Tuesday, March 31, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

জ্বালানি নীতিতে দেশীয় নেতৃত্ব ও দুর্নীতি রোধে শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থার প্রয়োজন – ড. মোয়াজ্জেম

ক্যাব-সমকাল গোলটেবিল বৈঠক

Originally posted in সমকাল on 30 March 2026

জ্বালানি খাতে নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকালের সভাকক্ষে গতকাল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা। ছবি: সমকাল

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলেও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব এ খাতের বড় সমস্যা। আমদানিনির্ভরতা, উচ্চ ব্যয় এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো ব্যবস্থা ভোক্তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সোলার ও বায়োগ্যাস ব্যবস্থার প্রসার, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং জনগণ ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে গতকাল রোববার বক্তারা এসব কথা বলেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং সমকাল যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল অফিসের সভা কক্ষে এ বৈঠক হয়।

বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত গত তিন দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এর সঙ্গে নানা কাঠামোগত সংকটও তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে খাতের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়, আমদানিনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও মূল্যবৃদ্ধি।

ক্যাবের গবেষণা সম্পাদক শুভ কিবরিয়া মূল প্রবন্ধে বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা হয়েও দেখা দিতে পারে। টিকে থাকার প্রয়োজনে সরকার এ খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে হাঁটবে বলে প্রত্যাশা তাঁর।

প্রিপেইড মিটারের প্রোগ্রামটি পরীক্ষা করা হচ্ছে

বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতা এর চেয়ে বেশি, ৩০ হাজার মেগাওয়াট। রিজার্ভ মার্জিন ধরে রাখতে প্রায় ২২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা হলেই চলে। ফলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র অব্যবহৃত অবস্থায় থাকছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তির কারণে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

জ্বালানিমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা ভোক্তা পর্যায়ে সমন্বয় করা কঠিন।

সরকারের প্রথম এক মাসের কাজের প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে ভোক্তাদের দিক থেকে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে সরকার। তিনি বলেন, প্রিপেইড মিটারে যে মাসিক ১০ শতাংশ মিটার চার্জ কাটা হয়, সেটি কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিটারের ব্যবহৃত প্রোগ্রামটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এটা বুঝতে পারলে ১০ শতাংশ চার্জ নিয়ে একটা সমাধানে আসা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

লুণ্ঠনমূলক কাঠামো গড়ে উঠেছে

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও ভোক্তার অধিকার উপেক্ষিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি লুণ্ঠনমূলক কাঠামো গড়ে উঠেছে।

অধ্যাপক শামসুল আলম অভিযোগ করেন, নীতিনির্ধারণ ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গণশুনানি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ভোক্তার স্বার্থের পরিপন্থি। এমনকি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিমালায় কাঠামোগত সংস্কার এনে প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মন্ত্রী-এমপিদের বাসার ছাদে সোলার ব্যবস্থা স্থাপনের দাবি জানান।

সংস্কার সময়ের দাবি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকারের দায়িত্ব হলো খাতটিকে জ্বালানি রূপান্তরমুখী করা এবং এ লক্ষ্যে নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ যেমন দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ আইন বাতিল, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়া চালুর মতো পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি অবাস্তব উচ্চ চাহিদার লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেন।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে ত্রুটি রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ রাখা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নে বিদেশি অর্থের প্রভাব কমিয়ে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি।

সেবা খাত হিসেবে গড়তে হবে

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কোনোভাবে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হিসেবে চালানো যাবে না। একে সেবা খাত হিসেবে চালাতে হবে। তবে কাজটা খুব সহজ নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বিতরণ সব বিষয়ে জনগণের স্বার্থ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে হবে। আদানিসহ বিভিন্ন চুক্তির বিষয়ে বর্তমান সরকারকে ভেবেচিন্তে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, সরকার বলছে জ্বালানি তেলের সংকট নেই; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জনগণ তেল পাচ্ছে না।

স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে

বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, এ খাতে স্বচ্ছতা, জনগণের কল্যাণমুখী নীতি এবং নিজের সম্পদে নির্ভরতা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বন্ধ আছে। সরকারের নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ, তাই জনগণ ও নাগরিক সমাজ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করে সরকারকে দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সোলার ও বায়োগ্যাস ব্যবস্থার প্রসার, গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের যথাযথ ব্যবহার এবং স্বচ্ছতা বজায় রেখে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

অনিয়ম খতিয়ে দেখা উচিত

জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে দায়মুক্তি আইন করা হয়েছে দুই বছরের জন্য। কিন্তু দুই বছর পরপর তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে কমিশন করে অনিয়মগুলো খতিয়ে দেখা উচিত।

সে আমলে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শামীম হায়দার বলেন, তারা চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জের নিশ্চয়তা দেখে প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে।

জনগণকে তথ্য দিয়ে সচেতন করতে হবে

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এ খাতে নীতিগত সংস্কার, দুর্নীতি বন্ধ এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রসর হওয়া জরুরি। নীতিমালায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকায় এ খাতে দুর্নীতি বেড়েছে। নিজের নির্বাচনী এলাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, জনগণকে তথ্য দিয়ে সচেতন করলে তারা নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারবে।

বাপেক্সকে দুর্বল করা হয়েছে

গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হোসেন রুবেল বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট মূলত আমদানিনির্ভর নীতির ফল। যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান অবহেলিত হয়েছে এবং বাপেক্সকে দুর্বল করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মানসম্মত বিনিয়োগ, সৌর ও বায়ুশক্তির বিকেন্দ্রীভূত ব্যবহার এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিই সমাধান

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে যথাযথ উদ্যোগ ও সচেতনতার অভাব রয়েছে, যদিও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে সৌরবিদ্যুৎ এখন অনেক বেশি সাশ্রয়ী। আমদানিনির্ভরতা কমাতে দ্রুত জ্বালানি রূপান্তর, সৌর ও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং নীতিমালায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

চুক্তি ও নীতিমালা দেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মঞ্জুর মঈন বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশনির্ভর চুক্তি ও নীতিমালা দেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আশরাফুল আলম, ক্যাব যুব সংসদের সদস্য অরিত্র রোদ্দুর ধর ও নওশীন জাহান তাকিয়া।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। সমাপনী বক্তব্য দেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.