Originally posted in দেশ রূপান্তর on 19 February 2026
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনসহ অনেক প্রতিশ্রুতি-পূরণের কথা বলে শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অন্য মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ অনুষ্ঠান হয়েছে। নতুন মন্ত্রিপরিষদে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অভিজ্ঞতার ঘাটতি না থাকলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি-পূরণ তার জন্য চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ী নেতারা সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমীর খসরু নতুন হলেও এর আগে তিনি অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় তিনি দেশ-বিদেশের বাণিজ্য নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি ব্যবসায়ী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অলিগার্কদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা পূরণের সব অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তবে তার জন্য বাজেট ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি বাজারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জও দেখছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতি বিষয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি তা পূরণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
নির্বাচনের আগে বিএনপির ইশতেহারে দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর বলা হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে ১৫টি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন ও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি; অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ; বেসরকারি খাতের উন্নয়ন; ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার; পুঁজিবাজারের সংস্কার ও উন্নয়ন; বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ; শিল্প খাত, কারু ও হস্তশিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন; সেবা খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন; তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাত, যোগাযোগ ও পরিবহন খাত, সুনীল অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন এবং রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, কতিপয়তান্ত্রিক (অলিগার্কিক) কাঠামো ভেঙে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অংশীদারত্ব থাকবে। ন্যায্য মূল্যবণ্টন, অর্থায়ন ও বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে একটি বিশেষ শ্রেণি-গোষ্ঠীর লোকেরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে প্রতি বছর ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এতে রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীরা জড়িত ছিল। এ চক্রটিকেই অলিগার্ক চক্র আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যার অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার মামলা করেছে।
অলিগার্কদের প্রভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার শরিয়াভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত ও ছয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছে। বীমা খাতের বেশ কিছু কোম্পানি এ তালিকায় রয়েছে। নতুন সরকারকে এ সমস্যা সমাধানে ব্যাপক চাপে পড়তে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, শুল্ক কাঠামো সংস্কার ও বড় প্রকল্পগুলোয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নতুন সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কর্মসংস্থানে জোর দিতে হবে।
দেশের অর্থনীতি ও নতুন অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে থাকবেন। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। দেশ-বিদেশের বাণিজ্য ইস্যুতে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছেন। আশা করছি, দেশের অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ে সঠিকভাবে কাজ করবেন। অর্থ-বাণিজ্য বিষয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তার নেই।’
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে কেটে গেছে। আশা করা যায়, দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীরা এখন বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। ধীরে ধীরে বিনিয়োগে ফিরতে শুরু করবেন। তবে অর্থনীতিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ বের করে বিনিয়োগসহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগ থেকে লাভ স্থানান্তরের জটিলতা রয়েছে। তাই বৈদেশিক লেনদেন সহজ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির সমস্যা রয়েছে, এর সমাধান করতে হবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা যেমন জরুরি তেমনি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে অবকাঠামোর সঙ্গে গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সহজে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার হয়তো সাময়িকভাবে অর্থনীতির উত্তরণ ঘটাতে পারবে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এ উত্তরণ ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তার জন্য শিল্প খাতের বিকাশে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। যে বিনিয়োগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে সে ধরনের প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন অর্থমন্ত্রী এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি একজন বড় ব্যবসায়ী। বাংলাদেশে ব্যবসা-বণিজ্য কীভাবে হয় তার সবই জানেন। তিনি একইসঙ্গে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কাজ করায় তার বিশেষ অসুবিধা হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে, দেশের অর্থনীতিতে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমি মনে করি, অর্থনীতিতে বাজেটঘাটতি বড় সমস্যা। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। সরবরাহব্যবস্থায় অনিয়মের কারণেও মূল্যস্ফীতি বাড়ে। অর্থনীতিতে অলিগার্কি থাকবে, তবে দেখতে হবে তারা যেন বাড়তি সুবিধা নিতে না পারে। অলিগার্করা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, বিদেশে টাকা পাচার করে। তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী এমন অলিগার্কদের খুব ভালোভাবে চেনেন।’
তিনি বলেন, ‘বাজার ও সরবরাহব্যবস্থায় চাঁদাবাজি বন্ধ জরুরি। দলীয় ব্যক্তিরাই এসব কর্মকা-ে জড়িত থাকেন। তাদের বলতে হবে- আমরা জনগণকে অনেক বড় আশা দিয়ে দায়িত্বে এসেছি। ফলে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে। কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। প্রয়োজনে দলীয় শৃঙ্খলার স্বার্থে কঠোর হতে হবে।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য অর্থনীতির যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার সেসবের অনেক বিষয়ে সংস্কার কমিটি গঠন করেছে এবং অনেকগুলো প্রতিবেদন করেছে। সেসব সংস্কার প্রতিবেদন গ্রহণ করা উচিত বলে মনে হয়। কারণ নতুন করে সংস্কার করতে হলে আবার শুরু থেকে কাজ করতে হবে। এতে সময় নষ্ট হবে। আবার আমলাদের দিক থেকে প্রতিবন্ধকতা আসবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা উচিত। তবে তৃতীয় পক্ষের তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের মতামত গ্রহণ করা হলে, অগ্রগতি হবে বলে মনে হয় না। কারণ আমলারা কাগজে মতামতকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যা বাস্তবভিত্তিক নয়। এখন কাজ শুরু করতে পারলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত উন্নতি লাভ করবে।
দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম বাণিজ্য সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বিদ্যমান বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্কারোপ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে আমাদের স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকা- মারাত্মকভাবে ব্যাহত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্থানীয় বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রাপ্তিতে তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই, রপ্তানিমুখী খাতের অবস্থাও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসএমই খাত, যার ফলে প্রান্তিকপর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন কমেছে, সেই সঙ্গে হোঁচট খেয়েছে সামগ্রিক উৎপাদন-ইকোসিস্টেম। উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াই কষ্টসাধ্য।’
তারা বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব নাজুক, স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তারা শিল্প-কারখানা পরিচালনায় নিরুৎসাহিত, বন্দরসমূহের কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা, এনবিআর সংস্কারের কার্যক্রমে সৃষ্ট অচলাবস্থা, শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় জ্বালানিপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, সুদের উচ্চহার, সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি, উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তার অভাব বেসরকারি খাতের অগ্রগতিকে মারাত্মœকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
ডিসিসিআই মনে করে, দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করা দরকার।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি সব মানুষের জন্য হতে হবে। দেশের জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। সবপর্যায়ের, শ্রেণিপেশার মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত করতে পারলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনীতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।’ দেখতে হবে অর্থনীতির সুফল যাতে তাদের কাছে যায়।


