Thursday, February 26, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

ডলার পাচার হচ্ছে কিনা, তা সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখতে পারে – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in সমকাল on 27 July 2022

হজযাত্রার জন্য ডলার কেনার ডামাডোল অনেক আগেই শেষ। সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের বিদেশযাত্রায় লাগাম টানা। করোনা-পরবর্তী এ সময়ে বিদেশ ভ্রমণে অনেক ঝক্কি; আছে বিধিনিষেধও। তবু ডলারের বাজারে আগুন। মানি চেঞ্জার এবং খোলাবাজারে অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েই চলেছে ডলারের চাহিদা। এক দিনের ব্যবধানে গতকাল মঙ্গলবার ৮ টাকা বেড়ে দেশের খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১১২ টাকায়, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ দর।

খোলাবাজারে গেল কয়েক দিনে বেশ বড় অঙ্কের ডলার কেনার চাহিদা আসছে, যা মানুষের ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, এত ডলার যাচ্ছে কোথায়, ডলার কি পাচার হচ্ছে? পাচারের বিষয়ে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া না গেলেও বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে কিছু মানুষ ডলার কিনছেন বলে সংশ্নিষ্টরা ধারণা করছেন।

জানা গেছে, সাধারণত বিদেশে ভ্রমণ, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচের জন্য মানুষ খোলাবাজার কিংবা ব্যাংক থেকে ডলার কেনে। ব্যাংকে গতকাল নগদ ডলার ৫ টাকা বেড়ে ১০৬ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এর আগে গত রোববার খোলাবাজারে দর আড়াই টাকা বেড়ে ১০৫ টাকায় ওঠে। এ বাজারে প্রথমবারের মতো ১০০ টাকার ঘর পেরিয়ে যায় গত ১৭ মে। এরপর আবার কমে আসে। গত ১৭ আগস্ট ফের ১০০ টাকা অতিক্রম করে।

মানিচেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ কে এম ইসমাইল হক সমকালকে জানান, গত কয়েক দিন ডলারের ব্যাপক চাহিদা দেখা দিয়েছে। গতকাল ১১২ টাকা পর্যন্ত ডলার বিক্রি হয়েছে। এভাবে দর কেন বাড়ছে- সেটার সুনির্দিষ্ট কারণ তাঁদের জানা নেই। তবে দর আরও বাড়বে ভেবে অনেকে হয়তো ডলার মজুত রাখছেন। পাচার বা অন্য কিছু ঘটছে কিনা, সে বিষয়ে ধারণা নেই।

দেশে অনুমোদিত মানিচেঞ্জার ৬০২টি, এর মধ্যে ২৩৫টির বৈধতা আছে। বাকিগুলোর লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল রয়েছে। মানিচেঞ্জারের দৈনন্দিন কেনাবেচার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হয়। তবে অনেক মানিচেঞ্জার এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে থাকে, যারা প্রতিষ্ঠানের বাইরে গ্রাহকের কাছ থেকে ডলার কেনাবেচা করে। এ ধরনের লেনদেন অবৈধ।

জানা গেছে, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়া কিছু মানিচেঞ্জার ডলারের অবৈধ ব্যবসায় নেমেছে। মানিচেঞ্জারের বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ের অবৈধ লেনদেনে কোনো কাগজপত্র লাগে না। এ রকম কয়েকজন বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা বড় অঙ্কের ডলার কেনার অর্ডার পাচ্ছেন। এক কর্মী জানান, এক ক্রেতা ২০ হাজার ডলার কেনার অর্ডার দিয়ে ধাপে ধাপে দিচ্ছেন। কেউ কেউ আগাম টাকা নিয়ে পরে ডলার দিচ্ছেন।

ক্রেতাদের সবাই বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা, সভা-সেমিনারে অংশ নিতে যাওয়ার জন্য এই ডলার কিনছেন, তেমন নয়। তাঁদের ধারণা, ব্যাংকিং খাতে কড়াকড়ির কারণে একশ্রেণির ব্যক্তি ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে নগদ ডলার কিনছেন। আরেক শ্রেণি শেয়ারবাজারের মতো ডলারে বিনিয়োগ করছে। সঞ্চয়পত্রে কড়াকড়িসহ বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ দুর্নীতির টাকায় ডলার কিনে রাখছেন। ডলার পাচারও হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সমকালকে বলেন, সাধারণত সংকটের সময় কিছু মানুষের মধ্যে কোনো কিছু বেশি করে কিনে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তাঁর ধারণা, ডলারের খোলাবাজারে এমনটি ঘটতে পারে। কিছু মানুষ হন্যে হয়ে ডলার কিনছে। তাঁদের ধারণা, দাম আরও বাড়বে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে অর্থ পাচার বাড়ে বলে ধারণা করা হয়। ডলার পাচার হচ্ছে কিনা, তা সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখতে পারে। আমদানি ও রপ্তানির মূল্য কমবেশি দেখিয়ে অর্থ পাচারের প্রবণতা বিশ্বজুড়ে রয়েছে। বাংলাদেশে এখন খোলাবাজারে ডলারের দরের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পাচারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আমদানি ব্যাপকভাবে বাড়ার কারণে ডলারের চাহিদা অনেক বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ডলার সরবরাহ করতে না পারায় দর বাড়ছে। তিনি বলেন, আমদানি এত বাড়ার পেছনে অর্থ পাচার অনেকটাই দায়ী। কেননা প্রচণ্ডভাবে ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে। পরিস্থিতি ঠিক রাখতে হলে কঠোরভাবে আমদানি তদারকি করতে হবে। তা না করতে পারলে ডলার পাচার ঠেকানো যাবে না।

