খালেদা জিয়া ,একজন রাজনৈতিক নেতা যিনি শুনতেন প্রশ্ন করতেন এবং জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতেন – ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Originally posted in জনতার চোখ on 10 January 2026

জাতীয় নেতা খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমি আমার গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি আমাদের এমন এক সময়ে ছেড়ে চলে গেছেন যখন জাতির জন্য তার দিকনির্দেশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। তিনি আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো সাহস ও দায়িত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে দেখতে চেয়েছিলেন, এখন সেগুলো সম্মিলিতভাবে সমাধান করার দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায়।

আমার পেশাগত জীবনে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার চারবার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রতিটি সাক্ষাতই রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার সম্পর্কে আমার মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে। এমন একজন নেতা যিনি নতুন ধারণাকে মূল্যায়ন করতেন এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে গুরুত্ব দিতেন।

অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন

তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে। এরশাদ সরকারের পতনের ঠিক পরেই। খালেদা জিয়া তখন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির (বিইএ) সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সে সময় আমি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমার উদ্বোধনী বক্তব্যে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, আমরা সচেতনভাবেই সদ্য বিদায়ী সরকার প্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো থেকে বিরত থেকেছি এবং আমরা খালেদা জিয়াকে দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত। তিনি এই বক্তব্যটি লক্ষ্য করেন এবং পরে আমার কাছে এর পেছনের কারণ জানতে চান। আমি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার এবং উন্নয়নের সঙ্গে এর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা ব্যাখ্যা করি। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তা শোনেন এবং মৃদু প্রশংসার মাধ্যমে এর উত্তর দেন।

ব্যাংক সংস্কার কমিটি

দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় ১৯৯০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। যখন আমি অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত ব্যাংক সংস্কার কমিটিতে (১৯৯৩-১৯৯৪) কাজ করছিলাম। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আমাকে সেখানে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সে সময় আমরা ব্যাংক কোম্পানি আইনের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কিছু সংশোধনী নিয়ে কাজ করছিলাম। বিশেষ করে স্পন্সর ডিরেক্টরদের (উদ্যোক্তা পরিচালক) ভূমিকা, পদের মেয়াদ এবং পারিবারিক আধিপত্য সীমিত করার বিষয়গুলো। অন্য একটি প্রসঙ্গে সুযোগ পেয়ে আমি খালেদা জিয়ার কাছে এই উদ্বেগগুলো উত্থাপন করার সাহস করি। তিনি সহজভাবে বলেছিলেন, আপনারা যা প্রয়োজন মনে করেন, তা-ই করুন। এই স্পষ্ট এবং নীতিগত দিকনির্দেশনাটি প্রযুক্তিগত বিচারের প্রতি তার আস্থা এবং দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে তার গভীর বোঝাপড়ারই প্রতিফলন ছিল।

ডব্লিউটিও প্রতিনিধিদল

তৃতীয় ঘটনাটি আমাকে নিয়ে হলেও, সেই মুহূর্তে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। তবে ঘটনাটি বেশ শিক্ষণীয়। ২০০১ সালের অক্টোবরে যখন তিনি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন দোহায় অনুষ্ঠিতব্য ডব্লিউটিও মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছিল। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় প্রতিনিধিদল গঠন করা হচ্ছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবিত তালিকা জমা দেয়, তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জনৈক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা- সম্ভবত রাজনৈতিক কারণে আমার নাম তালিকা থেকে কেটে দেন। দোহা সম্মেলনের ঠিক আগে দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের শীর্ষ নেতারা নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান। সেই সুযোগে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি)-এর প্রেসিডেন্ট জনাব মাহবুবুর রহমান এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত লতিফুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যবসায়ী নেতা বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি তোলেন। তারা উল্লেখ করেন যে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে কার্যকর বাণিজ্য আলোচনার জন্য জাতীয় প্রতিনিধিদলে আমার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই)-এর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সি. কে. হায়দার আমাকে জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার উত্তর ছিল। দেশ গড়ার প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকের অবদান প্রয়োজন এবং কেবল রাজনৈতিক কারণে কাউকে বাদ দেয়া অর্থহীন। এভাবেই সরকারি প্রতিনিধিদলের তালিকায় আমার নাম পুনর্বহাল করা হয় এবং আমি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে দোহায় যাই। যেখানে আমরা ডব্লিউটিও আলোচনায় অংশ নিই। এই ঘটনাটি আমার ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। আমি জাতীয় স্বার্থে সংকীর্ণ দলীয় চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠার (যা প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত কর্মকর্তারা উস্কে দিতেন) এক অসামান্য ক্ষমতা খালেদা জিয়ার মধ্যে দেখতে পাই।

