Tuesday, March 10, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

গভর্নর নিয়োগে খাত-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বিবেচনা জরুরি: ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in দেশ রূপান্তর on 27 February 2026

কাজের মধ্য দিয়েই পরীক্ষা হবে নতুন গভর্নরের

নিয়োগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে অফিস শুরু করেছেন। তবে তার নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার অনেকে আগের ধারাবাহিকতার ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

অর্থনীতির বিশ্লেষক ও সমালোচকরা বলছেন, আর্থিক খাতে আহসান এইচ মনসুরের ব্যাপক অভিজ্ঞতার তুলনায় মোস্তাকুর রহমানের অভিজ্ঞতা ভিন্নধর্মী। ফলে নতুন গভর্নরের পূর্ব অভিজ্ঞতার নজির না থাকায় ভবিষ্যৎ কাজের মাধ্যমেই তার দক্ষতা ফুটে উঠবে। পরীক্ষা দিয়েই উত্তীর্ণ হতে হবে তাকে।

অবশ্য, নতুন গভর্নরের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রানীতি প্রণয়ন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নসহ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলেই মনে করছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গভর্নর হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা দরকার, সেটি নিশ্চয়ই নতুন গভর্নরের রয়েছে। আর তাকে যারা নির্বাচিত করেছেন, তাদের নিশ্চয়ই তার কর্মক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। আমরা ব্যবসায়ী। আমরা ডিগ্রি দেখব না। আমরা দেখব গভর্নর ব্যবসাবান্ধব নীতি নিচ্ছেন কি না। ব্যবসার পরিবেশ ঠিক রাখতে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ অন্যান্য সংস্থার চাপ তিনি কতটা সহ্য করতে পারছেন, সেটিই তার যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ রাখবে। তিনি কোন পাস করেছেন, সেটি না দেখে দেশের অর্থনীতির জন্য তিনি ভালো কী করতে পারেন, সেজন্য তাকে সহযোগিতা করা উচিত বলে মনে করি।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গভর্নর কেমন হলেন এটা তো আমি বলতে পারব না। তাকে যারা নিয়োগ দিয়েছেন, তারা বলতে পারবেন, কী দক্ষতার ভিত্তিতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন গভর্নরের সিভি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। দেশের ইতিহাসে বেসরকারি খাত থেকে গভর্নর নিয়োগের এটাই প্রথম নজির। সামনে মুদ্রানীতি রয়েছে, সেখানে গভর্নরের নীতি ও পরিকল্পনার চিত্র ফুটে উঠবে। তখন বলা যাবে, গভর্নর কেমন করবেন। অর্থনীতি বা মুদ্রানীতি কোন পথে হাঁটবে। তবে এটাও সত্য দেশের ইতিহাসে কোনো গভর্নরকে এভাবে তার দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়নি। ব্যক্তি হিসেবে যেকোনো মানুষের ভুল থাকতে পারে। তার জন্য নাটক তৈরি করে প্রত্যাহার করার ঘটনা গণতান্ত্রিক অর্থনীতিতে সুন্দর দেখায় না। ফলে ভবিষ্যতে কোনো সম্মানিত ব্যক্তি গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে চিন্তা করবেন। সেজন্য নীতিনির্ধারণী মহলকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার অনুরোধ করছি।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগে সরকার কী বার্তা দিচ্ছে’ শিরোনামে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উদ্বেগ জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে কতটা স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল করা একজন তৈরি পোশাক শিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ী করপোরেট স্বার্থের প্রভাবমুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কতটা নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন?

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, গভর্নর বদল নিয়ে পুরো ঘটনাপ্রবাহ নতুন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছে। নতুন সরকার এসে গভর্নর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা শোভনীয় হয়নি, আরও মসৃণ হতে পারত। কারণ, সদ্য বিদায়ী গভর্নরকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তিনি কিছু সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা তার অবদান, এর স্বীকৃতি দেওয়া যেত। তার প্রস্থানের প্রক্রিয়া দুঃখজনক। এটি সংকেত দেয়, ভবিষ্যতে যোগ্য লোক এ ধরনের পদে আসতে চাইবেন না।

নতুন গভর্নরের কাছে এ অর্থনীতিবিদ প্রত্যাশা করে বলেছেন, আর্থিক খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করবেন না। নতুন গভর্নরের কাছে প্রত্যাশা হলো, যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা রাখবেন। এ ছাড়া অপেক্ষমাণ সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন। আর্থিক খাত যেন দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, এটা নতুন গভর্নরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যে সংস্কারগুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির আওতায় চলছে, তা চলমান রাখতে হবে।

ড. জাহিদ নতুন গভর্নরের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনসহ সংস্কারগুলো চলমান রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন নতুন গভর্নর। এ ছাড়া দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত করার বিষয়টি চলমান রাখতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা নতুন গভর্নরের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য এ দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একার পক্ষে করা কঠিন। সার্বিকভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবেচনায় এ দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদটি ‘হট সিট’। তাকে সংস্কার করার পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের নানা ধরনের চাপ সামলাতে হয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা দরকার। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে থাকেন। তাই যিনি এ পর্যায়ে কাজ করবেন, তার সে ধরনের অভিজ্ঞতা আছে কি না, সেটি দেখা দরকার। নতুন গভর্নর হয়তো নতুন কোনো পলিসি নিয়ে কাজ করবেন। বলা হচ্ছে, পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এমন আরও বিষয় থাকতে পারে। যাই হোক, দেখার বিষয় তিনি কেমন করেন।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকার হয়তো রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ করেছে। এটা হতে পারে। কারণ, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক লোক দরকার হতে পারে। কিন্তু দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তির সেই ধরনের বিজ্ঞতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার দরকার ছিল বলে আমরা মনে করি। সে ক্ষেত্রে সদ্য বিদায়ী গভর্নর কোনো অংশে কম ছিলেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি আর্থিক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে। ফলে পূর্ববর্তী গভর্নর আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তাকে এ খাতের জন্য আরও কিছুদিন দরকার ছিল বলে মনে করি।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.