বাংলাদেশের দ্বৈত উত্তরণের চ্যালেঞ্জ – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 20 September 2026

বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে। পাঁচ দশক পর ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের কথা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বিশেষ সুবিধা- বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের বাজারসুবিধা হারানোর মতো বিরূপ প্রভাব তৈরি হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ এমন এক সময়ে ঘটছে যখন দেশটি একইসঙ্গে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণের চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করছে। ফলে আগামী দিনগুলোয় এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার কাজ বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এলডিসি মর্যাদা সংশ্লিষ্ট দেশের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের শর্তের ওপর সরাসরি তেমন প্রভাব ফেলে না। তবে কিছু নির্দিষ্ট উৎস থেকে- যেমন এলডিসিদের জন্য বাণিজ্য সহায়তা এবং এলডিসিকেন্দ্রিক জলবায়ু তহবিল-অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এ মর্যাদার গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। কারণ কোনো দেশের ঋণ গ্রহণের শর্ত মূলত দেশটির আয়স্তর অনুযায়ী বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও সেখান থেকে উত্তরণের মানদণ্ডের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক দেশগুলোকে একমাত্র মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বিবেচনায় নিয়ে শ্রেণিবিন্যাস করে। একটি নির্দিষ্ট আয়শ্রেণিতে থাকা এবং নিম্ন আয়শ্রেণি থেকে উচ্চতর আয়শ্রেণিতে উত্তরণের ফলে ঋণের শর্ত এবং রেয়াতি বা সহজ শর্তের অর্থায়ন পাওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সক্ষমতা কম হওয়ায় কী শর্তে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হচ্ছে তা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ (এলআইসি) শ্রেণি থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ (এলএমআইসি) শ্রেণিতে উন্নীত হয়। মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থার- বিশেষ করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা আইডিএর (আইডিএ) মতো ‘সফট লোন উইন্ডো’-সুবিধা থেকে আর আগের মতো ঋণ নেওয়ার যোগ্য থাকেনি। আইডিএর ঋণ অত্যন্ত রেয়াতি শর্তে দেওয়া হতো। যেমন- মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ, সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড এবং সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ছিল।

মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পর বাংলাদেশের মোট ঋণ পোর্টফোলিওতে অ-রেয়াতি বা তুলনামূলক কঠিন শর্তের ঋণের অংশ ক্রমাগত বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এ প্রবণতা আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একসময় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর বড় অংশই ছিল রেয়াতি ঋণনির্ভর। এখন দেশকে মূলত অ-রেয়াতি শর্তে ঋণ নিতে হচ্ছে। আগামীদিনে ঋণের শর্ত আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া কিছু ঋণের বার্ষিক সুদের হার ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে এবং এসব ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ও পরিশোধের মেয়াদও আগের তুলনায় অনেক কম। যেমন- জাপানের ঋণের সুদের হার ২০২০-২১ অর্থবছরের শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা আইডিএর ঋণে আগে মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ বার্ষিক সার্ভিস চার্জ দিতে হতো। বর্তমানে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণও ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক শূন্য শতাংশ বার্ষিক সুদে নিতে হচ্ছে।

ঋণ গ্রহণের শর্তের এই পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, এলডিসি উত্তরণের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ক্রমেই বেশি পরিমাণে বৈদেশিক ঋণের দিকে যেতে হচ্ছে। অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধানির্ভর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা থেকে বেরিয়ে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ও কাঠামোগত পরিবর্তননির্ভর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে আরও বেশি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ সংগ্রহ করতে হবে। এ সম্পদের একটি অংশ আসতে হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং অন্য অংশ বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে।

এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক সরকারি ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ঋণ পরিশোধের দায়ও বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগেও এ পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এ পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য নেওয়া কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পথে। ফলে শিগগিরই এসব ঋণের আসল পরিশোধ শুরু হবে। এ কারণেই আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উচ্চব্যয়ে বেশি পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বাংলাদেশের দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশেরও কম যা উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় পুরোটা অর্থই এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ এখন বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে বাংলাদেশের পরপর কয়েকটি সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এর বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার— যেমন- রাজস্ব নীতিনির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা করা, কর-ব্যয় কমানো-যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা ও ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ; এবং কর আহরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন। ই-রিটার্ন দাখিল উৎসাহিত করা, নগদবিহীন ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনে প্রণোদনা দেওয়া এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগও এর অন্তর্ভুক্ত।

তবে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করবে কর প্রশাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন আনা, করব্যবস্থার সংস্কার, করনীতি প্রণয়ন এবং কর আহরণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করার প্রস্তাব বাস্তবায়ন, করব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, দুর্নীতি কমানো এবং রাজস্ব আহরণের আওতা বিস্তৃত করার মতো উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব আরও তিন বছর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এ উদ্যোগ সফল হলে নিঃসন্দেহে ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (এসটিএস) বাস্তবায়নে কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়া যাবে। এসটিএসে নির্ধারিত ১৫৭টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা সফল হোক বা না হোক, মসৃণ উত্তরণের কৌশলের অংশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনার ওপর বাংলাদেশকে অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ যদি ঋণ পরিশোধের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ঋণঝুঁকি কমাতে এবং বহুল আলোচিত ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’ এড়াতে চায় তাহলে সরকারের সব ধরনের কার্যক্রম-চলতি ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই- দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি কার্যকর করতে হবে। প্রবাসীনেটওয়ার্কে যোগদিন

সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারের অভাবই ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন সমস্যার অন্যতম কারণ। দেশের মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার পেছনেও এ ধরনের দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর প্রভাব পড়েছে আর্থিক খাতের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। তাই ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতে অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রকল্পের ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ মূল্য পাওয়া বা ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনা- এসব বিষয় নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করবে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করা যায় তার ওপর। বাংলাদেশকে তাই একইসঙ্গে এই দুই ধরনের উত্তরণকে সফল ও টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.