Tuesday, March 10, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

নারীর অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি পেলে নীতিনির্ধারণ হবে আরও বাস্তবভিত্তিক — ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in দেশ রূপান্তর on 8 March 2026

নারীর অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি কোথায়

চারজন নারী সন্তানের স্কুলের ওয়েটিং রুমে বসে গল্প করছেন। গল্পের এক পর্যায়ে কে কী করেন। এর উত্তরে একজন জানালেন ব্যাংকার, একজন উদ্যোক্তা আর দুজন কিছুই করেন না। তাদের এই উত্তর নিয়ে আসলে ভাবতে হয়। যে সব নারী ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করেন না আসলে তারা কি কিছুই করেন না।

অথচ একটা পরিবারে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করতে হয় গৃহিণী নারীকে। এই তালিকায় থাকে বাজার করা, রান্না, ঘর পরিষ্কার, শিশু ও বয়স্কদের দেখাশোনা, পরিবারের ব্যবস্থাপনা আরও অনেক কিছু। নারীর এই শ্রম পরিবার ও সমাজকে টিকিয়ে রাখলেও অর্থনীতির পাতায় তার অস্তিত্ব নেই। অথচ এই অদৃশ্য শ্রমই পরিবারকে সচল রাখে, কর্মজীবী মানুষের শ্রমশক্তি পুনর্গঠন ও দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করে। বর্তমানে নারীর অদৃশ্য শ্রমের মূল্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে।

অদৃশ্য শ্রমের পরিসংখ্যান : গৃহস্থালি ও পরিচর্যা খাতে যে শ্রম হয় তার মূল্য কম নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় দেখা যায়, এই শ্রমের মূল্য প্রায় ৬.৭ কোটি টাকা, যা দেশের মোট উৎপাদনের ১৮ থেকে ১৯ শতাংশের সমান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই অদৃশ্য শ্রমের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই করেন নারীরা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা মজুরি ছাড়া গৃহস্থালির কাজ করেন। অন্যদিকে পুরুষেরা গড়ে দৈনিক দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কাজ করেন। নারীরা পুরুষের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি শ্রম দিচ্ছেন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় অর্থনীতির বড় অংশ কার্যত নারীর অদৃশ্য শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। নারীর এই শ্রমকে অর্থনৈতিক হিসাবে নিলে দেশের জিডিপির চিত্র বড় হতো। অদৃশ্য শ্রমের অর্থমূল্য যোগ করলে জাতীয় অর্থনীতির আকার ১৩ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। পরিবারের অন্য সদস্যরা কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীল হতে পারেন মূলত এই অদৃশ্য শ্রমের কারণেই।

উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা : বিশ্বের অনেক দেশ অদৃশ্য শ্রমের মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে নিয়মিত টাইম ইউজ সার্ভে পরিচালনা করেন, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন কাজের সময় হিসাব রাখা হয়। কানাডা ও নিউজিল্যান্ডে ‘হাউজহোল্ড স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ তৈরি করে নারীর গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সরকারি রিপোর্টে নারী শ্রমের অবদানকে পরিমাপ এবং নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা হয়েছে। সুইডেন ও নরওয়েতে গৃহকর্মকে সামাজিক সেবা হিসেবে দেখা এবং বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব জুড়ে নারীরা প্রতিদিন প্রায় ১২ বিলিয়ন ঘণ্টারও বেশি অবৈতনিক শ্রম দেন। যার সম্ভাব্য অর্থমূল্য বছরে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার।

কী করা যেতে পারে

নারীর অদৃশ্য শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজ ও পরিবারের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। গৃহস্থালি কাজকে শুধু নারীর দায়িত্ব না দেখে যৌথ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা। শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো। গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ এবং নীতিনির্ধারণে বিষয়টি গুরুত্ব পেলে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি বাড়বে এবং লিঙ্গসমতা তৈরি হবে। সরকার নিয়মিত গৃহস্থালি ও যতœমূলক কাজের সময় পরিমাপ করে তার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করবে। পরিবার এবং সমাজে নারীর এই শ্রমকে সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সচেতনতা ও প্রচার বাড়াবে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, নারীরা যেসব গৃহস্থালি কাজ, সন্তান ও পরিবার যত্ন, অভ্যন্তরীণ পরিচর্যা, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি বিনা মজুরিতে করছেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় এক-দুই ভাগের সমপরিমাণ হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এই অবদানকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। যদি নারীর অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে নীতিনির্ধারণকারীরা সামাজিক সেবা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে আরও বাস্তবভিত্তিক বাজেট ও কর্মসূচি তৈরি করতে পারবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বীকৃতি পেলে নারীর অবদান সমাজে আরও সম্মানজনক হবে এবং লিঙ্গবৈষম্য হ্রাস পাবে। পরিবারে এবং সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন পাওয়ার ফলে নারীরা আত্মমর্যাদা অনুভব করবেন, যা মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হবে।’

বাংলাদেশেও অদৃশ্য শ্রমকে গুরুত্ব দিয়ে কিছু পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত সময় ব্যবহারের জরিপ চালু করা। গৃহস্থালি ও পরিচর্যা খাতের স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরি করা। গৃহিণীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বা পেনশন সুবিধা দেওয়া। শিশু ও বয়স্কদের জন্য ডে কেয়ার ও পরিচর্যা কেন্দ্র বাড়ানো। গৃহস্থালি কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নারীর অদৃশ্য শ্রম গুরুত্ব পাবে এবং অর্থনীতিতে তাদের অবদান আরও দৃশ্যমান হবে। অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার এবং লিঙ্গসমতার নীতিনির্ধারণ সহজ হবে।

পরিশেষ

বাংলাদেশের অর্থনীতির এক বড় ভিত্তি রয়েছে ঘরের ভেতরে। প্রতিদিন অসংখ্য নারী যে শ্রম দেন, তা দৃশ্যমান না হলেও দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নারীর অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়; টেকসই উন্নয়ন ও সমতার সমাজ গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.