Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 1 February 2026

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘স্থগিতাদেশ বা উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার প্রশ্ন। দুঃখজনকভাবে, এই আলোচনার ভিড়ে টেকসই ও মসৃণ উত্তরণ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। অথচ এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আলোচনা যদি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে হয়, তাহলে স্থগিতাদেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে অনুমাননির্ভর বিতর্কে না গিয়ে বরং কীভাবে এই উত্তরণকে নির্বিঘ্ন ও টেকসই করা যায়, সেদিকেই মনোযোগ দেয়া জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্থগিতাদেশ সংক্রান্ত অবস্থান
স্মরণ করা যেতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কার্যকর করার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে কিছু বক্তব্য পরস্পরবিরোধী মনে হচ্ছে। কয়েকজন নীতিনির্ধারক ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছেন, উত্তরণ স্থগিত করলে বাংলাদেশ প্রস্তুতির জন্য কিছু অতিরিক্ত সময় পাবে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখনো পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি, যা থেকে বোঝা যায় যে তারা আগের অবস্থান পরিবর্তন করে উত্তরণ স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য যে, ২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএন-সিডিপি) কাছে বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপোর্ট জমা দেয়। এটি ছিল এলডিসি থেকে উত্তরণকারী দেশগুলোর প্রস্তুতি মূল্যায়নের জন্য গৃহীত এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজমের (ইএমএম) এর অংশ। এই রিপোর্ট এবং সিডিপির নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিডিপি একটি দেশের প্রস্তুতির অবস্থা নিরূপণ করে। যেমনটি জানা আছে, সিডিপির সুপারিশের ভিত্তিতেই দেশগুলোকে জাতিসংঘের ইকোসক ও সাধারণ পরিষদে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ প্রথমবার ২০১৮ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশ (নেপাল ও লাও পিডিআরের সঙ্গে) এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
উল্লিখিত কান্ট্রি রিপোর্টটি এলডিসি থেকে উত্তরণে দেশের প্রস্তুতির অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশ নিজে কীভাবে মূল্যায়ন করছে তার একটি ধারণা প্রদান করে। `Performance of Economy and Preparations for Sustainable Graduation from LDC Status During the Preparatory Period` শিরোনামের এই দেশীয় প্রতিবেদনটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে।
প্রথমত, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য যেসব তিনটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে উন্নয়ননীতি কমিটি (সিডিপি) দেশটিকে উত্তরণের সুপারিশ করেছিল, সেগুলো এখনো পূরণ করে চলেছে।
দ্বিতীয়ত, আসন্ন এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে বাংলাদেশ যে স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) প্রণয়ন করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, এসটিএস বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
প্রতিবেদনটিতে অর্থনীতিকে প্রভাবিতকারী বিভিন্ন ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাধ্যবাধকতা পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ ও পৃথক আচরণ সুবিধা (এস অ্যান্ড ডি টি)-সহ আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো (আইএসএম) হারানোর ফলে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে, সেগুলোর কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
রিপোর্টের ‘ভবিষ্যৎ করণীয়’অংশে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের জন্য আলাদা আলাদা করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো উত্তরণের আগে ও পরে উভয় সময়েই আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে কান্ট্রি রিপোর্টের সুর হলো, গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। অন্যদিকে আগেই বলা হয়েছে, কিছু উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলছেন যে, উত্তরণ স্থগিত করলে বাংলাদেশ আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে।
এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনৈতিক অর্থনীতির দিকটি সহজেই বোঝা যায়। অন্তর্বর্তী সরকার চাইবে না যে তাদের আমলেই বাংলাদেশ নির্ধারিত উত্তরণের পথ থেকে সরে গেল এমন ধারণা তৈরি হোক। এতে তাদের কার্যক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে এবং সমালোচকেরা এটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।
স্থগিতাদেশের পক্ষে যুক্তি
বাংলাদেশের বেসরকারি খাত একক কণ্ঠে, পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, সিভিল সোসাইটি, অ্যাক্টিভিস্ট মহল, থিংক ট্যাংকের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং জনমত গঠনকারীরা যুক্তি দিয়ে আসছেন যে এলডিসি দেশগুলোর তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে আরও কিছু সময় প্রয়োজন। বোধগম্য কারণেই দেশের তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বিজিএমইএ উত্তরণ স্থগিত করার পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়েছে।
মজার বিষয় হলো, যেসব অংশীজন একসময় এই উত্তরণকে তৎকালীন সরকারের একটি অসাধারণ সাফল্য হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তারাই বর্তমানে উত্তরণ স্থগিতের সবচেয়ে সরব সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে উত্তরণের ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব পড়বে। বৈশ্বিক পর্যায়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সুবিধা হ্রাস এবং বাণিজ্য পরিবেশে পরিবর্তনের কারণে এবং অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে কঠোর কমপ্লায়েন্স চাহিদা, শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ম-কানুন, আরও জটিল মান এবং সার্টিফিকেশন প্রয়োজনীয়তা, কঠোর শ্রম-লিঙ্গ-পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বিধান, অধিকতর কঠোর মেধাস্বত্ব প্রয়োগ ব্যবস্থা এবং আরও বহু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হবে। যদি অভ্যন্তরীণ নীতিমালা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নির্ধারিত বিধি ও শৃঙ্খলা (যা এলডিসিভুক্ত নয় এমন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য) লঙ্ঘন করে, তাহলে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিও’র বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থার মুখোমুখি হতে পারে এবং এর পরিণতিতে বাণিজ্য সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনাও থাকবে।
যেমনটি জানা, যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত প্রায় সব উন্নত দেশ এবং বহু উন্নয়নশীল দেশের বাজারে এলডিসি দেশগুলো থেকে আগত তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়। একইভাবে, দেশের ওষুধ শিল্পও ট্রিপস চুক্তি থেকে অব্যাহতির আওতায় পেটেন্ট বা লাইসেন্স সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা ছাড়াই পেটেন্টকৃত ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানির সুবিধা ভোগ করে। ফলে বাণিজ্যিক সুবিধা, বিশেষ ও পৃথক আচরণ সুবিধা (এস অ্যান্ড ডি টি) এবং সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো (আইএসএম) হারানোর বিষয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক।
উল্লেখ্য, উত্তরণ স্থগিতের প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনও কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়নি এবং এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনাতেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না। তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহারে কোনো দল এই প্রসঙ্গে কোনো অঙ্গীকার করবে কিনা বা অবস্থান নেবে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ধারণা করা যায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হলে, শক্তিশালী অংশীজন ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছ থেকে তাদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে, যা নিশ্চয়ই উত্তরণ স্থগিতের পক্ষেই যাবে। যদি সরকার সে ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উত্তরণ স্থগিতের অনুরোধ জানিয়ে জাতিসংঘে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করতে হবে।
এলডিসি উত্তরণ স্থগিতের জন্য আবেদন করা
বাংলাদেশ যদি সত্যিই এলডিসি উত্তরণ স্থগিত করতে চায়, তাহলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্থগিতাদেশের জন্য আবেদন করতে হবে। এই আবেদন উন্নয়ন নীতিবিষয়ক জাতিসংঘ কমিটির (সিডিপি) কাছে বিবেচনার জন্য জমা দেয়া যেতে পারে, অথবা সরাসরি জাতিসংঘে জমা দেয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, ২০২৬ সালের নভেম্বর দ্রুত এগিয়ে আসছে; ফলে স্থগিতাদেশের আবেদন করার সুযোগের সময়সীমা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
যদি বাংলাদেশ কোনো আবেদন না করে, তাহলে সিডিপি নিজ উদ্যোগে উত্তরণ স্থগিতের সুপারিশ করবে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বাংলাদেশ যদি আবেদন করে, তাহলে সিডিপি সেই আবেদন পর্যালোচনা করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছে মতামত দেবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চাইলে সরাসরি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদেও আবেদন করতে পারে। যেকোনো ক্ষেত্রেই, উত্তরণ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিতে হলে সাধারণ পরিষদের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশ যদি স্থগিতাদেশের জন্য আবেদন করে, তাহলে সেই আবেদন হতে হবে সুস্পষ্ট ও শক্ত যুক্তিতে সমর্থিত। কেন এই আবেদন করা হচ্ছে, তার যৌক্তিক ভিত্তি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। যদি একই দিনে উত্তরণ হওয়ার কথা থাকা অন্য দুই এলডিসি দেশ, নেপাল ও লাও পিডিআর উত্তরণ এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে অনেক জাতিসংঘ সদস্য দেশ বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে ভোট দিতে অনিচ্ছুক হতে পারে।
এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশের পক্ষে কোনো শক্ত যুক্তি নেই। বরং বাস্তবতা হলো, এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিশেষ আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থা (আইএসএম) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন চুক্তির আওতায় বিশেষ ও পৃথক আচরণ সুবিধা (এস অ্যান্ড ডি টি) থেকে বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। ফলে এগুলো হারানোর ঝুঁকিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি। এ কারণে টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অন্যান্য গ্র্যাজুয়েটিং এলডিসি দেশের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, আসন্ন গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতা নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এগুলোও উত্তরণ স্থগিতের আবেদনের ক্ষেত্রে বাড়তি যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে।
