Monday, March 30, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে প্রবাসী আয়ে ধাক্কা আসছে সামনে – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in খবরের কাগজ on 28 March 2026

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ : তীব্র ঝুঁকিতে দেশের অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি তীব্র ঝুঁকিতে পড়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে, এটি দেশের প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে জ্বালানিসংকটে অনেক পেট্রলপাম্পকে বাধ্য হয়েই বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক কারখানায় কাঁচামালের অভাব দেখা দিলে চাহিদামতো তা আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যা কেনা হচ্ছে তাও বেশি দামে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে পণ্য তৈরি করেও সময়মতো রপ্তানি করা যাচ্ছে না। বিদেশি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নতুন করে ক্রয়াদেশ (অর্ডার) দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে বেশির ভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে। সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কেনার কারণে দেশের বাজারে অনেক জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়েছে। মোটা দাগে, রান্না ঘর থেকে ছোট-বড় শিল্পকারখানা–সব জায়গাতে খরচ বেড়েছে। কৃষি খাতেও খরচ বাড়ার শঙ্কা করছেন অনেকে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সব খাতে খরচ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু তাই নয়, প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, যুদ্ধকালীন সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার তৎপর আছে। অর্থমন্ত্রী সবাইকে সংযত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের অন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, এমন আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতি তীব্র ঝুঁকিতে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এ ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে টালমাটাল, সেখানে যুদ্ধকালীন সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কতটা, কী করা সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অন্যতম সম্মাননীয় ফেলো এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যুদ্ধ হাজার মাইল দূরে হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্মকভাবে পড়েছে। তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। ডলারসংকট বাড়তে পারে। দেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম উৎস মধ্যপ্রাচ্য। প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকে দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার কাছে যতটা আয় ছিল তা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে বলে এখনো প্রবাসী আয়ে গতি কমেনি। প্রবাসী আয়ে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে আরও এক-দুই মাস পর থেকে। যুদ্ধ না থামলে এ ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। রাতারাতি তো আর শ্রমিকদের বিকল্প বাজার খুঁজে বের করা সম্ভব হবে না।’

এই মত জানিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণে এক মাসও পার হয়নি তার মধ্যে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জ্বালানিসংকটে পরিবহন ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের সংকটে ব্যবসাবাণিজ্যে ধস নেমেছে। সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি বাড়বে। যুদ্ধ না থামলে সামনের দিনে কীভাবে সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত কয়েক মাস থেকে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমাদের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব বাড়বে। এই যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারক আমরা এ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের সক্ষমতা কমবে। আমরা আন্তর্জাতিক ক্রেতা হারাব। অনেক ক্রেতা নতুন করে অর্ডার দিচ্ছেন না। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের বাজারে উৎপাদন খরচ বাড়বে, কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রেও খরচ বাড়বে। এভাবে যুদ্ধের কারণে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করতে হয়। তা ছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে এবং এলএনজির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যয় বেড়েছে। এই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন, খাদ্য ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে আমাদের মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা হ্রাসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।’

ব্যবসায়ী এই নেতা আরও বলেন, আমি মনে করি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধুমাত্র একটি বৈদেশিক ইস্যু নয়–এটি সরাসরি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট। দ্রুত ও কার্যকর নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব না হলে এটি দেশের প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, এরই মধ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যই হলো বাংলাদেশের প্রধান আমদানির উৎস। যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। শুধু জ্বালানি না অন্য অনেক পণ্যের সরবরাহও কমেছে।

তিনি আরও বলেন, এশিয়া ও ইউরোপ এবং আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর প্রধান নৌপথ সুয়েজ খাল ইরানের খুব কাছাকাছি। সেখানে এই যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে। যুদ্ধের ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.