Originally posted in খবরের কাগজ on 6 March 2026

সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ। দুর্নীতিতে জড়িত রাজনীতিবিদ, আমলা বা ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরাপত্তা, আস্থা ও ন্যায়বিচার ফিরলেই মানুষ দেশের ভেতরেই অর্থ রাখতে উৎসাহিত হবে। অপরাধী যেই হোক, তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বেছে বেছে কাউকে রেহাই দিয়ে কাউকে দোষী করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।…
নতুন সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার সমান্তরালে শুরু না করলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনাগ্রহ, আইনি জটিলতা এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতার কারণে অনেক উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না। তাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ঘাটতি কাটিয়ে তুলে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকতে হবে। যা হবে তথ্যসমৃদ্ধ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সক্ষম। প্রথম ১৮০ দিনে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক সংস্কার চালু রাখতে হবে। এ উদ্যোগ শুধু মন্ত্রণালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা, সিটি করপোরেশনসহ সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্রুত অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। আমলাতন্ত্রকে আইন-নীতি প্রণয়নকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বাস্তবায়নকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর জরুরি। দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল রূপান্তর, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার- এসব সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সরকার যেন কেবল নির্বাহী শাখার ওপর নির্ভর না করে জাতীয় সংসদকেও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগায়, সেদিকটা দেখতে হবে। সংসদের স্থায়ী
কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাজেট আলোচনার সময় বৃদ্ধি ও খসড়া বাজেটের বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
নির্বাচনি ইশতেহারে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, যমুনা সেতুসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় বৃহৎ বিনিয়োগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত বড় প্রকল্পে অগ্রসর না হওয়াটাই উচিত। একইভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার পরিবর্তে ২০৪০ সাল পর্যন্ত ৩০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতাই যথেষ্ট হতে পারে তবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের প্রশংসা করে যোগ্যতাভিত্তিক উপকারভোগী নির্ধারণে জোর দেওয়া দরকার। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। মধ্য মেয়াদে এই অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হলে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভ্যাটের হার আট স্তর কমিয়ে তিন স্তরে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দুই বা একক হারে আনা, অপ্রয়োজনীয় কর অবকাশ প্রত্যাহার, অনলাইন কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত কর বিরোধ নিষ্পত্তি ইত্যাদি।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা ব্যবসায়ীদের বড় চ্যালেঞ্জে ফেলছে দিয়েছে। কর, ব্যবসা ও ব্যাংক- এ তিন খাতে ন্যায়পাল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার জট, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা, জটিল বিধিবিধান, দুর্বল ব্যাংক খাত ও উচ্চ খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজস্ব বোর্ড, কোম্পানি নিবন্ধক ও কাস্টমসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন এবং বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত গঠন জরুরি বর্তমানে দেশে শ্রমিক অধিকার প্রশ্নে পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি এখনো তুলনামূলকভাবে কম এবং অনেক খাতে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ও ওভারটাইম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন। এর পাশাপাশি প্রায় ৩৫ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে, যা শ্রমবাজারের একটি বড় সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার শ্রম অধিকার, ন্যায্য মজুরি, শ্রম আইন বাস্তবায়ন ও শিশুশ্রম নিরসনে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিকে বৈষম্যমূলক। এতে বাংলাদেশের নীতি-স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এলডিসি-উত্তর রূপান্তর কৌশল বিবেচনায় চুক্তি কার্যকারিতা শুরুর আগে পুনর্বিবেচনা বা বাতিল প্রয়োজন। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ক্ষেত্রেও জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়া বিবেচনায় পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।
বিশেষত, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া না থাকায় অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেখানে নির্বাচন কমিটি ও নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড রয়েছে। বাংলাদেশেও আইনবদ্ধ বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন। সাবেক গভর্নরের সংস্কার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যক।
সর্বোপরি, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে ও পরে তৎকালীন সরকারের এবং দলের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেকে দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে একতরফা নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দমনপীড়ন এবং পরবর্তী সময়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা অনেকের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা হয়তো বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থ পাচারের সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেহেতু এ টাকার অনেকটাই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত, তা দেশের উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামোর মতো খাতে ব্যয় না হয়ে ব্যক্তিগত ভোগে চলে যায়। ফলে রাষ্ট্রের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়। এটি সামাজিক ও নৈতিক ক্ষয় ঘটায়। একজন ব্যক্তির অর্থ পাচার করে পার পাওয়া দেখে অন্যরাও একই পথ অনুসরণে উৎসাহিত হয়। ফলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ। দুর্নীতিতে জড়িত রাজনীতিবিদ, আমলা বা ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরাপত্তা, আস্থা ও ন্যায়বিচার ফিরলেই মানুষ দেশের ভেতরেই অর্থ রাখতে উৎসাহিত হবে। অপরাধী যেই হোক, তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বেছে বেছে কাউকে রেহাই দিয়ে কাউকে দোষী করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
লেখক: ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি


