহরণস্বরূপ; একজন রপ্তানিকারকের কাছে ১০০ ডলার রপ্তানি অর্ডার থাকলে—তিনি যদি কাঁচামাল আমদানির জন্য ৬০ ডলারের এলসি খুলে থাকেন, তাহলে অফশোর ব্যাংকিং থেকে তিনি সর্বোচ্চ ৪০ ডলার ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের এই অর্থ তিনি ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ব্যয় করতে পারবেন। ঋণগ্রহীতা ডলারে কিংবা সোয়াপ করে টাকা নিলেও ঋণ পরিশোধ হবে তার রপ্তানি প্রসিড থেকে বৈদেশিক মুদ্রায়।”

ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে এই ঋণ বিতরণ করতে পারবে। ঋণের মেয়াদ হবে তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত। এই বাইরে ব্যাংকগুলোকে ঋণের সীমা বা অন্য কোন শর্তারোপ করা হবে না, ফলে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

”বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এই ধরণের ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে, তবে তা লোকাল কারেন্সি বা ‘টাকায়’ নিতে হয় এবং এর সুদহার ১৪ শতাংশ বা তার বেশি। ৮ শতাংশ সুদে অফশোর ব্যাংকিং থেকে ঋণ নেওয়ার সুবিধা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো, রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের সহযোগিতা করা”- জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেবে, যাতে তারা ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে অফশোর ব্যাংকিং থেকে রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্পমেয়াদে ঋণ দিতে পারে।

এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ওপর কোনো অতিরিক্ত ঋণসীমা বা শর্ত আরোপ করা হবে না। গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যাবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্তের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ)-এর আকার ৭ বিলিয়ন থেকে কমিয়ে ২.২ বিলিয়ন ডলার করেছে। ফলে রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পসুদে বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ নেওয়ার বিদ্যমান সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

টিবিএসের সাথে আলাপকালে, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানিকারকরা চাপের মধ্যে আছেন। নতুন এই সুবিধা তাদের তারল্য বাড়াবে, অর্থায়ন ব্যয় কমাবে এবং বিনিয়োগে উৎসাহ দেবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। রপ্তানি আয় দেশে না এলে ঋণ আদায় কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি, বিনিময় হার ওঠানামার কারণে টাকার অবমূল্যায়ন হলে ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশের রপ্তানি আয় যখন ধারাবাহিকভাবে কমছে, তখন রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রপ্তানিকারকদের সহায়তার জন্য এ ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই ঋণের সুদহার ৮ শতাংশের কম হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

”বর্তমানে বিল ট্রান্সফরমেশন ফান্ড ও টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে ডলারে ঋণ নিলে সুদহার যেখানে ৫ শতাংশ সেখানে অফশোর ব্যাংকিং থেকে ঋণের সুদহার ৬ বা ৭ শতাংশ হওয়া যৌক্তিক”- জানান তিনি।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে বলেন, অফশোর ব্যাংকিং থেকে রপ্তানিকারকদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (চলতি মূলধন) ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে, রপ্তানিকারকরা স্বাভাবিকভাবেই সুবিধা পাবে। এখন ব্যবসায়ীরা যেহেতু সংকটের মধ্যে রয়েছে, তাই ইডিএফ থেকে ঋণ সুবিধা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সুবিধা চালু করছে।

”অফশোর ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা চালু হলে রপ্তানিকারকরা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার জন্য ঋণ না নিয়ে এখান থেকে কম সুদে ঋণ নেবে। তবে এক্ষেত্রে বড় রিস্ক হলো, রপ্তানি আদেশের বিপরীতে রপ্তানি হতে হবে এবং রপ্তানির মূল্য বা আয় দেশে ফেরত আসতে হবে”- যোগ করেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও উপযুক্ত ঋণগ্রহীতা বাছাইয়ে কঠোর যাচাই প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। আমদানিতে মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হলে ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। যদিও এই সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধও করতে হবে। তাই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সুরক্ষা দিতে হবে এবং তা যেন কোনভাবেই নষ্ট না হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।”

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন টিবিএসকে বলেন, অফশোর ব্যাংকিং থেকে ঋণ বিতরণের যে বিধি-নিষেধ ছিল, তা তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখি। ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ ও কারেন্সি সোয়াপ করার সুবিধা দিলে–সেটিও যৌক্তিক।

”তবে এক্সচেঞ্জ রেট পরিবর্তন হয়ে টাকার বড় দরপতন হলে, ঋণ পরিশোধে ঋণগ্রহীতাদের টাকার অংকে বেশি পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে যে বাড়তি দায় সৃষ্টি হবে, তা ঋণগ্রহীতাদেরই নিতে হবে। এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে, তারা যেন তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে প্রণোদনা বা সহায়তা না চান, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে”- যোগ করেন তিনি।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.