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আমদানি বা রপ্তানিতে যথাযথ মূল্য না দেখিয়ে অনেকে অর্থ পাচার করেন। ঘোষিত অর্থের বাইরে যে অঙ্ক থাকে, তা সাধারণত তৃতীয় দেশের মাধ্যমে টিটির মাধ্যমে পরিশোধ হয়।

ব্যাংকের পরিস্থিতি :ব্যাংকিং চ্যানেলে বেশ কিছুদিন ধরে ডলারের দর বাড়ছে। ব্যাংকগুলোর আমদানি দায় মেটাতে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ডলার বিক্রি করছে, সেই দরও মাঝেমধ্যে বাড়াচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫ কোটি ডলার বিক্রি করেছে ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা দরে। এই দরে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রির কথা। তবে আন্তঃব্যাংকে লেনদেন হচ্ছে না বললেই চলে। সাধারণত বাড়তি ডলার থাকলে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে।
এদিকে, ডলার সংকট বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক বড় এলসি খুলতে চাইছে না। বেসরকারি একটি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, তাঁরা আপাতত এলসি খোলা বন্ধ রেখেছেন। আরেকটি ব্যাংকের একই পদের কর্মকর্তা জানান, আমদানি নিরুৎসাহিত করার কিছু উদ্যোগ থাকলেও তার প্রভাব সীমিত। মূল বিষয় হলো আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে একই পরিমাণ পণ্য আমদানির জন্য এখন বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে। যদিও সম্প্রতি কিছু পণ্যের বেড়ে যাওয়া দর কিছুটা কমেছে। তবে তা গত বছরের চেয়ে বেশি। আর এ কমার প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে।

খোলাবাজারের মতো ব্যাংকেও নগদ ডলারের দর অনেক বেড়েছে। আইএফআইসি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গতকাল নগদ ডলার বিক্রির দর দেওয়া হয় ১০৬ টাকা। আর কিনেছে ১০৪ টাকায়। আগের দিন ১০০ টাকায় কিনে ১০১ টাকায় বিক্রি করেছিল। ব্র্যাক ব্যাংক গতকাল নগদ ডলার ১০২ টাকা ৯৫ পয়সায় বিক্রি করেছে। ইস্টার্ন ব্যাংক বিক্রি করেছে ১০১ টাকায়। অবশ্য নগদ ডলারের চেয়ে ব্যাংকে আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে দর এখন বেশি। সাধারণভাবে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য সঙ্গে করে অনেকে নগদ ডলার নিয়ে যান। অন্য ক্ষেত্রে এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হয়।

কেন এই পরিস্থিতি :বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে পর্যন্ত আমদানিতে খরচ হয়েছে ৭ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার। একই সময় পর্যন্ত রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৮ কোটি ডলারের মতো। এতে করে প্রথম ১১ মাসে রেকর্ড ৩ হাজার ৮২ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রায় ১৬ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯১৯ কোটি ডলারে নেমেছে। সব মিলিয়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ১৭ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। বিপুল এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকগুলো ছুটছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার বিক্রি করে। এই অর্থবছরের এক মাস না পেরোতেই বিক্রি করা হয়েছে আরও ৯৪ কোটি ডলার। যে কারণে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করা রিজার্ভ এখন ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে।

নেওয়া হয়েছে যেসব উদ্যোগ :আমদানি খরচ কমাতে গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, স্বর্ণসহ ২৭ ধরনের পণ্যের এলসিতে শতভাগ মার্জিন নির্ধারণ করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, জ্বালানিসহ কিছু পণ্যের বাইরে অন্য ক্ষেত্রে মার্জিনের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রে আমদানিতে কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া ডলারের খরচ কমাতে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প খরচ কাটছাঁট ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে লাগাম টানা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ সাশ্রয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন নির্দেশনা। বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ব্যাংক ও রপ্তানিকারকের ডলার ধারণের ক্ষমতা কমানো হয়েছে। রপ্তানি আয় আসার এক দিনের মধ্যে ডলার নগদায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইডিএফ থেকে নেওয়া ঋণ কেবল রপ্তানি আয় বা জমা থাকা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে করোনার সময়ে দেওয়া শিথিলতার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আবার বিদেশে আটকে থাকা ১৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল এবং দায় পরিশোধ হলেও দেশে না আসা ৮৮০ কোটি ডলারের পণ্য দ্রুত আনার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এসবের ইতিবাচক প্রভাব কিছুদিনের মধ্যে পড়বে বলে ধারণা করছেন ব্যাংক-সংশ্নিষ্টরা।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.