Monday, March 30, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

জ্বালানি ব্যয় সামলাতে বিকল্প অর্থায়নের খোঁজ জরুরি: মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in বণিকবার্তা on 30 March 2026

জ্বালানি কিনতে জুনের মধ্যে প্রয়োজন হবে বাড়তি ৩ বিলিয়ন ডলার

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহের চেষ্টায় সরকার

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ আর এলএনজির প্রায় ৮৩ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম যুদ্ধের আগের ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ১০০ ডলারে উঠেছে।

আর প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১০-১২ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০-২২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি ও জ্বালানি তেল কিনতে বাংলাদেশকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি না করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জুন পর্যন্ত সরকারের প্রয়োজন হবে বাড়তি ৩ বিলিয়ন ডলার। এ অর্থ জোগাড় করতে সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার টন পরিশোধিত এবং ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রাক্কলন রয়েছে। এ পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানিতে সংস্থাটির ব্যয় হবে ৯১ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার তথ্যানুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট মার্কেট থেকে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিমাণ কার্গো আমদানিতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এরই মধ্যে দ্বিগুণ দামে কয়েক কার্গো এলএনজি কিনতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে কী পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন করেছে অর্থ বিভাগ। এক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত ৩ বিলিয়ন ডলারের মতো অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এরই মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়ে গেছে। অপ্রতুল রাজস্ব আয়ের কারণে সরকারের পক্ষে বাড়তি অর্থ ব্যয় করার সুযোগ সীমিত। তাছাড়া জ্বালানি কেনার অর্থ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। সবদিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কেননা নিজেদের অর্থে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় মেটাতে গেলে রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে। এ কারণে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাড়তি এ অর্থের সংস্থান করতে চাইছে। এক্ষেত্রে আইএমএফের কাছ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো সহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার। তাছাড়া এডিবির কাছ থেকে বাড়তি ২৫ কোটি ডলার এরই মধ্যে বাজেট সহায়তা হিসেবে চাওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির কাছেও বাজেট সহায়তা চাওয়া হবে। সামনের মাসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন অধিবেশনে এ বিষয়ে সংস্থা দুটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কথা বলবেন বলে জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে (বিওপি) সমর্থন দিতে ২০০ কোটি ডলার ঋণ নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। আইএমএফ এবং অন্য কয়েকটি উৎস থেকে এ ঋণ নেয়ার প্রাথমিক আলোচনা চলছে। গতকাল অর্থনীতিবিষয়ক সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে ‘আমরা ২ বিলিয়ন ডলারের একটা বিওপি সাপোর্ট চেষ্টা করব’ উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে। অ্যাডিশনাল এ পরিমাণ ব্যালান্স অব পেমেন্টের জন্য। যাদের সঙ্গেই আলোচনা হয় তারাও দেখতে চায় যে কী হয়।’

সাপোর্টের উৎস প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘মূলত আইএমএফকেও বলেছি। ইআরডি আরো চেষ্টা করছে কয়েকটা সোর্স থেকে অ্যাডিশনাল কিছু পাওয়া যায় কিনা।’

নগদ অর্থের সংকট, বিশেষ করে ডলারের অভাবে বিগত সময়ে জ্বালানির দাম সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় সমস্যায় পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে গত বছর বিশ্বব্যাংকের দ্বারস্থ হয় তৎকালীন সরকার। দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য গত বছর সংস্থাটির কাছ থেকে বাংলাদেশ ৩৫ কোটি ডলারের ঋণ সুবিধা নিয়েছিল। সম্প্রতি এ ঋণ সুবিধা আরো ৩৫ কোটি ডলার বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে যে বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে বিশ্বের অনেক দেশই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে ঋণ চাইবে। ফলে ঋণ সংগ্রহে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। এজন্য তাদের কাছ থেকে অর্থায়ন নিতে হলে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির দরকার আছে। সেই সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের দিক থেকে কী ধরনের কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেটি তুলে ধরাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে যুদ্ধের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটির প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরো তীব্র হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব প্রথম দুই-তিন মাসে যতটা বেশি ছিল, পরের মাসগুলোতে তা স্তিমিত হয়ে এসেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধের পরিধি ক্রমেই ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধের প্রভাব চলতি অর্থবছরের পাশাপাশি সামনের পুরো অর্থবছরই থাকবে ধরে নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে।’

বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে এলএনজি, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল, এলপিজি ও কয়লা রয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানির ২৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। জৈব জ্বালানির পরিমাণ ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ, কয়লা (আমদানীকৃত) ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, জীবাশ্ম জ্বালানি ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ, এলএনজি ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ, বিদ্যুৎ (আমদানি) ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, এলপিজি ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে ২ শতাংশ জ্বালানি।

স্থানীয় উৎস থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস উত্তোলন করতে না পারায় চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। ২০১৮ সালে কাতার ও ওমানের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্পট মার্কেটের মাধ্যমেও এলএনজি আমদানি শুরু হয়। এলএনজি আমদানির বিপরীতে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ গুনতে হয় সরকারকে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুসারে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরে এলএনজি কেনায় ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।

জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত অর্থ নিজস্ব উৎস থেকে ব্যয় হলে সেটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর আরো চাপ তৈরি হবে। ফলে বিদ্যমান বাস্তবতায় অর্থের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানির জন্য বাড়তি যে ব্যয় হবে, সেজন্য যাতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বেশি চাপ না পড়ে সে কারণে আমাদের অতিরিক্ত উৎস খোঁজাটাই ভালো। সে হিসেবে সরকারের এ কৌশল ঠিক আছে। কীভাবে সহজ শর্তে ও নমনীয় সুদে ঋণ পাওয়া যায় সে চেষ্টা করতে হবে। জ্বালানি সংগ্রহের বাড়তি ব্যয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যদি বেশি চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে কিন্তু আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হারসহ সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সুতরাং এসব দিক বিবেচনায় যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অর্থ আনা যায়, তাহলে অতিরিক্ত উৎস হিসেবে সেটি ভালো হবে।’

অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে সহায়তার বিষয়ে ইতিবাচক। সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়তা করার কথা জানিয়েছে। চলতি অর্থবছরে এডিবির কাছ থেকে ২৫ কোটি ও ৫০ কোটি ডলারের দুটি বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। এখন ৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তাটিকে বাড়িয়ে ৭৫ কোটি ডলার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এতে সংস্থাটির কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও অর্থ সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মিলবে বলে মনে করছে সরকার।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.