Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 2 November 2026
পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয়, মজুরি হারে তলানিতে বাংলাদেশ

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। টানা কয়েক বছর ধরে এ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। অথচ যাদের পরিশ্রমে এ খাতটি দাঁড়িয়ে আছে তারা যথাযথ পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা মজুরি পান প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে তা বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি পান শুধু শ্রীলঙ্কার পোশাক শ্রমিকরা।
অন্যদিকে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে চীন ও তুরস্কের শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক অনেক বেশি। এছাড়া দেশগুলো নিয়মিতভাবে মজুরি সমন্বয় বা বৃদ্ধি করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বিভিন্ন দেশের তথ্য ঘেঁটে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
দেশভিত্তিক মজুরির তুলনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা যা ডলারের হিসাবে প্রায় ১০১ ডলার। এশিয়ার কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় এ মজুরি বেশ কম। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি শুধু শ্রীলঙ্কায়। দেশটির পোশাক খাতে শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৯০ ডলার। আর বাংলাদেশের কাছাকাছি মজুরি রয়েছে উজবেকিস্তানের। দেশটিতে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০৬ ডলার।
বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি গড়ে ১৪৫ ডলার, ভিয়েতনামে ১৭৫ ডলার, ভারতে ১৯২ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২১০ ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২২২ ডলার ও চীনে ৩৩৭ ডলার। তবে এ খাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ন্যূনতম মজুরি তুরস্কে ৬৬২ ডলার। এ অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরির পার্থক্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
যদিও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫ অনুযায়ী, টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তৃতীয় স্থানে থাকা ভিয়েতনামের তুলনায় তা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বেশি। অথচ দেশটির শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি।
যদিও দেশভিত্তিক মজুরির এই তুলনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতিও বিবেচনার বিষয়। কারণ সব দেশে পোশাক শ্রমিকদের জন্য একই ধরনের জাতীয় মজুরি কাঠামো নেই। কোনো দেশে অঞ্চলভিত্তিক, কোনো দেশে প্রদেশভিত্তিক আবার কোনো দেশে নির্দিষ্ট শিল্প খাতের জন্য আলাদা মজুরি নির্ধারণ করা হয়।
চীনে সারা দেশের জন্য একই সময়ে অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় না। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও শহর নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করে। ২০২৫ সালেও বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রেও রাজ্য ও কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি ভিন্ন। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল দেশটিতে কেন্দ্রীয় শ্রমক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা বা ভেরিয়েবল ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স (ভিডিএ) সংশোধন করা হয়েছে।
পাকিস্তানেও প্রদেশভেদে মজুরির পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সিন্ধু প্রদেশে ৪৩ হাজার রুপি ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয়েছে। অন্য প্রদেশে মজুরির হার আলাদা। ইন্দোনেশিয়ায় প্রদেশ ও জেলাভিত্তিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে কম্বোডিয়ায় পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য প্রতি বছর মজুরি আলোচনা ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। ভিয়েতনামেও একই দিন থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। তুরস্কে সাধারণত প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
শুধু মজুরির পরিমাণ নয়, কত সময় পরপর শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেখানেও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। চীনে অঞ্চলভেদে সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে মজুরি সমন্বয়ের প্রবণতা রয়েছে। ভিয়েতনামে সাধারণত এক থেকে দুই বছর পর মজুরি পর্যালোচনা করা হয়। কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কে সাধারণত প্রতি বছর মজুরি পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে আইনগতভাবে মজুরি পর্যালোচনার সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হলেও পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা ছয় মাস অন্তর সমন্বয় হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণত তিন বছর পর নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের বিধান রয়েছে। যদিও তা অনেক সময় বিলম্বিত হয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নতুন মজুরি কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ফলে প্রায় তিন বছর পর আবারও নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরস্ক ও শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও চীনে নিয়মিত অঞ্চলভিত্তিক মজুরি সমন্বয় হচ্ছে।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের মজুরি কাঠামোয় তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য চারটি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে গ্রেড-১-এর সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১৫ হাজার ৩৫ টাকা, গ্রেড-২-এর ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা, গ্রেড-৩-এর ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা এবং গ্রেড-৪-এর ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সর্বনিম্ন গ্রেডের ১২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা। এছাড়া বাড়িভাড়া ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৪৫০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ১ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া শিক্ষানবিস শ্রমিকদের জন্য তিন মাসের শিক্ষানবিসকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে তাদের মোট মাসিক মজুরি ৯ হাজার ৮৭৫ টাকা।
ওই মজুরি কাঠামোয় মূল বেতনের ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের বিধান ছিল। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়। অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ মজুরি কাঠামো নির্ধারণের পর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার বাড়লেও নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি। শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলনে তাই শুধু বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নয়, পুরো মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণের দাবি সামনে এসেছে।
এবারের আন্দোলনে শ্রমিকদের একটি বড় অংশের দাবি, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার তুলনায় এই দাবি ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির তুলনায় শ্রমিকরা ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। ডলারের হিসাবে বর্তমান ন্যূনতম মজুরি প্রায় ১০১ ডলার। অন্যদিকে ৩০ হাজার টাকা প্রায় ২৪২ ডলারের সমান। শ্রমিকদের যুক্তি, গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের আয় বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে সংসারের মৌলিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে মালিকপক্ষের উদ্বেগও রয়েছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ক্রয়াদেশের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর পক্ষে একযোগে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নতুন মজুরি নির্ধারণে শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ডেই তথ্য-উপাত্ত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আলোচনা হওয়া উচিত। বোর্ডের সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষ মেনে নেবে। তবে নতুন মজুরি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। কারণ, বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও দর-কষাকষির প্রয়োজন হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপণ্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু অনেক শ্রমিকের আয় দিয়ে এসব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাদের মধ্যে ঋণ, অপুষ্টি ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা করা জরুরি। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, কম মজুরির মাধ্যমে সাময়িকভাবে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমায়, অসন্তোষ বাড়ায় এবং দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। এতে দেশীয় চাহিদা ও শিল্পের প্রতিযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মজুরি বৃদ্ধিকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে শিল্পের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্পকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।


