Originally posted in দৈনিক ইনকিলাব on 8 November 2026
পরিকল্পনা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ব্যর্থতায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, আগামীর অর্থনীতিতে অশনিসঙ্কেত
এডিপি বাস্তবায়নের হার নিয়ে চিন্তিত সরকার
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নিয়ে চিন্তিত সরকার। চলতি অর্থবছরের ইতোমধ্যে ৪ মাস অতিবাহিত হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত প্রকল্প পাস করলেও যাচাই-বাছাই, পরিকল্পনা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ও দীর্ঘসূত্রতায় উন্নয়ন কর্মকান্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষ করে নতুন ও চলমান প্রকল্পগুলোর উপযোগিতা ও আর্থিক লাভ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে দরপত্র আহ্বান ও অর্থ ছাড়ে নজিরবিহীন বিলম্ব ঘটছে। এমনকি সরকারি ছোট-বড় অবকাঠামো (যেমন-রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যালয় বা হাসপাতাল নির্মাণ) প্রকল্পগুলো থমকে থাকায় নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন ও শ্রমিকের চাহিদা তলানিতে নেমেছে। ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বা টাকার স্বাভাবিক হাতবদল ব্যাহত হচ্ছে, যা গ্রামীণ ও স্থানীয় অর্থনীতিকে চরম মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশে, যা বাংলাদেশের এডিপি বাস্তবায়নের ইতিহাসে সর্বনিম্ন গতি। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই শতাংশের হিসাবে তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নে এত কম ব্যয় হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে প্রকল্প দ্রুত পাসের তাগিদ বা নির্দেশনা থাকলেও মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ধীরগতি ও তদারকির অভাবে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নিয়োগ, অর্থছাড়, খরচের প্রশাসনিক অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজে দীর্ঘসূত্রতা বর্তমান সরকারের উন্নয়ন স্পৃহাকেও চেপে ধরেছে। এটি তিন লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকার উন্নয়ন লক্ষ্যের সময়াবদ্ধ দৌড়ে শুধু পিছুই টানছে। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং ঢালাওভাবে প্রকল্প যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের পেছনে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কোনো নতুন উন্নয়নকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। আর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানে গুরুতর প্রভাব পড়ছে। অবশ্য অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি দেশের দীর্ঘদিনের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে স্বস্তিতে রাখার ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। বরং মন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণ ও অসুস্থতা, অপরদিকে প্রতিমন্ত্রীর সঠিক তদারকির অভাব-সমন্বয়ে চরম ব্যর্থতা সামগ্রিকভাবে সরকারের ভিতকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সংকটের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত কর্মযজ্ঞ শুরু না হওয়ায় আগামী দিনে সরকার ও অর্থনীতির জন্য অশনিসঙ্কেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি শুধু অবকাঠামো নির্মাণকেই পিছিয়ে দেয় না, একই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে চাহিদা বৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পানিসম্পদ খাতের প্রকল্পে বিলম্ব হলে তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়ে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এডিপির আকার বাড়ালেই হবে না, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। আইএমইডি’র সর্বশেষ প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বরাদ্দ বাড়লেও সেই অর্থ সময়মতো ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা-দুই নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যদিও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে এবং চলমান প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গত শুক্রবার ছুটির দিনে বিশেষ পর্যালোচনা সভা করেছেন। তিনি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং অনুমোদিত মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করার কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো যৌক্তিক কারণে সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তা সঠিক নিয়মে করার তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে, যাতে জনমুখী বাজেট মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।
আইএমইডি’র তথ্য মতে, সবচেয়ে কম ব্যয় হয়েছে স্বাস্থ্য সেবায়। স্বৈরাচার হাসিনা ভারতে পলায়ন এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে। দেশের প্রধান প্রধান ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অর্থবছরের শুরুর মাসগুলোতে প্রায় শূন্য বা নামমাত্র অগ্রগতি দেখিয়েছে। সেতু বিভাগ, পররাষ্ট্র ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো প্রথম তিন মাসে এক টাকাও খরচ করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এমনিতেই সংকুচিত, তার ওপর সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা বড় বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, যা সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্পের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে কিছুটা সময় লাগে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্পে প্রশাসনিক বা অর্থছাড়-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সরকারিআদেশ দেখুন
আইএমইডি’র তথ্য বলছে, ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ১৭টি সংস্থা তাদের বরাদ্দের ১ শতাংশের কম অর্থ ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি সংস্থার কোনো ব্যয়ই হয়নি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে ১ হাজার ১৭২টি উন্নয়ন প্রকল্পে তিন লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৮৬টি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২৩টি, কারিগরি সহায়তা ১০৯টি, উন্নয়ন সহায়তা থোক ৯টি এবং নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫টি প্রকল্প রয়েছে।
অথচ স্থানীয় সরকার বিভাগ যদি ১০০ কোটি টাকার একটি ৩ বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করে তাতে গ্রামীণ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এই ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ (যেমন- রাস্তাঘাট, কালভার্ট, বাজার অবকাঠামো নির্মাণ বা ড্রেনেজ সিস্টেম) সাধারণত শ্রমঘন হওয়ায় এলাকার মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস তৈরি করে। ৩ বছরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ওই সব সরাসরি এলাকার শ্রমিক, মিস্ত্রি, প্রকৌশলী, তদারককারী হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। অপরদিকে পরোক্ষ কর্মসংস্থান হিসেবে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ এবং আনুষঙ্গিক খাতের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসা চাঙ্গার সুযোগ হয়, পরিবহন খাত, খাবারের জন্য হোটেল-রোস্তারাঁ ও আবাসন খাত চাঙ্গা হয়। এছাড়া এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক গতিশীলতার মাধ্যমে স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি, যোগাযোগের উন্নয়ন, কৃষি ও ব্যবসার প্রসার এবং নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়। যদিও অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়ার হার খুবই কম। আবার যাও নেয়া হয়েছে তা নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, প্রকল্প নেয়ার আগে অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং অনুমোদনের পর দ্রুত বাস্তবায়ন পর্যায়ে নেয়া জরুরি। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা কমানো না গেলে বছরের শুরুতে যে ঘাটতি তৈরি হয়, পরে তা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রকল্পের মানেও তার প্রভাব পড়ে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি না থাকার কারণে এডিপি বাস্তবায়নে এমন ধস নেমেছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া সত্ত্বেও এখানে কারো নজর নেই। এ খাতে ৬০-৬৫ শতাংশ বরাদ্দ খরচ না হওয়া মানে কোনো জবাবদিহি নেই। আমাদের এডিপির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হলে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তদারকি বাড়াতে হবে। কেন বাস্তবায়ন করতে পারছে না সেটা দেখতে হবে।