গ্যাস ব্যবহার কমিটি

প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ হয় ২০০২ সালে। তখন গ্যাস রিজার্ভ ব্যবহার সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির কয়েকজন সদস্য একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটিকে ব্রিফিং দিচ্ছিলেন। সেই সময় অত্যন্ত আলোচিত ইস্যুটি ছিল- বাংলাদেশের ভারতে গ্যাস রপ্তানি করা উচিত কিনা। প্রকৃতপক্ষে, কিছু আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি প্রচার করছিল যে, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে এবং দ্রুত তা উত্তোলন করে ভারতের বাজারে রপ্তানি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা (চব্বিশে ক্ষমতাচ্যুত) একটি বক্তব্য জনপ্রিয় করেছিলেন, ৫০ বছরের মজুত রেখে বাংলাদেশ নিরাপদে গ্যাস রপ্তানি করতে পারে। আমি যখন আমার উপস্থাপনা শুরু করি, খালেদা জিয়া তার প্রথম প্রশ্নটি দিয়েই আমাকে অবাক করে দেন। তিনি বলেন, আপনি কি আমাকে বলছেন যে, আগামী ৫০ বছরের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত গ্যাস নেই? তার প্রশ্নের তীক্ষ্ণতা দেখে আমি চমকে গিয়েছিলাম। আমি অকপটে উত্তর দিয়েছিলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বর্তমানে আমাদের কাছে ৫০ বছরের নিশ্চিত মজুত নেই। গ্যাসের প্রাপ্যতা একটি পরিবর্তনশীল বিষয়। যদি অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে, তবে আমরা ৫০ বছর টিকে থাকতে পারি। কিন্তু এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট একটি সময়ে আমাদের ৫০ বছরের গ্যারান্টিযুক্ত মজুত নেই। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তাহলে আমরা কীভাবে অনুসন্ধান বাড়াতে পারি? আমি ব্যাখ্যা করলাম, দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স-এর সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে এবং বিশেষ করে অফশোর ও গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তিনি দ্রুত বিষয়টি বুঝতে পারলেন এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করলেন- গ্যাস রপ্তানি থেকে আমরা আসলে কতো টাকা আয় করবো? আমি তাকে সত্যটা বললাম। সেই আয়ের প্রক্ষেপণ খুব একটা বেশি ছিল না। মোটামুটি দুই বা তিনদিনের রেমিট্যান্স আয়ের সমান। আমি আরও যোগ করলাম, দেশের অভ্যন্তরীণ খাতের জন্যই এই গ্যাসের প্রয়োজন এবং তা ব্যবহার করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। সেই পর্যায়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আলোচনায় অংশ নেন। আমি আরও ব্যাখ্যা করি যে, আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানি করার ক্ষেত্রে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। এগুলো কোনো কাল্পনিক উদ্বেগ ছিল না। খালেদা জিয়া তাৎক্ষণিকভাবে এর ফলাফলগুলো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী সাইফুর রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং অন্যরা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। সেই আলোচনাটি একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। পেছনে ফিরে তাকালে, আমি সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের অংশ হতে পেরে গর্ববোধ করি যে, বৈঠকটি এমন এক সময়ে ভারত বা অন্য কোথাও গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করতে সাহায্য করেছিল যখন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ছিল।

নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একজন রাজনৈতিক নেতা

একত্রে এই চারটি ঘটনা- ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০২ আমার পেশাগত জীবনের বিভিন্ন সময় এবং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়কে ধারণ করে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার সম্পর্কে তিনটি স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। প্রথমত, তিনি প্রযুক্তিগত বা কারিগরি পরামর্শ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ব্যাংকিং সংস্কার, বাণিজ্য আলোচনা বা জ্বালানি নিরাপত্তা- যেকোনো জটিল নীতিনির্ধারণী বিষয়ের গভীরে যাওয়ার প্রতি তার অকৃত্রিম আগ্রহ ছিল। আমাদের মতো নীতিনির্ধারকদের জন্য তার এই শোনার মানসিকতা ছিল অমূল্য। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য তিনি যৌক্তিক ও গভীর প্রশ্ন করতেন। তার প্রশ্নগুলো কেবল বলার জন্য বলা বা রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য ছিল না, বরং সেগুলো ছিল কোনো ধারণাকে যাচাই করা, ফাঁকফোকর খুঁজে বের করা এবং এর ফলাফল বোঝার জন্য। তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- তিনি কারিগরি পরামর্শগুলোকে একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি বুঝতেন যে, নীতিনির্ধারণী পছন্দগুলো কখনোই নিখুঁতভাবে প্রযুক্তিগত নয়। সেগুলোকে অবশ্যই জাতীয় অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এগুলো একজন কার্যকর রাজনৈতিক নেতার ক্লাসিক অথচ বিরল গুণাবলি। নেতৃত্বের এই মডেলটির সফল উদাহরণ ছিল খালেদা জিয়া এবং সাইফুর রহমানের মধ্যকার অংশীদারিত্ব। ১৯৯২ সালে ভ্যাট চালু করা হোক বা ২০০৩ সালে ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট পদ্ধতি গ্রহণ- তাদের এই সহযোগিতা ছিল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং কারিগরি দক্ষতার পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতিফলন। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের নেতারা তার উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেবেন। কীভাবে একজন রাজনৈতিক নেতা নীতিনির্ধারণী উপদেষ্টাদের সেরা ব্যবহার করতে পারেন, কীভাবে জটিল কারিগরি বিষয়গুলোকে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করা যায় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে নেতৃত্ব কীভাবে সংকীর্ণ চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে। এই সময়ে খালেদা জিয়াকে খুব বেশি মনে পড়বে।