অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর ছাড়া বর্তমান সংকট কাটানো সম্ভব নয় – অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকার (১ম পর্ব)

Originally posted in বাংলা স্ট্রিম on 5 October 2026

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান; অর্থনীতিবিদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন নীতি নির্ধারণে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে। দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট ও তা উত্তরণে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

স্ট্রিম: অনেকেই বলছেন বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কি কেবলই একটি সংকট, নাকি অর্থনীতি কোনো কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? আপনি কী মনে করছেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: কাঠামোগত রূপান্তর এবং সংকটকালীন সময়—এই দুটোর মধ্যে খুব পার্থক্য করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে আমরা যেসব সমস্যা দেখছি, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাশাপাশি, আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বহু বছর ধরে পুঞ্জীভূত হওয়া সমস্যাগুলোও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। সুতরাং, এই বিষয়গুলো একে অপরের পরিপূরক। আমরা অর্থনীতির যে উত্তরণ ঘটাতে চাইছি, তা কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই করতে হবে। একইসঙ্গে, সামষ্টিক অর্থনীতির তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

স্ট্রিম: সংকটের গভীরতা কেমন দেখছেন? আমরা দেখেছি শ্রীলঙ্কা বা পার্শ্ববর্তী কিছু দেশে এমন সংকট তৈরি হলেও তারা এক-দুই বছরের মধ্যে সেটি সামলে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় পার হয়ে গেলেও অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না কেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: সাম্প্রতিক অতীতে শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে এবং এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণও ছিল—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সেসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সমস্যার ধরন, গভীরতা এবং সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে এর বিস্তৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রথমত, একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। এর সঙ্গে উৎপাদন, ব্যক্তিখাতের উদ্যোগ, সরবরাহ সক্ষমতা, রপ্তানি এবং মূল্যস্ফীতি—সবকিছু গভীরভাবে জড়িত থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত যে ধরনের নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আশেপাশের কোনো দেশে এমন উদাহরণ নেই। এমনকি খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে আমরা বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছি। এটি অত্যন্ত বড় একটি সংকট, যা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট সময় লাগবে। তাই আমাদের সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের বিষয়টি। রাজস্ব আহরণ বেশি হলে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থসামাজিক কার্যক্রম চালাতে পারত, যার ফলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমত। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের সংকটও কিছুটা লাঘব করা সম্ভব হতো। কিন্তু শতাংশের হিসেবে বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে রাজস্ব আহরণের হার সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম।

এই দ্বিমুখী সমস্যা আমাদের দেশে বহু বছর ধরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। ফলে এই চ্যালেঞ্জের মাত্রাও অনেক বেশি এবং তা থেকে উত্তরণের পথও ততটাই কঠিন। এটি এক-দুই মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান হওয়ার মতো বিষয় নয়। তবে আমরা যদি সঠিক পথে এগোতে পারি, সময়মতো ও সঠিক মাত্রায় পদক্ষেপ নিই এবং সুশাসন, আইনের শাসন ও সাশ্রয়ী নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি, তবেই এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে।

স্ট্রিম: সংকট উত্তরণে এখনই কোন পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: সংকট উত্তরণে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে:

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: আগেই বলেছি, আমাদের অনেক সমস্যার মূল ব্যাংকিং খাতে নিহিত। বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে; ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার জন্য কিছু ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যা সাময়িক সময়ের জন্য ঠিক আছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংকিং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো যাতে সুশাসনের সাথে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কারা থাকবেন, একই পরিবারের কতজন কতদিন থাকতে পারবেন—এসব বিষয়ে কঠোর হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি: প্রত্যক্ষ করের (কোম্পানি ও ব্যক্তি কর) পরিধি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অপ্রত্যক্ষ কর বা ভ্যাটের ক্ষেত্রে জনগণ যা দিচ্ছে, সরকার যেন তার পুরোটা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি বা লিকেজের কারণে এখানে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের প্রত্যক্ষ কর আদায়ের হার অর্ধেকেরও কম। এই হার বাড়াতে পারলে ঘাটতি বাজেটও নিজস্ব অর্থায়ন থেকে মেটানো সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)-কে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত সিস্টেম বা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ তৈরি করতে হবে। যেমনটি ভারতে ‘প্যান’ ও ‘আধার’ কার্ডের সমন্বয়ের মাধ্যমে করা হয়। আয়-ব্যয়, আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যাংক হিসাবের সমন্বিত তথ্যের ভিত্তিতে করফাঁকি রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদেরও নিজেদের জীবনাচরণের মাধ্যমে জনগণের সামনে সঠিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনা: উৎপাদক বা আমদানিকারক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পণ্যের দামে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। পরিবহন বা বাজারে চাঁদাবাজি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব উৎপাদকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং ভোক্তার পকেটের ওপর পড়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং প্রতিযোগিতা কমিশনকে বাজার নিয়ন্ত্রণের বদলে বাজার যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

চতুর্থত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যবসা সহজীকরণ: সামনে আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হতে যাচ্ছে। তখন আমরা অনেক শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাব। তাই বাজার সুবিধার ওপর নির্ভর না করে আমাদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য লজিস্টিক পলিসির বাস্তবায়ন, সিঙ্গেল উইন্ডো বা এক ছাতার নিচে সেবা প্রদান, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন এবং বন্দরে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় কমানোর মতো বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে। এগুলো করতে পারলে শুল্ক সুবিধা হারানোর পরও আমাদের উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন।

