Tuesday, April 7, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে ধাপ-পদ্ধতিগত পরিকল্পনা জরুরি: ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in প্রথম আলো on 2 April 2026

ফ্যামিলি কার্ডে আগামী অর্থবছরে লাগবে ১৩ হাজার কোটি টাকা

ফ্যামিলি কার্ড | প্রতীকী ছবি

সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) আরও ৪০ লাখ পরিবারের নারীপ্রধানকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেবে। এতে ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

এই টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি (ডিও) পত্র দিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ টাকা কোন খাত থেকে জোগান দেওয়া হবে, সে উপায় খুঁজছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোনো খাত থেকে এই টাকা দেওয়া হবে, নাকি বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভা করার কথা রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই টাকা কোত্থেকে আসবে, সে সিদ্ধান্ত সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেই আসতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ভালো উদ্যোগ। অন্য যেকোনো খাত থেকে কাটছাঁট করে ফ্যামিলি কার্ডের বিপরীতে টাকা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ফ্যামিলি কার্ডে যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত না হন, কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সেলিম রায়হান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এত বড় বাজেট পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। তাই ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীদের একটি ডাটাবেজ করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আওতায় ১০০টির বেশি কর্মসূচি রয়েছে। এসব খাতে সংস্কার আনতে হবে।

অর্থ বরাদ্দ চেয়ে পত্র

গত ৩১ মার্চ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আধা সরকারি পত্র দেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। এই পত্রে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের মূল বাস্তবায়ন শুরু হবে। আগামী অর্থবছরে সারা দেশে ৪০ লাখ পরিবারের নারীপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন।

নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নসহ সামাজিক ন্যায় অর্জনের বিষয়টি বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার বলে আধা সরকারি পত্রটিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, এর অংশ হিসেবে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

গত ১০ মার্চ রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন | ছবি: লাইভ ভিডিও থেকে নেওয়া

বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটি নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। গত ১০ মার্চ রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইলট প্রকল্পে আপাতত ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন।

পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরের অর্থবছরে দরকার হবে আরও ১৩ হাজার কোটি টাকা।

টিআর-কাবিখার বরাদ্দ ফ্যামিলি কার্ডে নিতে আলোচনা

গত ২৫ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা হয়। সভায় টিআর, কাবিখা ও মানবিক সহায়তার টাকা ফ্যামিলি কার্ডে দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও মানবিক সহায়তা খাতে ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

বৈঠকে বলা হয়, টিআর, কাবিখা, মানবিক সহায়তার মতো কার্যক্রমের আন্তপ্রকল্প দ্বৈততা বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈঠকে অন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে দ্বৈততা বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রমকে একীভূত করে একটি দৃশ্যমান কর্মসূচি গ্রহণ করার ওপর বৈঠকে গুরুত্বারোপ করা হয়। বলা হয়, আগামী অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে মোট ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এই কর্মসূচির টাকা থেকে একটি অংশ ফ্যামিলি কার্ডে স্থানান্তর করা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে হবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে বলা হয়, একই ধরনের সহায়তা একাধিক মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়ার ফলে দ্বৈততা তৈরি হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড পুরোপুরি চালু হলে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা সম্ভব হবে, যা এই দ্বৈততা কমাতে সহায়ক হবে।

‘কিছু বিষয় বিবেচনা দরকার’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, এখনো অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা কাটেনি। তাই ফ্যামিলি কার্ড পুরোপুরি চালুর ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, এখন যে ১৪০টির মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে, সেগুলোর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডের সামঞ্জস্য আছে—এমন কর্মসূচি বাদ দেওয়া উচিত। এতে খরচ সাশ্রয় করা যাবে। দ্বিতীয়ত, সবার জন্য একসঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করা যাবে না। তাই নিম্ন আয়ের পরিবারকে প্রথমে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান প্রবৃদ্ধিতে বাজেটে এই ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বরাদ্দ রাখা কঠিন। তাই যেসব খাতে রাজস্ব ফাঁকি বা এড়ানো হয়, তা চিহ্নিত করে সেখান থেকে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা দরকার।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.