জনগণ এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন – ড. মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in খবরের কাগজ on 28 December 2025

ড. মোস্তাফিজুর রহমান একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা

খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন ?

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ, বাধাবিপত্তি তো আছেই। তা সত্ত্বেও আগামী নির্বাচন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে বলে আমি মনে করি । বিশেষ করে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ যারা অনেক বছর তাদের গণতান্ত্রিক যে অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, তারা একটি ভালো নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে। তারাও চাচ্ছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারও এ ব্যাপারে আন্তরিক আছে। কাজেই একটা ভালো নির্বাচন আমাদের হবে। এটা ঠিক যে, কিছু কিছু পক্ষ আছে, যারা গণতান্ত্রিক যে উত্তরণ সে উত্তরণটা চায় না। বিভিন্নভাবে এটাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। আমার ধারণা, বিভিন্ন বাধাবিপত্তি কাটিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে। সম্প্রতি এ নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার বিভিন্ন অপচেষ্টা দেখেছি। হাদিকে যেভাবে হত্যা করা হলো এবং পরবর্তীতে যেভাবে ভাঙচুর, আগুন দেওয়া হলো, এগুলো দেখে বোঝা যায় যে, দেশে স্থির অবস্থা অনেকে চায় না। অস্থিরতার মাধ্যমে এ নির্বাচনের পরিবেশটাও নষ্ট করতে চায়। ভালো নির্বাচনের মধ্যদিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটা ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে সে বিষয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী।

খবরের কাগজ: নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেমন মনে হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না?

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: সেক্ষেত্রে অবশ্যই অনেক চ্যালেঞ্জ থাকবে। একেবারে হয়তো আমরা যেরকমভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনুকূল পরিবেশ চাচ্ছি, সে রকম হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ‘আর্মি ডিপ্লয়মেন্ট’ (নির্দিষ্ট সামরিক মিশন) হবে। এটা খুব ভালো কথা। সে ডিপ্লয়মেন্টের সংখ্যা তো প্রয়োজনের তুলনায় কম। আমরা যদি ১ লাখ বলি, তাহলেও প্রতি সেন্টারে আমরা কয়জনকে দিতে পারব ? স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে তাদের রাখতে হবে। পুলিশ প্রাথমিক পর্যায়ে একটা বড় বিপর্যয়ের মধ্যে ছিল, এখন তা কাটিয়ে তারা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কিছুটা অর্জন করেছে। তার পরও সেখানে বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা আছে। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা একেবারে সঠিক, যখন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার মতো আমাদের সক্ষমতা হবে, তখনই কেবলমাত্র আমরা নির্বাচন করব। সে প্রত্যাশা করাটা হয়তো ঠিক হবে না। যতটুকু আমাদের পক্ষে বর্তমান পারিপার্শ্বিতায় সম্ভব আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। আমাদের এ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করে নির্বাচনের দিকে যাওয়া উচিত। সেখানে অবশ্যই অস্ত্র উদ্ধার একটা বড় কারণ হবে। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর যাদের হাতে মূল ক্ষমতা দেওয়া আছে, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন । সেখানে যদি দুর্বলতা থাকে সে দুর্বলতাগুলোকে কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করে নির্বাচনের দিকে যেতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো অনুকূল নয়, নির্বাচন করা ঠিক হবে না, এভাবে চিন্তা না করে আমরা যদি উল্টোভাবে চিন্তা করি অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কীভাবে আমরা সে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করতে পারি, এভাবে যদি চিন্তা করি তাহলে আমার মনে হয় পরিস্থিতি উন্নতির মাধ্যমে ভালো একটা নির্বাচনের দিকে যেতে পারব।