পঞ্চমত, সুশাসন ও জবাবদিহি: সব ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মানসিকতা ও সুশাসনের সাথে সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে বর্তমানের এই কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

স্ট্রিম: দেশে কর্মসংস্থানের বড় সংকট রয়েছে, তবে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে ওঠানামা করছে। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা বা নেপালে মূল্যস্ফীতি এখন ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: মূল্যস্ফীতির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি। আমাদের রিজার্ভ এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকায় এবং টাকার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে পারায় আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি আমরা অনেকটা সামাল দিতে পেরেছি। এটি একটি বড় অর্জন। তবে আমাদের মূল সমস্যাটি রয়ে গেছে দেশীয় উৎপাদন, সরবরাহ এবং চাহিদার সমন্বয়ে।

এখানে বড় একটি ঘাটতি হলো সঠিক তথ্য-উপাত্তের অভাব। এক প্রতিষ্ঠান যে তথ্য দেয়, অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে তার মিল থাকে না। আমাদের প্রকৃত জনসংখ্যা কত, খাদ্যের চাহিদা কত, কতটা উৎপাদন হলো, কতটা আমদানি করতে হবে এবং ঠিক কখন মজুত পণ্য বাজারে ছাড়লে দাম স্থিতিশীল থাকবে—এই বিষয়গুলোতে সমন্বিত উদ্যোগের বড় অভাব রয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা চাঙ্গা করতে না পারলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। অনেক সময় নীতিনির্ধারকেরা বলেন যে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও দাম বাড়ার মানে হলো, সরবরাহ ব্যবস্থায় কারসাজি বা ম্যানিপুলেশন হচ্ছে। অবৈধ মজুতদারি বা গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং এখানেই নজরদারি বাড়াতে হবে।

স্ট্রিম: অনেক সময় সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও, সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে এর কোনো সুফল বা স্বস্তি পান না। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমলেই সাধারণ মানুষ স্বস্তি পায় না, যদি না তাদের আয় বা ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। ধরুন, কোনো পণ্যের দাম ১০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ টাকা, এরপর ২৮ টাকা হলো। এখন দাম বাড়ার হার বা মূল্যস্ফীতি হয়তো কিছুটা কমল, কিন্তু মূল্যস্তর তো সেই ২৮ টাকাতেই রয়ে গেল! তাই সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে ভাবে না; তারা দেখে বাজারের বর্তমান মূল্যস্তর কত এবং তাদের আয় দিয়ে সেটি সামাল দেওয়া যাচ্ছে কি না। শূন্য মূল্যস্ফীতি বলে কিছু নেই, মূল্যস্তর ধীরে ধীরে বাড়বে—এটাই অর্থনীতির নিয়ম। কিন্তু এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানও বাড়তে হবে।

প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে হলে শুধু সাধারণ কাজ নয়, তাদের জন্য শোভন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। ইন্টারনেটের গতি বাড়িয়ে ফ্রিল্যান্সিং বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে বৈদেশিক শ্রমবাজারের সুযোগও পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।

স্ট্রিম: সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, যেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নীতি সুদহার ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন। আমরা কি তবে একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে গেছি?

মোস্তাফিজুর রহমান: হ্যাঁ, এটি আসলেই একটি দুষ্টচক্র। নীতি সুদহারের সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার সরাসরি সম্পর্কিত। তবে একজন উদ্যোক্তার জন্য কেবল সুদের হারই শেষ কথা নয়; তার সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ কত দাঁড়াচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি যদি নীতি সুদহার কমিয়েও দিই, কিন্তু উদ্যোক্তারা যদি কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা গ্যাস না পান, তবে তো বিনিয়োগ হবে না। কিছুদিন আগেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে নতুন কোনো কারখানায় গ্যাস দেওয়া হবে না। জ্বালানির মতো এই ধরনের মৌলিক চাহিদা সমাধান না করে কেবল মুদ্রানীতি বা রাজস্ব নীতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যাবে না।

স্ট্রিম: দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও তো আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে সফল হচ্ছে?

মোস্তাফিজুর রহমান: এখানে উদাহরণস্বরূপ ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। তাদের জিডিপি আমাদের চেয়ে কিছুটা কম হওয়া সত্ত্বেও তাদের রপ্তানি প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে বিশাল বাণিজ্য তারা পরিচালনা করছে। এত বড় কর্মযজ্ঞ তারা সামলাচ্ছে তাদের উন্নত বন্দর, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো দিয়ে।

আমাদের এখন এই বড় প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করায় নজর দিতে হবে। জ্বালানি খাতে যে স্থবিরতা ছিল, তা কাটাতে এখন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও হচ্ছে। এগুলো যদি সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা দূর হবে।

পরিশেষে বলব, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের ত্রিমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রথমত, জ্বালানি ও অবকাঠামো সমস্যার সমাধান; দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো; এবং তৃতীয়ত, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ঋণের সুদের হার সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

সঠিক পদক্ষেপগুলো নিলেও এই গভীর সংকট কাটিয়ে উঠে অর্থনীতিকে পুনরায় একটি টেকসই ও গতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমাদের অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। আর আমাদের এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে হলে এই গতিশীলতা অর্জন আমাদের দরকার হবে।

(দ্বিতীয় পর্ব আসছে)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.