Saturday, May 2, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপে পরিকল্পনা জরুরি: ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in সময়ের আলো on 5 April 2026

সংকট মোকাবিলায় আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় কমানোর পরামর্শ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঘিরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের যে সংকট দেখা দিয়েছে তার ধাক্কা লেগেছে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সংকটও তত গভীর হচ্ছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। ধীরে ধীরে শিল্পকারখানায় উৎপাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এর পর জ্বালানি সংকটের প্রভাবে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের আবাদও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সেটি হলে দেশের খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেবে।

এই অবস্থায় কৃচ্ছ্রসাধনই হতে পারে রক্ষকবচ। সংকট মোকাবিলায় দেশের নতুন সরকারকে একদিকে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাসহ বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়িক পরিবেশ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করারও মত দিচ্ছেন তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ যাতে ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকটাতেও সরকারকে নজর দিতে হবে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, আমরা যারা উদ্যোক্তা তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে একটি নির্বাচিত স্থিতিশীল সরকারের অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ স্থিতিশীল সরকার ছাড়া দেশে বিনিয়োগ বাড়ছিল না, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হচ্ছিল না। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল না। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম- এবার হয়তো ব্যবসার ভালো পরিবেশ তৈরি হবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নতুন সরকার ক্ষমতায় বসার পরপরই শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের কারণেই দেশের জ্বালানি খাতে মহাসংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি খাতে অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ইতিমধ্যেই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এই যুদ্ধ নতুন সরকারের যেমন বড় একটা ধাক্কা, তেমনই আমরা যারা ব্যবসায়ী তাদের জন্যও বড় ধাক্কা। তাই আমি মনে করি, যুদ্ধ যাতে দ্রুত বন্ধ হয় তার জন্য অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারেরও সোচ্চার হওয়া দরকার। কূটনৈতিক চ্যানেলে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলাপ করতে পারে সরকার। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিকভাবে সবার আগে ক্ষতির মুখে পড়ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো।

চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণ ও অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য করণীয় সম্পর্কে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সোর্স থেকে দ্রুত তেল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। আর ভঙ্গুর যে অর্থনীতি এখন দেশে তা চাঙ্গা করতে সবার আগে ব্যাংকিং খাত ঢেলে সাজাতে হবে। কারণ ব্যাংকিং খাতের ভুল পলিসির কারণে ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া এনবিআরের বেশ কিছু পলিসি পরিবর্তন করতে হবে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহিমদা খাতুন বলেন, সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আগেভাগে নিশ্চিত করা। উচ্চ মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সংগ্রহের প্রেক্ষাপটে আমদানি পরিকল্পনাকে তিনটি সুস্পষ্ট ধাপে ভাগ করা জরুরি। প্রথমত, আগামী এক থেকে তিন মাসের জন্য তাৎক্ষণিক স্বল্পমেয়াদি কার্গো নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ৬ থেকে ১২ মাসের জন্য মধ্যমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, পরিস্থিতি আরও অবনতির ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে জরুরি মজুদ বা কন্টিনজেন্সি ব্যবস্থা রাখা।

এ ক্ষেত্রে আমদানির কৌশলকে তাৎক্ষণিক বাজারের সুযোগনির্ভর পদ্ধতি থেকে সরে এসে একটি সুপরিকল্পিত পোর্টফোলিও-ভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তর করা প্রয়োজন। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি, তথা সব ক্ষেত্রেই পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে বহুমুখী সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ দিতে হবে, যাতে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের সময়সীমা বাস্তবসম্মত হয়। একই সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা ব্যবস্থাপনায় একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। যেসব খাতে অর্থনৈতিক অবদান তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে ব্যবহার কমাতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্প, খাদ্য উৎপাদন, সার উৎপাদন, সেচ ও নগর গণপরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একটি স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক অস্থায়ী রেশনিং-ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে সরকারি ভবনের কার্যঘণ্টা কমানো, সরকারি যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা, অলংকারমূলক আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি বণ্টনের একটি সুসংহত পদ্ধতি চালু করা।

আরেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, যেকোনো সংকটের সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভেবেচিন্তে নিতে হবে। সংকটের সময় যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা হলে সংকট আরও বেড়ে যায়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, যুদ্ধের কারণে দেশের যে জ¦ালানি সংকট দেখা দিয়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার সেগুলো ভালো সিদ্ধান্ত। সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো যেমন দরকার ছিল, ঠিক তেমনই সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, এই সংকটকালীন অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সতর্ক থাকা। গুরুত্বপূর্ণ আমদানির জন্য রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে হবে। একই সময়ে টাকার মান ধরে রাখতে অতিরিক্ত ডলার বিক্রির মাধ্যমে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ না করে বিনিময় হারকে ধীরে ধীরে সমন্বয় হতে দিতে হবে। এর লক্ষ্য হবে বিনিময় হারকে স্থির না রেখে বাজারে অস্থিরতা কমানো। একই সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ পুনর্গঠন করা। জ্বালানি সংকটের সময় বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দের ক্ষেত্রে জ্বালানি, সার, খাদ্য, ওষুধ ও রফতানি-সংশ্লিষ্ট কাঁচামালকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, বিদ্যুৎ, সেচ ও সারের খরচ বাড়ায়, যা পরে খাদ্য ও সেবার দামে প্রতিফলিত হয়। এ পরিস্থিতিতে যদি মুদ্রানীতি শিথিল করা হয়, তা হলে মজুরি বৃদ্ধির চাপ, মূল্য নির্ধারণের আচরণ এবং ঋণ সম্প্রসারণ মিলে মূল্যস্ফীতির স্থায়িত্ব বাড়তে পারে। এ কারণে সুদের হার স্থির বা কিছুটা কড়াকড়ি রাখা প্রবৃদ্ধি দমন করার জন্য নয়, বরং স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতির যৌথ সংকট বা স্ট্যাগফ্লেশন প্রতিরোধের জন্য অপরিহার্য।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী নেতা ও বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে এহসান শামীম সময়ের আলোকে বলেন, এই সংকটের সময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে সরকারের ব্যয় কমাতে হবে, রাজস্ব বাড়াতে হবে। ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সরকার চাইলেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কমাতে পারবে না। তাই সরকারি সেবার অনেক সার্ভিস বেসরকারিকরণ করা দরকার আস্তে আস্তে। বেসরকারিকরণ করলে সেবা ভালো পাওয়া যাবে, ঘুষ-দুর্নীতি কমবে এবং সরকারের ব্যয়ও কমবে। অন্যদিকে সরকারকে রাজস্ব বাড়াতে হবে। এটি করতে হলে ব্যবসায়ী পরিস্থিতি ভালো করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়িক লেনদেন বাড়লে, বিনিয়োগ বাড়লে সরকারের আয় বেড়ে যাবে। তাই সরকারকে এ বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চোধুরী পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, জ্বালানি সংকট রাজস্বনীতি, বৈদেশিক খাত ও মুদ্রানীতি- এই তিনটি ক্ষেত্রেই একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। চলমান যুদ্ধ আগে থেকেই ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়া, মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স প্রবাহে এখনও ঊর্ধ্বগতি বিরাজমান থাকলেও আগামী দিনের জন্য শঙ্কা এবং রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা আগামী দিনে দেশের অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করবে। তাই সরকারকে সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদেক্ষেপ নিতে হবে। দেশে এখন জ্বালানির সঠিক তথ্য নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি হচ্ছে। কখনো শোনা যাচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেছে, কখনো শোনা যাচ্ছে আর মাত্র দশ দিনের জ্বালানি তেল আছে। এসব তথ্য দেশের মানুষের মধ্যে যেমন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তেমনই আমরাও বিভ্রান্তিতে পড়ছি। তাই এই সময় কোনো বিভ্রান্তি নয়, সঠিক তথ্য যেন জাতির সামনে তুলে ধরা হয়।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.