খবরের কাগজ: বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সবারই অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। সাংবিধানিকভাবে যারা গঠনতন্ত্র আইনে নির্বাচন করতে চান, তাদের সবাইকে সুযোগ দিতে হবে। এটাই হলো গণতন্ত্রকে ধারণ করা। এটা ঠিক যে, ইসলামী দলগুলো, যাদের অনেকদিন গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখন তাদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং সে সুবাদে তারা মানুষের কাছে যেতে পারছে। একেকজনের একেক রকম আদর্শ থাকবে। গণতান্ত্রিক সমাজে এটাই হলো নিয়ম। আমার পছন্দ না হলেও গণতান্ত্রিক অধিকার সবাই প্রয়োগ করতে পারবে। সেটাকে আমাদের সবার মেনে নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এখন আওয়ামী লীগ নেই। বিএনপি-ইসলামপন্থি দল, ছাত্রদের দল এরাই নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যারা গত ১৮ বছর রাস্তায় দাঁড়াতে পারেনি। সুতরাং এটাকে আমি এভাবে দেখি যে, কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ তো অবশ্যই থাকবে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে। ইসলামি দলগুলোর ওপর যদি মানুষের সমর্থন থাকে তাহলে তারাও রাজনীতিতে থাকবে। তাদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করবে। যাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি আছে তারা তাদের মতামত, তাদের যে আদর্শ সেটা জনগণের কাছে শক্তিশালীভাবে নিয়ে যাবে। দলগুলো যদি জনগণের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তারা যদি তাদের নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে না পারে; দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলে সেটা যদি প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে ঘটনা অন্যরকম হবে। সুতরাং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমার আদর্শ যদি হয় আমি একটা প্রগতিশীল সেকুলার বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই প্রমাণ করতে হবে। আর সেটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে, অন্য যারা ইসলামপন্থি বলি বা অন্য পন্থি বলি তাদের দিকে জনসমর্থন চলে যেতে পারে।

খবরের কাগজ: আসন্ন নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কি না?

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: নির্বাচনের যে বিধিমালা নির্বাচন কমিশন করে দিয়েছে, সেটা মানতে হবে। যত্রতত্র পোস্টার লাগানো বা কালার পোস্টার করা, এসব বিষয়ে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, দুঃখজনক সত্য যে, অনেক প্রার্থী সেগুলো পালন করছেন না। জনগণ কিন্তু এগুলো খেয়াল করছে এবং তারা সিদ্ধান্ত নেবে যে, ভোটের সময়ে করা অঙ্গীকার প্রার্থীরা কতটুকু রাখছেন। যিনি আগেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন তিনি নির্বাচিত হলে অঙ্গীকার রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে জনগণের যখন সন্দেহ হবে ভোটের ওপরেও কিন্তু তার একটা প্রভাব থাকবে। এটা রাজনীতিকদের জন্য একটা সতর্কবাণী বলে আমি মনে করি। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে। আমরা আশা করব, তারা পারবে। প্রশাসন তাদের কথা শুনবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কথা শুনবে। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, তারা খুব ভালো একটা নির্বাচন দিতে চায় এবং বিশ্বাসী থাকবে শেষ পর্যন্ত। কোনো ধরনের চাপের কাছে, সংঘাতের কাছে, কোনো অযোগ্য দাবির কাছে তারা মাথা নত না করে একটা ভালো নির্বাচন দিতে পারবে। এটাই হলো চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেক পক্ষকে তার যে সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং জনগণের কাছে অঙ্গীকার বা দায়িত্ববোধ এটা মানতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার হোক, নির্বাচন কমিশন হোক, ব্যুরোক্রেসি হোক, রাজনৈতিক দল হোক- সবাইকে এটা মানতে হবে। জনগণ এগুলো মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে। যেখানে এটা মানা হচ্ছে না, সেখানে তারা নিশ্চয়ই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী- আমরা যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বিগত সময় গিয়েছি এবং বাংলাদেশের যে সম্ভাবনার কথা আজকের তরুণ সমাজ বিশ্বাস করে, তাদের সে সক্ষমতা আছে। এসবকে ধারণ করে একটা ভালো নির্বাচন আমাদের হবে, এটাই প্রত্যাশা।

খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।