Sunday, May 10, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর তুলে দেওয়া যেতে পারে – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in Dhaka Mail on 9 May 2026

সংকটে স্বস্তির বাজেটের খোঁজে সরকার

বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের টানাপোড়েন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতার মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে যেমন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি অর্থনীতির ভেতরের সংকটও সরকারকে ফেলেছে কঠিন বাস্তবতায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন আগামী ৭ জুন বিকেল ৩টায় শুরু হবে বলে জানা গেছে। এই অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস করার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে পারেন বলে অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বড় হতে যাচ্ছে। এই বিশাল বাজেটকে সামনে রেখে সরকার একদিকে যেমন অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এবারের বাজেট প্রণয়নের সময় সরকারকে একসঙ্গে বহু সংকট মোকাবিলার হিসাব করতে হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্প খাতে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের কিস্তি ও শর্ত বাস্তবায়ন নিয়েও চাপে রয়েছে সরকার।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এমন একটি বাজেট দিতে চায়, যা হবে একই সঙ্গে জনমুখী ও বাস্তবভিত্তিক। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে এবারের বাজেটকে “সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বাজেটগুলোর একটি” হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, এবারের বাজেটের বড় একটি লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা ফেরানো। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। সরকার মনে করছে, মানুষের কাছে স্বস্তির বার্তা পৌঁছাতে না পারলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপরই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পড়ছে। এনবিআরকে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হতে পারে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় অনেক বেশি।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাতও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কমে গেছে। ফলে সরকারকে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং নতুন নতুন খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের পথ খুঁজতে হবে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব বাড়াতে কর অব্যাহতি কমানো, ভ্যাট কাঠামোয় পরিবর্তন আনা এবং আমদানি পণ্যের শুল্কহার বাজারভিত্তিক করার বিষয়গুলো বিবেচনায় রয়েছে। তবে একই সঙ্গে সরকার চায় না অতিরিক্ত করের চাপে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হোক।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি একাধিক বৈঠকে বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। তার মতে, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না হলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে বেসরকারি খাত এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে কর্মসংস্থানও কমে যাচ্ছে।

অর্থ বিভাগ সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারের বাজেটকে “কল্যাণমুখী অর্থনীতির রূপরেখা” হিসেবে সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের অন্যতম বড় পরিকল্পনা হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তার। আগামী অর্থবছরে এই খাতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৪১ লাখে উন্নীত করা হবে। কার্ডধারীরা মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ সহায়তা পাবেন। একইভাবে কৃষক কার্ডের আওতায় কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা ও উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি জটিল রোগে আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের জন্য এককালীন সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রাখা হতে পারে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমানো। তবে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। বিশাল বাজেটের বিপরীতে ঘাটতি ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তার দিকে বেশি ঝুঁকতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৈদেশিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক খাত থেকেও ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সুদ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধের জন্যই ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখতে হতে পারে। এর বড় অংশ যাবে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এমনভাবে ঘাটতি অর্থায়ন করা, যাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত না হয়। প্রধানমন্ত্রীও ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। আগামী বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে সারের ভর্তুকিও অব্যাহত থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সেই শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়নে আগ্রহী নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে না পারলে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফেরানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

আগামী বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ও বড় আকারে বাড়ানো হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন ও অবকাঠামো খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সামনে রেখে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথাও আলোচনায় রয়েছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে শিল্পায়ন, রপ্তানি, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বড় বাজেট দিলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা না বাড়িয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা এবং মানুষের জন্য স্বস্তিকর অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। কারণ, জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থির পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের ওপর কর তুলে দেওয়া যেতে পারে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে এর ফলাফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। রোজার মাসে আমদানি করা পণ্যের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোতে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রদান আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। তবে এর সুফল পেতে উপকারভোগী নির্বাচন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। নিম্নবিত্তের জীবনকে সহায়তা করতে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন। তবে ভর্তুকি লক্ষ্যভিত্তিক হতে হবে। কৃষি, সেচ ও গণপরিবহনের মতো খাতগুলোতে ভর্তুকি প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.