নেপালের পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন। নেপালের রপ্তানির বড় একটি অংশ উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, কারণ ভারতের সঙ্গে দেশটির দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, আর ভারতই নেপালের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। আবার বাংলাদেশের মতো বড় ও শক্তিশালী দেশীয় ওষুধ শিল্প অন্য কোনো এলডিসি দেশে নেই, নেপালেও নয়। এভাবে যুক্তি বাড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সত্যিই আলাদা এবং অন্যান্য গ্র্যাজুয়েটিং এলডিসি দেশের তুলনায় ভিন্ন ও স্বতন্ত্র।
প্রস্তুতিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি
তবে উত্তরণ স্থগিত নিয়ে আলোচনা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভেতরে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, শেষ পর্যন্ত উত্তরণের দিন আসবেই। যদি ২০২৬ সালে না আসে, তাহলে সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যেই আসবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং আরও কিছু প্রধান দেশ উত্তরণের পর অতিরিক্ত তিন বছর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে প্রস্তুতির জন্য কিছু বাড়তি সময় দেবে। তবে এই সুবিধা কেবল বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে পাওয়া অন্যান্য বিশেষ সুবিধা ও ছাড় (এস অ্যান্ড ডি টি এবং আইএসএম) বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গ্র্যাজুয়েশন যদি স্থগিত করা হয়, তাহলে সেটি কি কঠিন সিদ্ধান্তগুলো আরও পিছিয়ে দেওয়ার অজুহাত হবে? নাকি এই অতিরিক্ত সময় সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে এবং গৃহকর্ম সম্পন্ন করতে কাজে লাগানো হবে? উত্তরণ স্থগিত নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এই প্রশ্নটিই থাকা উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) প্রণয়ন করেছে, সেটি একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা। এই কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরণ টেকসই করার পথে বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে। এসটিএস-এ রয়েছে পাঁচটি মূল স্তম্ভ, ৩০টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র এবং ১৫৭টি নির্দিষ্ট সময়সীমাবদ্ধ কর্মসূচি। প্রতিটি কর্মসূচির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়িত্ব ও জবাবদিহি নির্ধারণ করা আছে। এসটিএস-এর পাঁচটি স্তম্ভ: (১) সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, (২) বাণিজ্য সুবিধা ও রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা অনুসন্ধান ও নিশ্চিত করা, (৩) রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, (৪) উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা, (৫) অংশীদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এই পাঁচটি স্তম্ভের প্রতিটির অধীনে থাকা কার্যক্রমগুলোকে শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
স্মরণযোগ্য যে, অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরণের প্রস্তুতির সার্বিক তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি এসটিএস বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দলও গঠন করা হয়েছে। সরকার, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজন সবাইকে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এবং জরুরি মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে, যাতে উত্তরণের আগে ও পরবর্তী সময়ে এসটিএসের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হয়।
বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে, যখন বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ নীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (ইইউ-সিবিএএম)-এর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কর আরোপ, এসব বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এসব চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করা আরও কঠিন করে তুলবে।
অতএব প্রশ্ন হলো, এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজেকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রস্তুত করবে? কীভাবে রপ্তানিকারক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে (১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে) যে এলডিসি ভিত্তিক বিশেষ সুবিধা ভোগ করে আসছেন, তা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন? এই প্রশ্নগুলোই নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ভাবিয়ে তোলা উচিত।
উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর সিঙ্গেল উইন্ডো ও ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করতে হবে, লজিস্টিকস নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ব্যবসা করার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা নির্ভর করতে হবে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর শুধু শুল্কছাড় ও প্রণোদনার ওপর নয়। কিছু উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও অসম্পূর্ণ বা পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
শেষ কথা
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে এই যে, উত্তরণ টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো করা হলো না, অথচ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণ কার্যকর হয়ে গেল (স্থগিতের আবেদন করা হোক বা না হোক)। এই ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে, বাংলাদেশকে অবশ্যই সময় বেঁধে, লক্ষ্যভিত্তিক ও জোরালোভাবে এসটিএস বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে। উত্তরণ স্থগিত নিয়ে আলোচনা যেন কখনই আমাদের মনোযোগ সরিয়ে না নেয় সেই কাজগুলো থেকে, যেগুলো করলে বাংলাদেশের উত্তরণ মসৃণ, গতিশীল ও টেকসই হবে। স্থগিতের বিতর্ক যেন কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত বা দায় এড়ানোর সুযোগে পরিণত না হয়, বরং বাস্তব প্রস্তুতির ওপরই জোর দিতে হবে।
লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


