Monday, March 16, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে — ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in প্রথম আলো on 14 March 2026

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

জ্বালানি–নিরাপত্তায় নিজস্ব সম্পদ আহরণে জোর দিতে হবে

আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি–নিরাপত্তায় হুমকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেন, জ্বালানি–নিরাপত্তায় নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারে জোর দিতে হবে। বঙ্গোপসাগরসহ দেশের যেসব স্থানে তেল-গ্যাসের সম্ভাবনা আছে, সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে হবে। এ ছাড়া যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অধিকাংশ সময় অলস বসে থাকে, সেগুলো বাতিল করতে হবে।

আজ শনিবার রাজধানীর পান্থপথে অনলাইন নিউজপোর্টাল ঢাকা স্ট্রিমের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট: ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো উঠে আসে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ঢাকা স্ট্রিম যৌথভাবে এর আয়োজন করে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জ্বালানির সঙ্গে কৃষির সরাসরি সম্পর্ক। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচের খরচ বাড়ে, সারের দাম বাড়ে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। জ্বালানি নীতি করার সময় কৃষক ও নারীদের কথা মাথায় রাখতে হবে। জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে আবার সেবা খাত হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। সরকারে থাকতেই তিনি মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি সমর্থন করেননি বলে জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, বিগত দিনে ক্যাপাসিটি চার্জের (কেন্দ্রভাড়া) নামে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। যাঁরা এই চুক্তির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের খুঁজে বের করতে হবে। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র সব সময় বসে থাকে, সেগুলো বাতিল করা দরকার। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম অনেক বেড়েছে, আমদানি করাও কঠিন হতে পারে। এটিকে দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও ব্যবহারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

রাজনীতি ঠিক না থাকলে কোনো খাতই ঠিক থাকে না মনে করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি খাতকে লুটপাটের আখড়া বানিয়েছিল। জ্বালানি অপরাধীদের বিচার হতে হবে। আদানি চুক্তির মতো দেশবিরোধী চুক্তিগুলো কেন এখনো বাতিল করা হচ্ছে না? ক্ষমতা ছাড়ার তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে গেল অন্তর্বর্তী সরকার। এখন রাশিয়া থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমোদন নিতে হয়। এত বড় ম্যান্ডেট নিয়েও বিএনপি সরকারকে কেন এটা করতে হবে?

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের যে ভূত, সেটা ঘাড়ে চেপে বসেছে। ভর্তুকি যেন অপচয় না হয়। উৎপাদনসক্ষমতা অনেক হয়েছে, বিতরণ ও সঞ্চালনে গুরুত্ব দিতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে অর্ধেক খরচে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি রূপান্তরের বিবেচনায় বরাদ্দ ঠিক করতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে নয়, দলের পক্ষ থেকে এখানে কথা বলছেন বলে জানান বিএনপির চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, গত এক মাসে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বেশ কিছু বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ইশতেহার থেকে নির্বাচনের আগে আটটি মূল বিষয় ছিল বিএনপির প্রচারে। এর একটি হলো পরিবেশ, যেখানে জ্বালানির বিষয়টি আছে। ক্যাবের ১৩ দফার অনেকগুলো বিএনপির জ্বালানি নীতির সঙ্গে মেলে। এখনই হয়তো পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি করা যাবে না। তবে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। আদানিসহ যত অন্যায্য চুক্তি হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। নীতিগতভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখা হবে।

দেশের নিট গার্মেন্টসের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি এ কে এম ফজলুল হক বলেন, জ্বালানি খাতে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সেই ধারার সূচনাটা হয়নি। নতুন সরকার এসেই অপ্রত্যাশিতভাবে জ্বালানিসংকটের মধ্যে পড়েছে। এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে পারে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের চরম সংকট চলছে।

গবেষক ও লেখক মাহা মির্জা বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাওয়ার পর সেটি থেকে বের হয়ে আসা বা বাতিল করা যে কত কঠিন, আদানি চুক্তি হচ্ছে তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। এমন উন্নয়ন মডেলে যেতে হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো বিদেশি বা ব্যবসায়িক লবি যেন কাজ না করে।

জ্বালানিসংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগে পরিবহন খাত উল্লেখ করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী বলেন, সরকার বলছে, জ্বালানি তেল আছে; ফিলিং স্টেশন তেল দিচ্ছে না। কেউ কেউ অবৈধ বাণিজ্য করছে, এটা সরকারকে দেখতে হবে।

ক্যাবের লিখিত বক্তব্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পরিস্থিতি তুলে ধরে ১৩ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাতের বদলে সেবা খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমানো এবং নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌরবিদ্যুৎ) ব্যবহার বৃদ্ধি, কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিল বা নবায়ন না করা। এ ছাড়া উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও লুটপাটের বিচার করা এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, দেশি গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোসহ বিইআরসিকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার দাবিও ছিল।

স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের স্বার্থকেন্দ্রিক যে তৎপরতা, তাদের কথা বলে যেতে চায় ঢাকা স্ট্রিম।

অনুষ্ঠানের শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া এবং ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কর্নেল (অব.) সোহেল রানা। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ক্যাবের গবেষণা সমন্বয়ক শুভ কিবরিয়া। গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা করেন ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুন।

এতে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহসভাপতি জাকির হোসেন, ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মো. মহিউদ্দিন, ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান প্রতিবেদক মাসুম বিল্লাহ।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.